বিশ্বকাপের মঞ্চে কিংবা ক্লাবের হয়ে মাঠে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের জন্য এক জ্বলন্ত আতঙ্কের নাম আর্লিং হালান্ড। প্রতিপক্ষ দলের বাঘা-বাঘা ডিফেন্ডারদের রীতিমতো দুমড়েমুচড়ে গোল বের করে আনেন তিনি। উচ্চতা, পেশি ও গতির এমন ‘ভয়ংকর’ মিশেল বিশ্ব ফুটবলে খুব একটা দেখা যায় না। তাকে অনেকেই ‘মেশিন’ বলে ডাকেন।
নরওয়ের হয়ে গোলমেশিন এই স্ট্রাইকার পরিসংখ্যান ও রেকর্ড দিয়ে ফুটবল বিশ্বে দানবীয় আধিপত্য বিস্তার করে চলেছেন। বিশ্বকাপেও সেই ধারা বজায় রেখেছেন। ইতিমধ্যে গোল করেছেন ৫টি।
সোমবার (৬ জুলাই) নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত শেষ ষোলোর উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে ২-১ গোলের ব্যবধানে হারিয়ে ঐতিহাসিক জয় তুলে নেয় নরওয়ে। ইউরোপের এই দলটির এই মহাকাব্যিক জয়ের নায়ক আর কেউ নন, স্বয়ং স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড। ম্যাচে দুটি গোল করেন তিনি।
চলুন জেনে নেওয়া যাক কী খেয়ে ‘মেশিনের’ মতো খেলেন আর্লিং হালান্ড:
হালান্ড কেবল শারীরিক গঠনের দিক থেকেই অন্যদের থেকে আলাদা নন, তার জীবনযাপনও একেবারেই ভিন্নধর্মী। কোনো শর্টকাট বা জাদুকরি কৌশলের ওপর তিনি নির্ভর করেন না। বরং প্রতিদিনের কিছু মৌলিক নিয়ম ও শৃঙ্খলার ওপর ভর করেই গড়ে উঠেছে তার এই অবিশ্বাস্য ফিটনেস।
খাদ্যাভ্যাস ‘আদিম যুগের’: আধুনিক যুগের ফুটবলাররা যেখানে মেপে মেপে ক্যালরি হিসাব করে দামি সব সাপ্লিমেন্ট খান, হলান্ড সেখানে ভরসা রাখেন আদিম মানবের খাদ্যাভ্যাসে। তাঁর প্রতিদিনের ডায়েটের মূল উপাদান গরুর হৃৎপিণ্ড ও কলিজা।
পুষ্টিবিজ্ঞানের ভাষায় এসব সত্যিকারের ‘সুপারফুড’। পেশি গঠনে প্রয়োজনীয় ভিটামিন বি, আয়রন ও খনিজ উপাদানে ঠাসা থাকে এই অঙ্গগুলো।
পাশাপাশি হলান্ড খান ঘাস খেয়ে বড় হওয়া গরুর টমাহক স্টেক, সাওয়ারডো রুটির সঙ্গে ডিম আর একদম খাঁটি মধু। তার খাবারের তালিকায় প্রক্রিয়াজাত কোনো উপাদানের জায়গা নেই। প্রকৃতির সবচেয়ে খাঁটি খাবারগুলোই তাঁর শক্তির মূল উৎস।
মুখে টেপ মেরে ঘুমান: হলান্ডের কাছে ঘুম হলো দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ঘুমকে রীতিমতো একটি বৈজ্ঞানিক ‘প্রটোকলে’ পরিণত করেছেন। রাত সাড়ে ১০টা বাজলেই তাকে বিছানায় যেতে হবে—এটি একপ্রকার অলিখিত নিয়ম।
তবে বিছানায় যাওয়ার তিন ঘণ্টা আগে থেকেই হলান্ড চোখে বিশেষ একধরনের ব্লু-লাইট ব্লকিং চশমা পরে নেন। স্মার্টফোন বা টিভির নীল আলো যেন তাঁর মস্তিষ্কের মেলাটোনিন বা ঘুমের হরমোন উৎপাদনে কোনো বাধা দিতে না পারে, সে জন্যই এ ব্যবস্থা।
সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ঘুমানোর সময় মুখে একধরনের সার্জিক্যাল টেপ লাগিয়ে নেন! উদ্দেশ্য—মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে শুধু নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস ধরে রাখা।
নাক দিয়ে শ্বাস নিলে শরীরে নাইট্রিক অক্সাইডের মাত্রা বাড়ে। গভীর ঘুমের জন্য এটা অত্যন্ত কার্যকর। পুরো ঘুমের সময় তাঁর হার্ট রেট এবং শরীরের তাপমাত্রা নিখুঁতভাবে মাপার জন্য হাতের আঙুলে থাকে বিশেষ অরা রিং।
সকালের শুরুটা হয় প্রকৃতির সঙ্গে: ম্যানচেস্টারের আকাশ বেশির ভাগ সময়ই মেঘলা থাকে। কিন্তু হলান্ডের দিন শুরু হয় প্রকৃতির ছোঁয়া নিয়ে। ঘুম থেকে উঠেই অন্তত ১০ মিনিটের জন্য বাইরে হাঁটতে বের হন, ভোরের মিষ্টি রোদ সরাসরি চোখে লাগান।
এটা তার শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম বা প্রাকৃতিক ঘড়িকে সচল রাখে। যেদিন ম্যানচেস্টারের আকাশে সূর্যের দেখা মেলে না, সেদিন তিনি রেড লাইট প্যানেলের সামনে দাঁড়ান। এই লাল আলো তাঁর শরীরের কোষগুলোয় শক্তি জোগাতে সাহায্য করে।
বরফ-জল ও ঘামের খেলা: মাঠে ৯০ মিনিট দৌড়ানোর পর শরীরের যে ক্ষতি হয়, তা দ্রুত সারিয়ে তোলাটাই একজন অ্যাথলেটের আসল পরীক্ষা। হলান্ড সপ্তাহে চার থেকে পাঁচ দিন বরফ-ঠান্ডা পানির বাথটাবে নামেন এবং সনায় যান।
সনা এমন এক ঘর, যেখানে খুব গরম ও শুষ্ক পরিবেশ তৈরি করা হয়। এটি সাধারণত কাঠের ঘর হয় এবং ভেতরের তাপমাত্রা থাকে প্রায় ৭০–১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। হলান্ড এই সনায় কিছু সময় বসে ঘাম ঝরান। তারপর গোসল করেন ঠান্ডা পানি দিয়ে। এই পদ্ধতিতে তাঁর পেশির ক্লান্তি দূর করে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করে।
এর বাইরে প্রতিদিন নিয়ম করে ২০ মিনিট হিপ ফ্লেক্সর, গ্রোইন ও হ্যামস্ট্রিংয়ের স্ট্রেচিং বা ফ্লেক্সিবিলিটির জন্য কাজ করেন। এমনকি হালকা অনুশীলনের সময়ও কড়াভাবে খেয়াল রাখেন যেন শ্বাসপ্রশ্বাস শুধু নাক দিয়েই চলে।
শৃঙ্খলা: হালান্ডের এই রুটিন দেখলে মনে হবে, তিনি যেন কোনো এক প্রাচীন ভাইকিং যোদ্ধা, যিনি ভুল করে আধুনিক যুগে চলে এসেছেন! প্রক্রিয়াজাত খাবার বা কৃত্রিম আলোর এই আধুনিক দুনিয়ায় তিনি জীবনযাপন করছেন একেবারে আদিম ও প্রাকৃতিক নিয়মে।
ছোট ছোট এসব প্রাত্যহিক অভ্যাসের ধারাবাহিকতাই তাকে আজকের এই বিশ্বসেরা স্ট্রাইকারে পরিণত করেছে। আপনি তার সব অভ্যাসের সঙ্গে একমত না-ও হতে পারেন; কিন্তু একটা কথা মানতেই হবে—নিজের শরীরকে যত্ন করার এই যে চরম শৃঙ্খলাবোধ, এটাই হলান্ডকে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে ভয়ংকর অ্যাথলেটে পরিণত করেছে। সূত্র: রয়টার্স