প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

টেস্টিং সল্ট বিষ

হোসাইন : খাবারের স্বাদ বাড়ানোর জন্য ব্যবহূত টেস্টিং সল্ট নামে মারাত্মক বিষ গ্রহণ করছে মানুষ। এ বিষয়ে বিজ্ঞানীরা বলছেন, মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট বা এমএসজি নামের রাসায়নিক উপাদানে তৈরি টেস্টিং সল্ট বা স্বাদ-লবণ স্নায়ুতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি আছে এতে, অথচ কোনো পুষ্টিগুণই নেই।

শুধু খাবারকে মুখরোচক বা মজাদার করার জন্য টেস্টিং সল্ট প্রধানত চায়নিজ ও থাই খাবারে এবং পাশাপাশি নামিদামি হোটেল, বিয়ে, মেজবানসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের রান্নায় এটি অধিক পরিমাণে ব্যবহার করা হয়। অনেকে ঘরোয়াভাবে তৈরি খাবারেও ব্যবহার করেন।

চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা টেস্টিং সল্টকে স্নায়ুবিষ বলে আখ্যায়িত করেছেন। বিশেষজ্ঞরা জানান, টেস্টিং সল্ট মস্তিস্ককে উদ্দীপ্ত করে এমন একটি অবস্থার সৃষ্টি করে যাতে মনে হয়, খাবারটি খুবই সুস্বাদু। ওই খাবারের প্রতি আসক্তি বাড়ে। শিশুরা পছন্দ করে। মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর টেস্টিং সল্টমিশ্রিত খাবার সরবরাহ নিষিদ্ধ করতে সরকারকে উদ্যোগী হতে আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. আ ব ম ফারুক সমকালকে বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কয়েক বছর আগে স্নায়বিক অসুস্থতার লক্ষণযুক্ত নতুন রোগের কথা জানায়, যার নাম দেওয়া হয় ‘চায়নিজ রেস্টুরেন্ট সিনড্রোম’। টেস্টিং সল্ট মানবদেহে প্রবেশ করে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে বিষিয়ে তোলে। ফলে স্নায়ুতন্ত্র সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। ঘুম কম হয়। আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে স্বাভাবিক খাবার অরুচিকর লাগে। কাজে মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা হ্রাস পায়।

অধ্যাপক ফারুক আরও বলেন, টেস্টিং সল্টকে বিজ্ঞানীরা উদ্দীপক বিষ নামে অভিহিত করেছেন। নিয়মিত টেস্টিং সল্ট ব্যবহারকারীদের মধ্যে মাথাব্যথা, খিঁচুনি, হরমোন নিঃসরণে গোলযোগ, মনোবৈকল্য, শিশুদের ক্ষেত্রে লেখাপড়ায় কম মনোযোগ. অতিরিক্ত ছটফটানি ভাব, হাঠৎ ক্ষেপে যাওয়া, মুটিয়ে যাওয়া ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দিতে পারে। অ্যাজমায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা টেস্টিং সল্ট খেলে শ্বাসকষ্ট হতে পারে। এ ছাড়া এটি মস্তিস্কে ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। বিশ্বের কয়েকটি দেশে টেস্টিং সল্ট নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাংলাদেশেও এটি নিষিদ্ধ করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

যেসব খাবারে স্বাদ-লবণ :সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, থাই, চায়নিজ ও ইন্ডিয়ান খাবারে টেস্টিং সল্ট বেশি পরিমাণে ব্যবহার করা হয়। যারা চায়নিজ খাবার বেশি গ্রহণ করেন, তাদের চায়নিজ রেস্টুরেন্ট সিনড্রোমে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বর্তমানে ফাস্টফুডের দোকানগুলোতেও মাত্রাতিরিক্ত টেস্টিং সল্ট ব্যবহার করা হচ্ছে। ঘরোয়াভাবে তৈরি খাবারে নিয়মিত টেস্টিং সল্ট ব্যবহারকে বিপজ্জনক বলছেন বিশেষজ্ঞরা। কোনো খাবারে ঝাঁজালো নোনা স্বাদ পাওয়া গেলে বুঝতে হবে, তাতে টেস্টিং সল্ট আছে। বাজারে বিক্রি হওয়া পটেটো চিপসে মাত্রাতিরিক্ত টেস্টিং সল্ট ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া চিকেন ফ্রাই থেকে শুরু করে শিশুদের সিরিয়াল, চকলেট, বেবি ফুড, সস, বিস্কুট, বিশেষ করে ক্র্যাকারস, সল্টেড ও ভেজিটেবল বিস্কুট, হরেক রকম স্যুপ, সালাদ ড্রেসিং, বিভিন্ন নামের সস, ফ্রাইড রাইস, ফ্রাইড প্রোন, প্রোন বল, সুইট অ্যান্ড সাওয়ার প্রোন, চিকেন ভেজিটেবল, ফিশ ভেজিটেবল, পিৎজা, স্যান্ডউইচ, নুডলস, হোটেল-রেস্টুরেন্টের রোস্ট, ফ্রাই, কারিসহ চায়নিজ সব খাবারে মাত্রাতিরিক্ত টেস্টিং সল্ট ব্যবহার করা হয়।

তবে বাবুর্চি নান্না মিয়ার হাজি মোরগপোলাও প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার মোহাম্মদ বাসেত সমকালকে বলেন, টেস্টিং সল্ট ব্যবহার করলে খাবার খুবই সুস্বাদু হয়। কিন্তু এটি শরীরের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় তারা ব্যবহার করেন না।

ঢাকা রিজেন্সি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের ডিরেক্টর (ফুড অ্যান্ড বেভারেজ) এ টি এম আহমেদ হোসেইন সমকালকে বলেন, তাদের হোটেলে টেস্টিং সল্ট ব্যবহার করে কোনো খাদ্য তৈরি করা হয় না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ টেস্টিং সল্ট ব্যবহার না করার নির্দেশ দিয়েছেন।

টেস্টিং সল্টের ইতিবৃত্ত :অনেক নামিদামি রেস্তোরাঁয় ‘আমরা টেস্টিং সল্ট ব্যবহার করি না’ শীর্ষক লেখা দেয়ালে লেখা থাকে। ১৯০৮ সালে জাপানি রসায়নবিদ ও টোকিও ইমপেরিয়াল ইউনিভার্সিটির গবেষক কিকুনেই ইকেতা টেস্টিং সল্ট উদ্ভাবন করেন। সে সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ও পরে চীনে খাবার সুগন্ধিকারক হিসেবে এটি জনপ্রিয়তা পায়। তবে বর্তমানে চীনে টেস্টিং সল্ট নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সম্প্রতি ভারতের উত্তর প্রদেশের বারবানকি এলাকায় এক খাদ্য নিরাপত্তা কর্মকর্তা একটি বহুজাতিক কোম্পানির খাদ্যে টেস্টিং সল্ট পাওয়ার প্রমাণ দেওয়ার পর দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এরপর সরকার ওই বহুজাতিক কোম্পানি পণ্যটি নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয়।

অবশ্য আমেরিকার ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) টেস্টিং সল্ট এখনও নিষিদ্ধ করেনি। ইউরোপেও নিষিদ্ধ নয়।

স্নায়ুবিষ :টেস্টিং সল্টের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে পুষ্টিবিদ ডা. এস কে রয় সমকালকে বলেন, চায়নিজ রেস্টুরেন্টে খাওয়ার পর কারও মাথাব্যথা, বমি ভাব, খিঁচুনি, চামড়ায় ফুসকুড়ি, হাত-পায়ে দুর্বলতা, জ্বালাপোড়া, কাঁপুনি, বুকে চাপ, অবসাদ, ঝিমুনি ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিলে বুঝতে হবে, এটি টেস্টিং সল্টের প্রভাব। টেস্টিং সল্টের কোনো পুষ্টিগুণ নেই। কিন্তু এই সল্ট ভোক্তাদের মধ্যে মাদকের মতো আসক্তি তৈরি করে। কম চর্বিযুক্ত খাবার খুব সুস্বাদু নয় বলে মানুষ তেমন আকৃষ্ট হয় না। কিন্তু এসব খাদ্যে টেস্টিং সল্ট মিশ্রণ করলে স্বাদ বহুগুণ বেড়ে যায়। তবে সবচেয়ে মারাত্মক বিষয় হলো, শেষ পর্যন্ত পার্কিনসন্স বা আলঝেইমারসের মতো মারাত্মক রোগ হতে পারে। এককথায়, টেস্টিং সল্টকে স্নায়ুবিষ বলা যেতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. খলিলুর রহমান সমকালকে বলেন, মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট বা টেস্টিং সল্ট মানবদেহে অতি সামান্য মাত্রায় কোষ-বহিঃস্থ তরল হিসেবে থাকে। টেস্টিং সল্ট খাওয়ার কারণে কোষ-বহিঃস্থ্থ তরলে ট্রান্সমিটারের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে নিউরনগুলো উদ্দীপ্ত করে। নিউরনের কাজ হলো বৈদ্যুতিক আবেশ ফায়ার করা। অতিরিক্ত উদ্দীপ্ত হওয়ার কারণে নিউরনগুলো অতিরিক্ত পরিমাণে ফায়ার করতে থাকে, যার বিলম্বিত প্রতিক্রিয়ায় একসময় কোষগুলোর মৃত্যু হয়। অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে এক্সাইটোটক্সিনের প্রতিক্রিয়াগুলো লক্ষণীয় হতে দীর্ঘদিন সময় লাগে।

নিজের একটি গবেষণার উল্লেখ করে ড. খলিলুর রহমান আরও বলেন, মনোসোডিয়াম গ্লুটামেটের প্রতিক্রিয়া রোধে ভিটামিস ‘সি’ খাওয়া যেতে পারে। গ্লুটামেট ব্যবহারে যে শারীরিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, ভিটামিন সি গ্রহণের মাধ্যমে তা প্রতিরোধ করা যায়।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য :স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদি সেব্রিনা সমকালকে বলেন, টেস্টিং সল্টের বিষয়ে এখনও দেশে কোনো গবেষণা হয়নি। এটি মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাই আইইডিসিআর টেস্টিং সল্ট ব্যবহার না করার জন্য জনসাধারণকে অনেক আগে থেকেই সচেতন করে আসছে। তবে এই সল্টের ব্যবহার বন্ধ করতে সরকারিভাবে কোনো জোরালো কর্মসূচি গৃহীত হয়নি।

পণ্যের গুণগত মান যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান বিএসটিআইর মহাপরিচালক সরদার আবুল কালাম সমকালকে বলেন, টেস্টিং সল্ট আমদানির বিষয়ে সরকারিভাবে এখনও কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়নি। তবে জনস্বাস্থ্যে ক্ষতিকর হলে সেটির ব্যবহার বন্ধ করা সরকারের দায়িত্ব। উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

‘নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ’-এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাহফুজুল হক সমকালকে বলেন, বিষয়টি তাদের নজরে আসেনি। তবে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হলে অবশ্যই এই টেস্টিং সল্টের ব্যবহার বন্ধ করতে সরকার উদ্যোগ নেবে।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, শুধু স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চাইলেই টেস্টিং সল্ট ব্যবহার বন্ধ করতে পারবে না। সংশ্নিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরকে একসঙ্গে বসে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।সমকাল।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত