বেশিরভাগ মানুষের রাতে সাত ঘণ্টার কম ঘুম হলে পরের দিনটা কেমন আলসেমি আর ক্লান্তি নিয়ে শুরু হয়। মনে হয় আরেকটু ঘুমাতে পারলে ভালো হতো। অথচ কিছু মানুষ মাত্র ছয় ঘণ্টা বা তারচেয়ে কম ঘুমিয়েও কোনো ক্লান্তি অনুভব করেন না। তাঁরা পরের দিন বেশ সতেজ ও কর্মঠ হয়ে কাজ করেন। অল্প ঘুমিয়েও সতেজ থাকার রহস্যটা আসলে কী?
ঘুম আমাদের শরীরের জন্য খুবই দরকারি। কারণ, ঘুমের সময় শরীর নিজেকে মেরামত করে। তাহলে প্রশ্ন আসে, কিছু মানুষ কম ঘুমিয়েও কীভাবে সুস্থ থাকতে পারেন? বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে এই রহস্য জানার চেষ্টা করছেন। কিন্তু এমন মানুষ খুব কম হওয়ায় এ বিষয় নিয়ে এখনো বেশি গবেষণা হয়নি।
২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার বিজ্ঞানীরা এমন একটি পরিবারের ওপর গবেষণা করেন, যেখানে মা ও প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে উভয়ই কম ঘুমান। পরে দেখা যায়, তাঁদের দুজনের ডিইসি২ (DEC2) নামে একটি জিনে পরিবর্তন বা মিউটেশন আছে। বিজ্ঞানীরা যখন এই একই পরিবর্তন ইঁদুরের মধ্যে করেন, তখন সেই ইঁদুরগুলোকেও স্বাভাবিক ইঁদুরদের চেয়ে কম ঘুমাতে দেখা যায়।
বিজ্ঞানীরা যখন এই অংশের নিউরনগুলোকে সক্রিয় করেন, তখন ইঁদুরগুলো মুহূর্তের মধ্যেই জেগে ওঠে। এডিআরবি১ জিনের পরিবর্তনের কারণে মস্তিষ্ক এমনভাবে তৈরি হয় যে ঘুম ঘুমালেও সমস্যা হয় না।
২০১৮ সালের আরেকটি গবেষণায় এর কারণ জানা যায়। বিজ্ঞানীরা দেখেন, ডিইসি২ জিনের এই পরিবর্তন ওরেক্সিন (Orexin) নামে একটি হরমোনের মাত্রাকে প্রভাবিত করে। এই হরমোন আমাদের ঘুম ভাঙিয়ে দেয়। সাধারণত, ডিইসি২ জিন সন্ধ্যাবেলা ওরেক্সিন তৈরি বন্ধ করে দেয়। ফলে আমাদের ঘুম পায়। কিন্তু যাদের কম ঘুমে সমস্যা হয় না, তাদের ক্ষেত্রে এই জিন দুর্বল থাকে। ফলে এটি ঠিকমতো কাজ করে না এবং শরীরে বেশি পরিমাণে ওরেক্সিন তৈরি হতে থাকে। এ কারণে তারা বেশি সময় ধরে জেগে থাকেন।
২০১৯ সালে বিজ্ঞানীরা আরেকটি নতুন জিন আবিষ্কার করেন। এটির নাম এডিআরবি১ (ADRB1)। এই জিনেও একটি পরিবর্তন বা মিউটেশন দেখা গেছে। এই জিনের প্রভাব বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা কিছু ইঁদুরের মধ্যে একই মিউটেশন করার। তাঁরা দেখেন, সেই ইঁদুরগুলোও কম ঘুমায়। আরও গবেষণায় দেখা যায়, এডিআরবি১ জিনটি মস্তিষ্কের ডোরসাল পন্স নামে একটি অংশে খুব সক্রিয় থাকে। মস্তিষ্কের এই অংশটি ঘুম নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।
বিজ্ঞানীরা যখন এই অংশের নিউরনগুলোকে সক্রিয় করেন, তখন ইঁদুরগুলো মুহূর্তের মধ্যেই জেগে ওঠে। এডিআরবি১ জিনের পরিবর্তনের কারণে মস্তিষ্ক এমনভাবে তৈরি হয় যে ঘুম ঘুমালেও সমস্যা হয় না। আবার খুব সহজে ঘুম ভেঙে যায়।
এডিআরবি১ জিনটি খুঁজে পাওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরেই বিজ্ঞানীরা আরেকটি জিন আবিষ্কার করেন। একজন বাবা ও তার ছেলের ওপর গবেষণা করে এটি পাওয়া যায়। সেখানে দেখা যায়, বাবা মাত্র ৫.৫ ঘণ্টা এবং ছেলে ৪.৩ ঘণ্টা ঘুমিয়েও দিব্যি সুস্থ ছিলেন। নতুন এই জিনটির নাম এনপিএসআর১ (NPSR1)। গবেষকরা যখন ইঁদুরের মধ্যে এই জিনের মিউটেশন করান, তখন দেখা যায় সেই ইঁদুরগুলোও কম ঘুমায় এবং অনেক বেশি নড়াচড়া করে। আরও অবাক করার মতো বিষয় হলো, এই ইঁদুরগুলোর ঘুম কম হলেও স্মৃতিশক্তির পরীক্ষায় এরা ভালো।
এরপর বিজ্ঞানীরা এমন দুটি পরিবারের ওপর গবেষণা করেন, যাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু তাদের সবারই কম ঘুম হয়। বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, প্রত্যেকের এমজিএলইউআর১ (mGluR1) নামে একটি জিনে পরিবর্তন আছে। গবেষণায় দেখা যায়, এই জিনের পরিবর্তনের কারণে মস্তিষ্কের স্নায়ু কোষের কার্যকলাপ বেড়ে যায়।
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, নিজেকে কি কম ঘুমানোর জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো, না। আপনার কতটা ঘুম প্রয়োজন, তা আপনার শরীরের গঠন অর্থাৎ আপনার জিন এবং বয়সের ওপর নির্ভর করে। স্নায়ুবিজ্ঞানী এলিজাবেথ বি. ক্লারম্যান বলেন, ‘জীবনযাপনের ধরনের কারণে ঘুমের প্রয়োজনীয়তা বাড়ে বা কমে না। সাধারণত, শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় বেশি ঘুমের প্রয়োজন হয়।’
আমাদের বেশিরভাগ মানুষের জন্য প্রতি রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। এর চেয়ে কম ঘুম হলে ধীর হয়ে যায় আমাদের চিন্তাভাবনা। কোনো কিছুতে প্রতিক্রিয়া করার সময় বেড়ে যায়।
এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে বোঝা দরকার। একদল মানুষ আছেন, যাদেরকে বলা হয় প্রকৃত স্বল্পঘুমের মানুষ। তাদের স্বাভাবিকভাবেই ছয় ঘণ্টা বা এরও কম ঘুমালেই চলে। এতে তাদের কোনো সমস্যা হয় না। অন্যদিকে, আরেকদল মানুষ আছেন, যারা জোর করে কম ঘুমান। তাদের শরীর আসলে পর্যাপ্ত ঘুম পায় না।
আমাদের বেশিরভাগ মানুষের জন্য প্রতি রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। এর চেয়ে কম ঘুম হলে ধীর হয়ে যায় আমাদের চিন্তাভাবনা। কোনো কিছুতে প্রতিক্রিয়া করার সময় বেড়ে যায়। ফলে দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকিও বাড়ে। তাই জোর করে কম ঘুমানোর চেষ্টা করা ঠিক না। এভাবে নিজের শরীরকে বিশ্রাম না দিলে শরীর নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ
সূত্র: পপুলার সায়েন্স, সায়েন্টিফিক আমেরিকান