ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয় নিশ্চিত ভেবে যারা মন্ত্রিসভা ঠিক করছিল, তাঁরা পরাজিত হতে চলেছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও দলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। কোনো কোনো আসনে কিছু অভিযোগ থাকলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সার্বিকভাবে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে মতপ্রকাশ করেন তিনি।
ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ জোট বিজয়ী হতে যাচ্ছে বলে সম্ভাবনার কথা জানান তিনি। তবে চূড়ান্ত ফলাফল না আসা পর্যন্ত দলের সবাইকে সতর্ক থেকে ভোটকেন্দ্রে অবস্থান করার নির্দেশনা দিয়েছেন এনসিপির এই নেতা।
আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া ভিডিও বার্তায় তিনি এ সব কথা বলেন।
ভিডিও বার্তায় আসিফ বলেন, ‘যারা এক ধরনের নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল, যারা মন্ত্রিসভা ঠিক করছিল বিজয়ী হবে বলে ধরে নিয়েছিল, তারা হয়তো পরাজিত হতে চলেছে। বাংলাদেশে সংস্কার সুশাসন এবং সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এবং ন্যায় ইনসাফের যেই ঐক্য ‘‘ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ’’ এবার বিজয়ী হতে চলেছে।’
১৮ বছর পর খুবই আনন্দঘন সুন্দর পরিবেশে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে উল্লেখ করে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ উল্লাসের সাথে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। কয়েকটি জায়গায় যদিও কিছু অনিয়ম হয়েছে। যেমন-শাপলাকলি যে আসনগুলোতে নির্বাচন করছে সেখানে বিশেষ করে হাতিয়া (নোয়াখালী ৬) এবং ভালুকা (ময়মনসিংহ ১১) আসনে অনিয়ম হয়েছে। জাল ভোট দেওয়া হয়েছে। কিছু জায়গায় সাধারণ ভোটারদেরকে ভোট কেন্দ্রে যেতে দেওয়া হয়নি। তারা আগে থেকেই ধারণা করতে পেরেছিল যে সাধারণ মানুষ ভোটকেন্দ্রে গেলে শাপলাকলির বিজয় সুনিশ্চিত। সে কারণে তারা সাধারণ মানুষকে ভোট কেন্দ্রে যেতে বাধা দিয়েছে।’
কোনো কোনো আসনে কিছু অভিযোগ থাকলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সার্বিকভাবে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে জানিয়ে আসিফ বলেন, ‘হাতিয়ায় এনসিপির সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী হান্নান মাসউদের স্ত্রীর ওপরে বিএনপির নেতাকর্মীরা হামলা করেছে। এনসিপির প্রার্থীরা যেই ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সেসব আসনের বাইরেও অনেকগুলো আসনে এ ধরনের কিছু ঘটনা ঘটেছে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ওভারঅল (সার্বিকভাবে) এবারের নির্বাচন এখন পর্যন্ত সুষ্ঠুভাবে হয়েছে। যেই জায়গাগুলোতে এখন পর্যন্ত অনিয়ম হয়েছে, সেই জায়গাগুলোতে নির্বাচনের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট যারা রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং যারা দায়িত্বে আছেন তারা সেই বিষয়গুলোকে ভালো করে দেখবেন এবং তদন্তপূর্বক এ বিষয়ে আমাদেরকে জানাবেন বলে আমরা প্রত্যাশা রাখি। তবে সারা দেশে সার্বিকভাবে সুষ্ঠুভাবে ভোট গ্রহণ হয়েছে, বলতে পারি।’
চূড়ান্ত ফলাফল না আসা পর্যন্ত ১১ দলীয় জোটের নেতা-কর্মীদের কেন্দ্র ছেড়ে না যাওয়ার আহ্বান জানান আসিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘অফিশিয়াল (আনুষ্ঠানিক) ফলাফল হয়তো আমরা আগামীকাল পেতে পারি। সেক্ষেত্রে আমাদের ১১ দলীয় জোটের সকল নেতাকর্মীর প্রতি আহ্বান থাকবে আপনারা কেউ কেন্দ্র ছেড়ে যাবেন না।’
আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘কেন্দ্রের চূড়ান্ত ফলাফল না নিয়ে কেউ কেন্দ্র ত্যাগ করবেন না। কেউ বাসায় যাবেন না। আগেই দুই একটা কেন্দ্রের ফলাফল পেয়েই কেউ বিজয় উল্লাসে মেতে উঠবেন না। তাহলেই কিন্তু কারচুপি করার কিংবা ভোট গণনায় হেরফের করার সুযোগ তৈরি হবে। সুতরাং আমাদেরকে সতর্কভাবে অবজার্ভ (দেখতে) হবে। আমাদেরকে ক্রিটিক্যালি (সূক্ষ্মভাবে) দেখতে হবে যে ভোট গণনা শতভাগ সুষ্ঠভাবে হচ্ছে কি না এবং ভোট গণনা ঠিকভাবে রিপোর্ট হচ্ছে কি না।’
ফলাফল হওয়ার আগে পর্যন্ত আসিফ মাহমুদসহ জোটের নেতারা নির্বাচন কমিশনে থাকবেন বলে ভিডিওবার্তায় জানান তিনি। আসিফ বলেন, ’ আমরা ইলেকশন কমিশনে থাকছি। ফলাফল ঘোষণা হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আমরাও এখানে সজাগ দৃষ্টি রাখবো। যাতে করে ফলাফলে কোন ধরনের ইঞ্জিনিয়ারিং করা সম্ভব না হয়। সেটার জন্য আমরা ১১ দলীয় জোটের সকল নেতাকর্মীদেরকে আহ্বান জানাচ্ছি।’
কিছু কিছু আসনে জোটের প্রার্থীরা বড় ব্যবধানে এগিয়ে আছেন বলে জানান আসিফ। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত আমরা কিছু কিছু কেন্দ্রীয় ফলাফল যা পাচ্ছি, সেই জায়গায় আমরা দেখতে পাচ্ছি যে শাপলাকলি, দাড়িপাল্লা এবং রিক্সার এক ধরনের জয়জয়কার হচ্ছে। আমরা অনেকগুলো কেন্দ্রে অনেক বেশি মার্জিনে (ব্যবধানে) এগিয়ে আছি। তবে যেই আসনগুলোতে বিভিন্ন কেন্দ্র দখল হয়েছে, ভোট কারচুপি হয়েছে, সেই আসনগুলোতে...কিছু কিছু কেন্দ্রে খুব অস্বাভাবিকভাবে ধানের শীষ এগিয়ে আছে। কারণ তারা সেই কেন্দ্রগুলো দখল করেছে এবং সিল মেরেছে বলে আমরা ধারণা করছি। এই কেন্দ্রগুলোর বিষয়ে এবং এই আসনগুলোর বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই মানুষের ভোটাধিকারের পক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
আসিফ বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি যে,১১ দলীয় জোট সরকার গঠন করবে। এখন পর্যন্ত আমরা যেই ফলাফল পাচ্ছি, বাংলাদেশের জনগণ একচছত্রভাবে ১১ দলীয় জোটের মার্কায় ভোট দিয়েছে। জোটের যে সুশাসন, সংস্কার এবং সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার যেই লড়াই সেই লড়াইয়ের প্রতি তারা ম্যান্ডেট দিয়েছে। আমরা ইসি এবং সরকারকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। ছোটখাটো কিছু অনিয়ম এবং তাদের কন্ট্রোলের (নিয়ন্ত্রণ) বাইরে কিছু বিষয় ঘটলেও সার্বিকভাবে তারা খুবই সুন্দর একটি নির্বাচন আমাদেরকে উপহার দিতে পেরেছে। কিছু কিছু জায়গা ছাড়া দেশবাসী ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। আমরা তাদের প্রতি প্রত্যাশা রাখব যে ভোট গণনা থেকে শুরু করে ঘোষণা পর্যন্ত বাকি প্রক্রিয়াগুলোও যেন সম্পূর্ণ সুষ্ঠরূপে সম্পাদন করেন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের একটি সুন্দর গণতান্ত্রিক রূপান্তর আমরা প্রত্যাশা করছি।’
এনসিপির এই নেতা বলেন, ‘এবারের নির্বাচন ২০০৮ এর নির্বাচনের মতো হবে না। এবারের নির্বাচন ১৯৯১ সালের নির্বাচনের মতো হচ্ছে। যারা এক ধরনের নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল যারা মন্ত্রিসভা ঠিক করছি ঠিক করছিল বিজয়ী হবে বলে ধরে নিয়ে তারা হয়তো পরাজিত হতে চলছে।’
সূত্র: আজকের পত্রিকা