প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আত্মহত্যার সামাজিক দায়

ইয়াসির আরাফাত : বেশ কিছুদিন আগে আমি যে প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করি সেখানকার একজন শিক্ষার্থী ছাত্রাবাসে নিজ রুমে আত্মহত্যা করেছিলেন। প্রচণ্ড আলোচনা চলেছিল তখন পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তার আত্মহত্যার সম্ভাব্য কারণ নিয়ে। অনেকে ধারণা করেছিলেন প্রেমসংক্রান্ত জটিলতার পরিণতি। কেউ কেউ বলছিলেন সদ্য স্নাতক শেষ করার পর পারিবারিক ও সামাজিক চাপে তার প্রচণ্ড রকমের মানসিক বিপর্যস্ততার কথা, যদিও এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ আসেনি কারো সামনেই। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে একটি জেলা ঝিনাইদহ। ফকির লালন, ইলা মিত্রসহ আরো অনেকের জন্মস্থান হিসেবেই জেলাটি সুপরিচিত। তবে এ জেলার আরো একটি আতঙ্কিত হবার মতো পরিচয় আছে। বলা হয় বাংলাদেশের সবচাইতে বেশি পরিমাণে মানসিক হতাশাগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর বসবাস এখানে। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ঝিনাইদহে আত্মহত্যা করেছেন প্রায় ২,৩২৪ জন। আর এই একই সময়ে সেখানে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন ১৭ হাজার ৬৯২ জন। আবার একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার তথ্য মোতাবেক ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত শুধুমাত্র ঝিনাইদহ সদর হাসপাতাল ও ছয়টি উপজেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে চিকিত্সা নিতে এসেছিলেন প্রায় ১৪ হাজার ৭৭৪ জন। এদের মধ্যে আবার অধিকাংশই নারী। উন্নয়ন সংস্থাগুলো বলছে আত্মহত্যার এই চেষ্টার পেছনে মুখ্য কারণ হিসেবে আছে নারী নির্যাতন, পারিবারিক কলহ, পরিবারের উপর অভিমান এবং তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠা। ঝিনাইদহের মতো না হলেও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যান্য জেলাগুলোতেও আত্মহত্যার পরিসংখ্যানটি সুখকর নয়। পুলিশ সদর দফতরের তথ্য মোতাবেক ২০০২ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সাত বছরে সারাদেশে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিল ৭৩ হাজার ৩৮৯ জন ব্যক্তি। দেশে বর্তমানে প্রতি বছর আত্মহনন করছে গড়ে ১০ হাজার ৪৮৪ জন আর প্রতি মাসে এ সংখ্যাটি গিয়ে দাঁড়াচ্ছে গড়ে প্রায় ৮৭৩ জনে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের চিকিত্সকেরা বলছেন, বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে যারা আত্মহত্যা করছেন তারা মূলত আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির শিকার হয়েই এদিকে ঝুঁকছেন। যৌতুক, নারী নির্যাতন, ইভটিজিং, অবমাননা, অর্থনৈতিক সক্ষমতার অভাবসহ এ জাতীয় সামাজিক আচরণকেই তারা আত্মহত্যার দায় দিচ্ছেন। অন্যদিকে পুরুষদের আত্মহত্যার কারণ হিসেবে তারা বলছেন পছন্দসই কাজ না পেয়ে সামাজিক চাপ তৈরি হওয়া, ক্যারিয়ার সংক্রান্ত বিষয়ে পারিবারিক সংকট, বেকারত্ব, অর্থসংক্রান্ত জটিলতা এবং প্রেমসংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হওয়ার কথা।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের গবেষণা রিপোর্ট বলছে, গত আড়াই বছরে শুধু ইভটিজিং-এর শিকার হয়ে ৪০ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন। উত্ত্যক্তকারীদের হাত থেকে বাঁচার কোনো উপায় না পেয়েই তারা আত্মাহুতি দিয়েছেন। প্রশ্ন হলো যদি উত্ত্যক্তকারীদের ঠেকানো যেত, বিচারের মুখোমুখি করে নারীদের জন্য একটি নিরাপদ সামাজিক জীবন প্রতিষ্ঠা করা যেত তাহলে কি এই নারীরা আত্মহত্যা করতেন? অথচ ২০১৫ সাল থেকে আরম্ভ করে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ৭৫৪টি ইভটিজিং-এর ঘটনার কথা প্রচারিত ও প্রকাশিত হয়েছে কিন্তু এ ঘটনাগুলোর বিচারের হার খুব নগণ্য এবং যেগুলোর বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হয় সেগুলোর ক্ষেত্রেও ক্ষমতার দাপটে অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে যাচ্ছেন।

প্রতিবছর বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলের পর যে শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যা করেন তাদেরও এ কাজের প্রধান কারণ নির্দিষ্ট ফলাফলের (যেমন: জিপিএ-৫) জন্য তাদের সমাজ ও পরিবার তাদের ওপর যে প্রচণ্ড মানসিক চাপ তৈরি করে রাখে সেটি এবং সে রেজাল্ট না পেলে সামাজিকভাবে তাদেরকে যেভাবে পদে পদে অপমানিত হতে হয় সেটিও।

এছাড়া স্বামী মাদকাসক্ত হবার কারণে সন্তানকে হত্যা করে মায়ের নিজের আত্মহত্যা, যৌতুক না দিতে পেরে শ্বশুরবাড়িতে ক্রমাগত নির্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যা, চাকরি না পেয়ে আত্মহত্যার মতো সংবাদ পত্র-পত্রিকা খুললে নিয়মিতই দেখা যায়। এ সবগুলো ঘটনায় প্রত্যেকেই সামাজিক বিভিন্ন সমস্যার কোনো সমাধান না পেয়ে, সামাজিকভাবে অবিচারের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছেন, নিতান্তই মৃত্যুর প্রতি রোমান্টিকতা থেকে করেননি এবং পুরো সমাজ ব্যবস্থাতেই আত্মহত্যাকারী অধিকাংশ মানুষ সামাজিক সমস্যা ও বিচ্ছিন্নতার শিকার হয়েই এ পথে ঝুঁকছেন। আর আমাদের দেশে এমন কোনো বিশেষায়িত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও নেই যারা কি-না আত্মহত্যার পথে ঝুঁকে যাওয়া বা আত্মহত্যা থেকে ফিরে আসা জনগোষ্ঠীর মানসিক উন্নতির জন্য কাজ করবেন। শুধুমাত্র বেশ কিছু এনজিও আত্মহত্যাবিরোধী প্রচারণা চালিয়ে যায় যা প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগণ্য।

সমাজবিজ্ঞান বলছে, একটি সমাজ ব্যবস্থায় যত বেশি মানুষ আত্মহত্যার দিকে প্ররোচিত হয় সে সমাজের সামাজিক কাঠামো তত বেশি দুর্বল ও অমানানসই এবং সে সমাজে মানুষের স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠা ও চলাফেরা করা তত বেশি কষ্টসাধ্য। তাই প্রত্যেক প্রজন্মের মানুষেরা যেভাবে বাঁচতে চায় সে অনুযায়ী সহনশীল করে সমাজ কাঠামোয় পরিবর্তন আনাটা যেমন জরুরি, তেমনি আত্মহত্যাকে নিছকই ‘আকস্মিক ঘটনা’ হিসেবে বিশেষায়িত না করে এ ঘটনার পেছনে চলে আসা দীর্ঘ সময়ের বেমানান সমাজবদ্ধতার যে দায় থেকে যায় তা থেকে মুক্তির জন্য সমাজ ব্যবস্থাকে মানানসই রূপে রূপান্তরের জন্য প্রত্যেকের সদিচ্ছা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান সামাজিক রূপকে ধ্রুব মনে করে গোঁ ধরে বসে থাকলে এ মৃত্যুর মিছিল বাড়বে বই কমবে না।

n লেখক: শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ইত্তেফাক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত