প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নাগরিক কণ্ঠ তো প্রায় নেই বললেই চলে : সুলতানা কামাল

আশিক রহমান : দুই মাসেরও বেশি সময় নিখোঁজ থাকার পর সাংবাদিক উৎপল দাস ফিরে এসেছেন, এটা আমাদের জন্য স্বস্তির। কিন্তু সাগর-রুনি হত্যার এখনো কোনো সুরাহা হয়নি। তনু হত্যার বিচারের কোনো অগ্রগতি এখনো আমরা দেখতে পাচ্ছি না। বরং তনুর মা-বাবাকে ডেকে এনে বারবার বিব্রত করা হচ্ছে, হয়রানি করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, একসময় তনুর মা-বাবার উদাহরণ দেখিয়ে এরকম ঘটনা যার ওপর ঘটবে সে বলবেÑ আমরা আর বিচারই চাই না। যে যাওয়ার গেছে, নিজেদের জীবনটা তো বাঁচাই। নিজেরা তো অন্তত স্বস্তির মধ্যে থাকি। তার মানে আমরা এমন একটা সমাজব্যবস্থার মধ্যে চলে এসেছি যেখানে যাদের ওপর অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে তারা ন্যায়বিচারের প্রত্যাশাটাই ছেড়ে দিয়েছেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো বিচার পাচ্ছে, কিন্তু সেটা কোনো একটা ব্যতয় ঘটিয়ে ঘটনাটা ঘটছে। স্বাভাবিকভাবে হচ্ছে নাÑ আমাদের অর্থনীতিকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করেন মানবাধিকারকর্মী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল।

তিনি আরও বলেন, আমরা যদি মেনেও নিই রাষ্ট্রের ব্যাখ্যা যে, গুমগুলো রাষ্ট্র করছে না, অন্য কেউ করছে কিংবা নিজেরাই লুকিয়ে থাকছে সেটা বের করার দায়িত্ব তো রাষ্ট্রের। সেই দায়িত্বটা তো রাষ্ট্র সঠিকভাবে পালন করতে পারছে না। একমাত্র নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলাটা মোটামুটিভাবে সন্তোষজনকভাবে এগিয়েছে, যদিও এখন কী অবস্থা জানি না। একটা সমাজ কিংবা রাষ্ট্রসীমার মধ্যে যদি সারাক্ষণ মানুষের মনের মধ্যে এই ভয়টা থাকে যে, আমি যেকোনো সময় গুম হয়ে যেতে পারি। এ সমস্ত অপরাধ যেকোনো সমাজেই ঘটে থাকে। কিন্তু যখন মানুষ মনে করে যে আমার ওপর কোনোরকম অপরাধ সংঘটিত হয়, আমি এটার কোনো প্রতিকার পাব না। এমনকি পুত্রহারা পিতাও তখন বলেন যে, ‘আমি বিচার চাই না। কারণ আমি বিচার পাব না।’ মানুষ তখন ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা হারিয়ে ফেলে।

সুলতানা কামাল বলেন, আমরা যখন এমন পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে যাই তখন রাষ্ট্রের অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে চিন্তা করা উচিত যে, মানুষ কেন এরকম ভাবছে। যদি আমি ভুলও ভেবে থাকি তাহলে সেই ভুলটা ভাঙানোর জন্য তারা কী করছেন। উদাহরণগুলো তারা আমাদের সামনে নিয়ে আসতে পারেন। বলতে পারেনÑ দেখুন আপনি ভাবছেন আপনি বিচার পাবেন না, দেখুন এই বিচারগুলো আমরা সম্পন্ন করেছি। কিন্তু সেটা তো রাষ্ট্র পারছে না। রাষ্ট্র বরং যারা অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হচ্ছে তাদের ওপর দোষ দিচ্ছে যে এরা ইচ্ছে করেই লুকিয়ে থাকে। ব্যক্তিগত সংঘাতের কারণে গুমের ঘটনা ঘটেছে। আমরা চেষ্টা করছি, অচীরেই নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করব। ২৪ বা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সুরাহা হবে। কিন্তু পরে ২৪ বছর, ৪৮ বছর গেলেও তার কোনো সুরাহা হয় না।
এক এক প্রশ্নের জবাবে এই মানবাধিকারকর্মী বলেন, একটা সমাজে সবকিছু যখন অস্বচ্ছ হয়ে যায়, দোষ-গুণ, ভালো-মন্দ, অপরাধ-নিরাপরাধের মধ্যে কোনো তফাৎ থাকে না, কোনটা অপরাধ, কোন অপরাধ নয়Ñ মানুষ সেটাই বুঝতে পারে না, পার্থক্য করতে পারে না তখনই নারী-শিশুদের ওপর নির্যাতন, ধর্ষণের মতো ঘটনাগুলো ঘটতে পারে।

তিনি বলেন, নারী আর শিশুরা তো সামগ্রিকভাবে, সামাজিক, অর্থনৈতিকভাবে একটা দুর্বল অবস্থানের মধ্যে থাকে। শিশুরা তো শারীরিকভাবেই দুর্বল অবস্থানে থাকে। একটা শিশুকে যে বা যারা অত্যাচার করে তার তুলনায় শিশুটির শক্তি তো একেবারেই নগন্য। তাকে যা কিছু তাই করতে পারে। তার বুদ্ধি, শারীরিক শক্তি, অত্যাচার থামানোর যে ক্ষমতা তা তো খুবই সীমাবদ্ধ। তখন তার ওপর নির্বিচারে অত্যাচার করতে পারে। করে কেন? কারণ এমন কাজ করে কাউকে শাস্তি পেতে হয় না। তার জন্য কোনোরকম জবাবদিহিতার সম্মুখিন হতে হবে না।
তিনি আরও বলেন, কোনো একটা ঘটনায় তো নারীরাই এগিয়ে এসেছে, কোন একজনকে মারছিল, যারা মারছে তাদেরকে অনুরোধ করছে, মেরো না, মেরো না। চারদিক ঘিরে থাকা এতগুলো মানুষ একটা মানুষকে থামাতে পারল না। তার মানে আমরা নিঃশক্তি হয়ে গেছি একটা সমাজ হিসেবে। দুর্বৃত্তের শক্তির কাছে আমরা অসহায়, নিঃশক্তি হয়ে গেছি। এরা এত শক্তিশালী হয়ে গেছে যে আমরা প্রচ-ভাবে নিঃশক্তি হয়ে গেছি। কিছু করতে পারি না। চোখের সামনে দেখছি কেউ অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হচ্ছে কিন্তু আমরা কোনো কথা বলতে পারি না। থামাতে পারি না। এদের শক্তির উৎসটা কোথায়?

অপর এক প্রশ্নের জবাবে সুলতানা কামাল বলেন, নাগরিক কণ্ঠ তো প্রায় নেই বললেই চলে। দুর্বল কী, নাগরিক কণ্ঠ কোথায় আছে? নাগরিকদের যারাই একআধটু কথাবার্তা বলেন তারা তো ভয়ের মধ্যে থাকেন যে কাল আবার কী হয়, না হয়। পরিবার থেকে তো আমাদের সারাক্ষণই সাবধান করা হয় যে, এটা বলো না, ওটা বলো না। একসময় এসে তো কথা না বলার অবস্থা এসে দাঁড়িয়ে যায়। নাগরিক কণ্ঠ রোধ করে দেওয়াটাই তো যারা রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনায় আছে তাদের একটা বিশেষ চরিত্রের প্রতিফলন যে যারা কতখানি নাগরিকদের ভীতসন্ত্রস্ত করে ফেলেছেন। কিংবা নাগরিকরা যে ভীতসন্ত্রস্ত হয়েছে তার পাশে দাঁড়িয়ে সাহস দিতে পারছেন না। আমাকে তো হেফাজতে ইসলাম হুমকি দিয়েছিল, রাষ্ট্র নয়। কিন্তু রাষ্ট্র তো একবারও বলেনি কেন সুলতানা কামালকে এই হুমকি দিল। হেফাজত এটা অন্যায় করেছে, একবারও তো বলেনি।

তিনি বলেন, একটা সমাজে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ হয় কীভাবে? অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করার জন্যই তো আইনের ব্যবস্থাপনাগুলো থাকে, বিধিগুলো থাকে। আমাদের যে সাধারণ ধারণা সেটা হলো যে, আমাদের যে আইনকানুনগুলো রয়েছে সেগুলো যদি আসলে একেবারে নীতিসম্মতভাবে, নৈতিকতার সঙ্গে এবং যৌক্তিকভাবে সময় মতো যদি প্রয়োগ করা হয় এবং কোনোরকম বাইরের প্রভাব দ্বারা প্রভান্বিত না হয়ে যদি আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ করা হয় সৎভাবে, দুর্নীতিমুক্তভাবে তাহলে এই অপরাধগুলো একদম নির্মূল করতেও না পারতাম অন্তত কমে আসত। কারণ যারা অপরাধ করছে তারা অন্তত এটুকু ভয় পেত যে, আমি অপরাধ করলে শাস্তি পাব।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত