শিরোনাম
◈ বাংলাদেশের বাজেট ইতিহাস: তাজউদ্দীন থেকে আমির খসরু, কে কত দিলেন? ◈ অর্ধ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়াল বাংলাদেশের অর্থনীতি, নতুন রেকর্ড জিডিপিতে ◈ পানি সংকটে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, বন্ধ ৩ ইউনিট ◈ ব্রাজিলকে হালকাভাবে নিলে ভুগতে হবে, বিশ্বকাপে নামার আগে মিডফিল্ডার ব্রুনোর হুম‌কি ◈ পা‌কিস্তা‌নের সা‌বেক ক্রিকেটার বা‌সিত আ‌লি বল‌লেন, বাংলাদেশ এশিয়ার দ্বিতীয় সেরা দল ◈ প্রশ্ন ছাড়াই কালো টাকা সাদা করার সুযোগ, আসছে নতুন বিধান ◈ প্রতিকূলতা জয় করে দৃশ্যমান বামনী ক্লোজার বাঁধ, উপকৃত হবেন ৯ লাখ মানুষ ◈ জুলাই থেকেই আংশিক বাস্তবায়ন হতে পারে নতুন পে-স্কেল, বাজেটে নেই আলাদা বরাদ্দ ◈ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে ইতিহাস গড়া বাজেট, লক্ষ্য প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা ◈ ৪৮ দলের মহারণ, আজ পর্দা উঠছে বিশ্বকাপের

প্রকাশিত : ১১ জুন, ২০২৬, ১০:৩৬ দুপুর
আপডেট : ১১ জুন, ২০২৬, ১১:০৪ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

বিশ্বকাপের পতাকায় সাজছে ঢাকা, ছাদে ছাদে উন্মাদনার ঢেউ

বিশ্বকাপের উন্মাদনা শুরু হয়ে গেছে। ঢাকা শহরের অলিগলি, পাড়া মহল্লা, ছাদ আর চায়ের দোকানের আড্ডায় ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে ফুটবলের মহাযজ্ঞ। কোথাও আকাশছোঁয়া আর্জেন্টিনার পতাকা, কোথাও ব্রাজিলের হলুদ সবুজ রঙে মোড়া ছাদ। আবার কোথাও জার্মানি, পর্তুগাল, স্পেন কিংবা ফ্রান্সের সমর্থকেরা ব্যানার, ফেস্টুন আর আলোকসজ্জায় জানিয়ে দিচ্ছেন নিজেদের অবস্থান।

বাংলাদেশ বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে না খেললেও বিশ্বকাপ এলে এই দেশের মানুষের আবেগের কোনো ঘাটতি থাকে না। বরং ফুটবল বিশ্বকাপ যেন এ দেশের মানুষের আরেকটি উৎসব। ঈদের আনন্দ যেমন ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি বিশ্বকাপের আমেজও ছড়িয়ে যায় শহরের প্রতিটি কোণে।

সবচেয়ে বেশি উন্মাদনা দেখা যাচ্ছে পুরান ঢাকায়। লক্ষ্মীবাজার, জনসন রোড, বাহাদুর শাহ পার্ক, রায়সাহেব বাজার, তাঁতীবাজার, কলতাবাজার ও হোসেনী দালান এলাকাগুলো যেন ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে একেকটি ফুটবল নগরীতে। কয়েক দিন আগে শত শত সমর্থককে নিয়ে বের হয়েছে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। প্রিয় দলের পতাকা হাতে তরুণদের উচ্ছ্বাস দেখে মনে হয়েছে, বিশ্বকাপ যেন তাদের দরজায় কড়া নাড়ছে।

পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের বাসিন্দা রকিব হোসেন ছোটবেলা থেকেই আর্জেন্টিনার সমর্থক। বাড়ির ছাদে প্রায় ৪০ ফুট দীর্ঘ একটি পতাকা টানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। রকিবের কথা- বিশ্বকাপ এলেই আমাদের এলাকায় অন্যরকম পরিবেশ তৈরি হয়। খেলা শুরুর আগেই আমরা উৎসব শুরু করে দিই। রাত জেগে খেলা দেখা, বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা আর প্রিয় দলের জয় উদযাপন, সবকিছু মিলিয়ে বিশ্বকাপ আমাদের কাছে অনেক আনন্দের।

তাতীবাজার এলাকার ব্রাজিল সমর্থক আবদুল কাদেরের চোখে বিশ্বকাপ মানেই শৈশবের স্মৃতি। তিনি বলেন, ‘চার বছর পরপর এই সময়টার জন্য অপেক্ষা করি। আগে বাবা আর বড় ভাইদের সঙ্গে খেলা দেখতাম, এখন ছেলেমেয়েদের নিয়ে দেখি। দল আলাদা হতে পারে, কিন্তু ফুটবল আমাদের সবাইকে এক করে দেয়।’

পুরান ঢাকার মানুষের কাছে বিশ্বকাপ শুধুই একটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি এক সামাজিক মিলনমেলা। চার বছর পরপর ফিরে আসা এই আয়োজন ঘুচিয়ে দেয় অনেক দূরত্ব। রাজনৈতিক মত, পেশা, বয়স কিংবা সামাজিক অবস্থানের বিভাজন ভুলে সবাই এক হয়ে যায় ফুটবলের ভালোবাসায়।

টিকাটুলীর কেএম দাস লেন, যা এখন অনেকের কাছে ‘ফিফা গলি’ নামে পরিচিত, সেখানে গেলে মনে হবে যেন ঢাকার ভেতর ছোট্ট একটি ফুটবল জগৎ তৈরি হয়েছে। দেয়ালজুড়ে আঁকা কিংবদন্তি ফুটবলারদের প্রতিকৃতি, রঙিন চিত্রকর্ম আর শিশু-কিশোরদের ফুটবল নিয়ে ব্যস্ততা এলাকাটিকে দিয়েছে এক অন্যরকম সৌন্দর্য। বৃষ্টিভেজা বিকেলেও সেখানে ফুটবল থামে না।

মিরপুর, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, কল্যাণপুর, বাসাবো, সবুজবাগ, যাত্রাবাড়ী, খিলগাঁও, বাড্ডা ও উত্তরাসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়ও বাড়ছে বিশ্বকাপের আমেজ। ছাদে ছাদে উড়ছে প্রিয় দলের পতাকা। অনেক জায়গায় চলছে পতাকা টানানোর নীরব প্রতিযোগিতা। কে সবচেয়ে বড় পতাকা ওড়াবে, কার এলাকার সাজসজ্জা সবচেয়ে আকর্ষণীয় হবে, তা নিয়ে চলছে তরুণদের ব্যস্ততা।

বিশ্বকাপকে ঘিরে রাজধানীর আরেক প্রাণকেন্দ্র গুলিস্তান। ফুটপাতের দোকানগুলো এখন রঙিন জার্সি, পতাকা, বাঁশি, মাথার ফিতা ও নানা স্মারকে ভরে উঠেছে। আকাশি সাদা আর হলুদ সবুজ জার্সির চাহিদা সবচেয়ে বেশি। বিশ্বকাপ যত এগিয়ে আসছে, বিক্রিও তত বাড়ছে। অনেকেই আগেভাগেই কিনে রেখেছেন প্রিয় দলের জার্সি।

গুলিস্তানের পতাকা বিক্রেতা মো. সোহেল মিয়া বলেন, ‘বিশ্বকাপের আগে আমাদের ব্যবসা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের পতাকা। অনেকেই বড় আকারের পতাকা খুঁজছেন ছাদে টানানোর জন্য। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ক্রেতাদের ভিড় লেগেই আছে। মনে হচ্ছে বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই ফুটবলের উৎসব শুরু হয়ে গেছে।’

ঢাকার ফুটবল উন্মাদনার সবচেয়ে মজার দিক হলো, এখানে সমর্থন শুধু খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও দেখা যায় ভিন্ন ভিন্ন দলের সমর্থন। বাবা ব্রাজিল, ছেলে আর্জেন্টিনা, মেয়ে জার্মানি, আর বড় ভাই পর্তুগালের সমর্থক। খেলার রাতে তখন বসার ঘরই হয়ে ওঠে ছোট্ট এক স্টেডিয়াম। গোল হলেই একপক্ষের উল্লাস, অন্যপক্ষের দীর্ঘশ্বাস।

বিশ্বকাপ এলে চায়ের দোকানগুলোর চেহারাও বদলে যায়। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে তর্ক, বিশ্লেষণ আর ভবিষ্যদ্বাণী। কে জিতবে বিশ্বকাপ, কোন দল সবচেয়ে শক্তিশালী, কোন খেলোয়াড় সবচেয়ে বড় তারকা এসব নিয়েই চলে অবিরাম আলোচনা। অনেক সময় এসব তর্কের উত্তাপ মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকেও হার মানায়।

বিশ্বকাপ মানুষকে এক করে। ফুটবলপ্রেমীরা নিজেদের প্রিয় দল নিয়ে বিভক্ত থাকলেও খেলা শেষে আবারও সবাই একসঙ্গে হাসে, গল্প করে, স্মৃতি ভাগাভাগি করে। ফুটবল তখন হয়ে ওঠে ভালোবাসার এক সেতুবন্ধন।

আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিলের রাজধানী নয় ঢাকা। তবু বিশ্বকাপ এলেই এই শহরের ছাদে, গলিতে, চায়ের দোকানে আর মানুষের হৃদয়ে জন্ম নেয় এক টুকরো বুয়েনেস আইরেস, এক টুকরো রিও ডি জেনেইরো। গভীর রাতে যখন কোনো ম্যাচে গোল হয়, তখন ঢাকার অলিগলিতে যে উল্লাস ধ্বনি ওঠে, তা মনে করিয়ে দেয় ফুটবল এই দেশের মানুষের হৃদয়ের কতটা গভীরে জায়গা করে নিয়েছে।

ফুটবলের বাঁশি বাজার আগেই তাই ঢাকা আবারও পরিণত হচ্ছে পতাকার শহরে। রঙিন কাপড়ে মোড়া ছাদগুলো যেন ঘোষণা দিচ্ছে—বিশ্বকাপ আসছে। আর বিশ্বকাপ মানেই আবেগ, বিশ্বকাপ মানেই উৎসব, বিশ্বকাপ মানেই কোটি মানুষের একসঙ্গে স্বপ্ন দেখার নাম। ঢাকা শহর আবারও প্রস্তুত, ফুটবলের সবচেয়ে বড় উৎসবকে নিজের করে বরণ করে নিতে।

সূত্র: যুগান্তর

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়