মহসিন কবির: অঙ্গসংগঠনগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যে ঢেলে সাজাচ্ছে বিএনপি। এজন্য ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর কাজ গুছিয়ে আনা হয়েছে।
দলের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন উপলক্ষে দলীয় নির্দেশনা বাস্তবায়ন, নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে ঝিমিয়ে পড়া তৃণমূল তথা সংগঠনকে চাঙা করা এবং আগামী দিনে মাঠের কর্মসূচিকে আরো জোরদার করতে চাইছে বিএনপি। তারই অংশ হিসেবে নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে উদ্দীপনা সৃষ্টির লক্ষ্যে অঙ্গসংগঠনগুলোর কমিটির দিকে নজর দিচ্ছে দলের হাইকমান্ড। দলের নির্দেশনা অনুযায়ী সংগঠনগুলো ইতোমধ্যেই তাদের কার্যক্রম গুছিয়ে নিয়েছে বলে জানা গেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে দ্রুতই সিরিজ আকারে অঙ্গসংগঠনগুলোর কমিটির শীর্ষ পদগুলোয় পরিবর্তন আসতে পারে।
বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনগুলোর হাফ ডজন নেতা আমার দেশকে জানিয়েছেন, ১১টি অঙ্গসংগঠনের মধ্যে ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলকে বরাবরই গুরুত্ব দেওয়া হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও ‘আপসহীন নেত্রী’খ্যাত বেগম খালেদা জিয়াও সংগঠন তিনটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। এ তিনটি সংগঠনের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। এছাড়া অনেক ইউনিটের কমিটি বছরের বছর ঝুলে আছে। যে কারণে স্বাভাবিকভাবেই নতুন নেতৃত্ব তৈরির পথ কিছুটা রুদ্ধ।
অন্যদিকে যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ শীর্ষ চার নেতার তিনজনই সংসদ সদস্য (এমপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে একজন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। সংগঠন ও সরকারের দায়িত্ব পালনে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। সে কারণে দলের নেতৃত্ব ছাড়তে চাচ্ছেন তারা। পাশাপাশি আগামী দিনে সংগঠনকে গতিশীল করতে নতুনদের হাতে দায়িত্ব হস্তান্তরে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে আগ্রহও প্রকাশ করেছেন তাদের কেউ কেউ। সে কারণে নেতৃত্বের প্রবাহ ঠিক রাখার পাশাপাশি সরকার ও অঙ্গসংগঠনের কাজ গতিশীল করতে কমিটিগুলো ঢেলে সাজানোর আলোচনা মাঠে রয়েছে। সে অনুযায়ী ঈদের আগেই শীর্ষ তিন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটির ঘোষণা আসতে পারে। তবে কোনো কারণে সেটি হয়ে না উঠলে ঈদের পর বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সুবিধামতো সময়ে শীর্ষ তিন অঙ্গসংগঠনসহ অন্য কমিটিগুলোর শীর্ষপদে রদবদল আসতে পারে।
বিএনপি ও তিন সহযোগী সংগঠন যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল এবং ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে গত ৯ মে রাজধানীর ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শাসন ক্ষমতায় বসার আড়াই মাসের মাথায় নেতাকর্মীদের সঙ্গে এটিই বড় পরিসরে বিএনপির প্রথম কোনো সাংগঠনিক মতবিনিময় সভা। যেখানে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য, সব বিভাগীয় সাংগঠনিক ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এবং জেলা ও মহানগর কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদল—এ তিন সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির পাঁচজন করে শীর্ষ নেতাকে সভায় আমন্ত্রণ জানানো হয়।
সভায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসনের নির্দেশনা দিয়েছেন তারেক রহমান। এ জন্য চলতি বছরের মধ্যে মূল দলের জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে জেলা ও উপজেলার সাংগঠনিক কার্যক্রম শেষ করতে চায় বিএনপি। তবে এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অন্যান্য অঙ্গসংগঠন বিশেষ করে ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতৃত্বের পুনর্বিন্যাসের চিন্তা করছে বিএনপি।
জানতে চাইলে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল গণমাধ্যমকে বলেছেন, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন তো আমাদের ১১টি। কিন্তু এর মধ্যে তিনটি সংগঠনের ওপর দলের আস্থা বেশি। এটা সব সময়ই হয়ে থাকে। ম্যাডাম (মরহুম খালেদা জিয়া) থাকতে তিনিও তা-ই করতেন। এ তিন সংগঠনকে একটু আপার হ্যান্ডে রাখতেন। সুতরাং বিএনপির কাউন্সিলের আগে এগুলোর কমিটিতে পরিবর্তন আসতে পারে—এটা তো স্বাভাবিক। আর এগুলোর মধ্যে কোনো কোনো ইউনিটের কমিটি এখনো পূর্ণাঙ্গ হয়নি। যে কজনের কমিটি আগে দিয়েছিল, ওই অবস্থাতেই চলছে এখনো। সুতরাং এগুলো বোধহয় খুব তাড়াতাড়ি হবে।
বিএনপির কাউন্সিলের আগে আগে দলের অঙ্গসংগঠনগুলোর কমিটি ঢেলে সাজানোর বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে জানিয়ে দলের ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু গণমাধ্যমকে বলেছেন, কাউন্সিল নিয়ে আলোচনা চলছে। ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর কমিটি ঢেলে সাজানোর বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। বিএনপি কাউন্সিল করলে তার শাখা-প্রশাখা বলতে যা বোঝায়, তা তো এই অঙ্গসংগঠনগুলোই। সেগুলো গুছিয়ে বিএনপির কাউন্সিল হতে পারে। তাই স্বাভাবিক কারণে কাউন্সিলের আগে এ কমিটিগুলো পুনর্গঠনের বিষয়টি আলোচনায় আছে।
কাউন্সিল উপলক্ষে দলের অবশিষ্ট কাজে শিগগির হাত দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রিপন গণমাধ্যমকে বলেছেন, আমাদের মূল সংগঠনের (বিএনপি) কাউন্সিলের চিন্তা-ভাবনা আছে। গত বছরের শুরুতে বিভিন্ন জেলা-উপজেলা ও ইউনিয়নের কমিটি গঠনের লক্ষ্যে কাউন্সিল আয়োজন করে বিএনপি। কিন্তু ততদিনে নির্বাচন চলে আসায় আমাদের কাজগুলো বন্ধ ছিল। তবে শিগগির আমরা অবশিষ্ট সাংগঠনিক কাজগুলো শুরু করব। আমরা বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্বে আছি, এ কাজগুলো নির্বাচনের কারণে স্থগিত ছিল; এখন নির্বাচন শেষ হয়ে গেছে। আমরা আগামী কাউন্সিলে লক্ষ্য রেখে সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর কাউন্সিল শেষ করার কাজে হাত দেব।
বিএনপির পক্ষ থেকে অঙ্গসংগঠনগুলোর নির্দেশনার বিষয়ে যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে বিএনপি ও ছাত্রদলের একাধিক সূত্র আমার দেশকে জানিয়েছে, ছাত্রদলের সাবেক ও বর্তমান বেশকিছু নেতাকে যুবদল এবং স্বেচ্ছাসেবক দলে পদায়ন করা হতে পারে। সে কারণে এ তিনটি সংগঠনের কমিটি খুব কাছাকাছি সময়ে হবে। তাই কমিটি গুছিয়ে আনার জন্য বিএনপির পক্ষ থেকে তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম সারির একজন নেতা গণমাধ্যমকে বলেছেন, আমাদের তিনটি সংগঠনকেই (ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দল) ঢেলে সাজানো হবে। এর মধ্যে একমাত্র ছাত্রদলকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে জেলাসহ সব কমিটি করার জন্য। ওই ছাত্রনেতা আরো বলেন, আমার কাছে যে তথ্য আছে, সেটি অনুযায়ী ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের একসঙ্গেই বা কাছাকাছি সময়েই হয়তো কমিটি ঘোষণা করা হবে।