এল আর বাদল: বাংলাদেশে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি বড় রাজনৈতিক ম্যান্ডেট পেয়ে এখন সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ১২ই ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ে পাওয়া এই ম্যান্ডেট দলটিকে এককভাবে দেশের সংবিধান সংশোধনসহ সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিয়েছে।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত প্রথম এই নির্বাচনে বড় ম্যান্ডেট পাওয়া এই দলটির ওপর তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করার চাপও থাকবে বেশি। --------- বিবিসি বাংলা
দেশটিতে বিপর্যস্ত অর্থনীতি, বিভক্তি ও অস্থির এক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন হয়েছে। এই নির্বাচনকে ঘিরে ঐক্য এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার বিষয়েই মূল প্রত্যাশা ছিল সাধারণ মানুষের। ভোটের পরে মানুষের মধ্যে স্বস্তি কাজ করছে। দেশের রাজনীতি স্থির হবে, অর্থনীতিসহ সব ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরবে, এমন আশা-প্রত্যাশার কথা আসছে।
আবার শঙ্কাও আছে। কারণ, সংসদে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে যখন কোনো দল সরকার গঠন করে, তখন তাদের 'ফ্যাসিবাদী বা কতৃত্ববাদী' শাসক হওয়ার সুযোগ থাকে। এর উদাহরণ হিসেবে আসছে শেখ হাসিনার শাসনকাল।
দেশে নজিরবিহীন বিদ্বেষ-বিভাজনের মধ্যে বিএনপির জয়ে মানুষের স্বস্তি; আবার শঙ্কা, দুটি বিষয়ই রয়েছে বিএনপির সামনে। প্রশ্ন হচ্ছে, এখন সরকার গঠনের পর কোন পথে হাঁটবে বিএনপি?
যদিও নির্বাচন জয়ের পর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সিঁড়িতে পা ফেলা বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, বিভক্তির বদলে ঐক্য ও শান্তি, স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাই তাদের সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হবে।
এবারের নির্বাচনে ভূ-রাজনীতির ইস্যুও বেশ আলোচনায় ছিল।
আঞ্চলিক ক্ষেত্রে ভারত-পাকিস্তান, চীন এবং বৃহত্তর পরিসরে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর বাংলাদেশের এই নির্বাচনের দিকে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি নজর ছিল। অনেক ক্ষেত্রে ঢাকায় এই দেশগুলোর কূটনীতিকদের তৎপরতা দৃশ্যমানও হয়েছে।
ঢাকায় কূটনীতি বিষয়ে বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বিএনপির নিরঙ্কুশ জয়ে বাংলাদেশের সহযোগী ওই দেশগুলো বিশেষ করে প্রতিবেশি ভারত বেশি স্বস্তি পেয়েছে।
তবে ভূ-রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিভাবে ভারসাম্য রাখবে, সেটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাংলাদেশের নতুন নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের জন্য।
প্রসঙ্গত, জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের একটিতে আগেই নির্বাচন স্থগিত রাখা হয়। ২৯৯টি আসনে ভোট হওয়ার পর দুটিতে ফলাফল স্থগিত রাখা হয়েছে। ফলে ২৯৭টি আসনের ফলাফলে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি ও তাদের মিত্র দলগুলো তিনটি আসন পেয়েছে।
অন্যদিকে ধর্মভিত্তিক দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন। এরমধ্যে জামায়াত এককভাবে পেয়েছে ৬৮টি এবং জুলাই গণ-অভ্যত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি পেয়েছে ছয়টি আসন।
বড় চ্যালেঞ্জ আইন শৃঙ্খলা ও অর্থনীতি
জুলাই গণ-অভ্যত্থানে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ সাড়ে পনেরো বছরের শাসনের পতনের পর আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়ে।
পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীগুলো সে সময় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। এই বাহিনীগুলোর উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সদস্যদের একটা বড় অংশের বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনে হত্যাকাণ্ড চালানোসহ দমন-পীড়নের অভিযোগ ওঠে। তাদের অনেকে গ্রেফতার হন এবং অনেকে পালিয়ে যান।
গণ-অভ্যুত্থানের পরে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার তাদের আঠারো মাসের শাসনে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীগুলোকে কতটা কার্যকর অবস্থানে আনতে পেরেছে, সে ব্যাপারে সন্দেহ আছে বিশ্লেষকদের।
এমন প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েই সবচেয়ে বেশি সমালোচনা রয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে। ওই সরকার পরিস্থিতি নিয়েন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
মানবাধিকার সংগঠক নূর খান লিটনের বক্তব্য হচ্ছে, গণ-অভ্যুত্থানের পর পরই মব বা দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বিভিন্ন জায়গায় ক্ষমতাচ্যুতদের বাড়ি-ঘরে, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুরের যে ধরনের ঘটনা ঘটে, তা অব্যাহত থাকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়টাতে। এসব ঘটনার অনেক ক্ষেত্রে ওই সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
যদিও এ ধরনের পরিস্থিতির মধ্যেই সেনাবাহিনীর সক্রিয় ভূমিকায় গত ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
কিন্তু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে স্থিতিশীল পরিবেশ ফিরিয়ে আনা নতুন রাজনৈতিক সরকারের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।
বিএনপিও বলেছে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করাই তাদের প্রথম লক্ষ্য। তবে এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন বেশ কঠিন হবে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।
শেখ হাসিনার শাসনের শেষ পর্যায়ে দেশের ব্যাংকখাত ভেঙে পড়েছিল; বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল অর্থনীতি। অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে বলা হয়ে থাকে।
তবে অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে রয়েছে।
ফলে অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানো নতুন সরকারের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে বিএনপির নেতারাই বলছেন। সেজন্য এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার বিষয়কে অগ্রাধিকারের তালিকায় দুই নম্বরে রাখার কথা বলছেন তারা।
বেশি স্বস্তি পেয়েছে ভারত
বাংলাদেশের এবারের নির্বাচনের দিকে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো এবং ভারত, পাকিস্তান, চীনের যে বেশি নজর ছিল, তার প্রমাণ দেখা গেছে, নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর পরই বিএনপি নেতা তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছে ওই দেশগুলো।
ভারত ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীরা টেলিফোন করেও কথা বলেছেন মি. রহমানের সঙ্গে। সাবেক কূটনীতিক মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বিবিসিকে বলেন, বিএনপির এই জয়ে পশ্চিমা দেশগুলোসহ বাংলাদেশের সহযোগিরা স্বস্তি পেয়েছে। বেশি স্বস্তি পেয়েছে ভারত।
এর পেছনে নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলোর রাজনৈতিক আদর্শের বিষয় রয়েছে বলে মনে করেন মি. আহমেদ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি মধ্যপন্থি এবং কখনও কখনও উদার দক্ষিণপন্থি দল হিসেবে পরিচিতি পেয়ে আসছিল। কিন্তু এবার নির্বাচনে দলটি নিজেদের উদারপন্থী দল হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।
ভোটে বিজয়ের পরে তারেক রহমানের সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বলেছেন, নির্বাচনে এবার উদারপন্থার বিজয় হয়েছে।
মুন্সি ফয়েজ আহমেদের বক্তব্য হচ্ছে, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপির বাইরে অন্য যে দলগুলো আছে, তাদের মধ্যে জামায়াতসহ প্রভাবশালী দলগুলো ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করে এবং ডানপন্থী দল হিসেবে পরিচিত। যদিও জামায়াতের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের মনোভাব আগের থেকে অনেক পরিবর্তন হয়েছে।
কিন্তু তাদের কাছে এমুহূর্তে বিএনপির বিকল্প অন্য দলগুলো নয় বলে মি. আহমেদ মনে করেন। সেকারণেই বিএনপির বিজয়ে তাদের স্বস্তি।
আরেকজন সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবিরও পরিস্থিতিটাকে একইভাবে দেখেন।
তবে ভারতের স্বস্তি যে বেশি, এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সাবেক কূটনীতিকেরা বলছেন, শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারতে আশ্রয় নিয়ে সেখানেই অবস্থান করছেন। সে বিষয়টিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
মন্সি ফয়েজ আহমেদ মনে করেন, একটা ভাল সম্পর্ক দুই দেশেরই প্রয়োজন। আঠারো মাসের বৈরিতা থেকে ভারতও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল করার তাগিদ অনুভব করছে। সেজন্য রাজনৈতিক সরকারের জন্য তাদের অপেক্ষা ছিল।
ভূ-রাজনীতি, ব্যালান্স করাই চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভূ-রাজনীতিতে আঞ্চলিক ও বৃহত্তর পরিসর, দুটি ক্ষেত্রেই ব্যালান্স করাটা বিএনপি সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ।
আঞ্চলিক দিক থেকে আওয়ামী লীগের শাসনে ভারতের সঙ্গে আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সেই সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভারতের শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ক টিকে রয়েছে।
তবে পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করছে, যা অনেক ক্ষেত্রে দৃশ্যমানও হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের বড় বিনিয়োগ রয়েছে। এই দেশের সঙ্গেও আওয়ামী লীগ সরকারের একটা ভাল সম্পর্ক ছিল।
চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যালান্স করে চলাটা আওয়ামী লীগের জন্যও বেশ চ্যালেঞ্জের ছিল বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।
সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলেন, যদিও ভারত এখন সম্পর্ক উন্নয়নের তাগিদ অনুভব করছে। বিএনপির রাজনৈতিক সরকার সেই সম্পর্কের টানাপোড়েন কাটিয়ে উঠতে পারবে। কিন্তু সেখানে সমস্যাটা হতে পারে পাকিস্তানকে ঘিরে।
এছাড়া একইসঙ্গে চীন ও ভারতের মধ্যে ভাল সম্পর্ক অব্যাহত রাখাটাও বিএনপির জন্য কঠিন হতে পারে বলে মি. কবির মনে করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্ব পরিসরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করা যাবে, সেটিও একটি চ্যালেঞ্জ।
কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে ভোটের কয়েকদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ যে ট্যারিফ চুক্তি সই করেছে। তাতে বলা আছে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কোনো বিষয় এলে, সেখানে তৃতীয় কোনো পক্ষ ভূমিকা রাখতে পারবে না। বিএনপি নেতারা পরিস্থিতিটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখতে রাজি নন।
দলটির নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নবনির্বাচিত এমপি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিবিসি বলেন, তারা একটি দেশের দিকে পুরোপুরি ঝুঁকে পড়বেন না অর্থাৎ একটি দেশকে ঘিরেই পররাষ্ট্রনীতি তারা নেবেন না। আওয়ামী লীগের শাসনামলে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয় বারবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচনায় এসেছে। সেদিকেই ইঙ্গিত রয়েছে বিএনপি নেতার বক্তব্যে।
অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবার আগে বাংলাদেশ-নির্বাচনে বিএনপির এই স্লোগানের কথাও উল্লেখ করেন মি. চৌধুরী। তিনি বলেছেন, নিজ দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব, মর্যাদা রক্ষা করে বিএনপির নতুন সরকার যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত-পাকিস্তানসহ সব দেশের সঙ্গে দ্দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক রক্ষা করবে।
এতে কোনো চ্যালেঞ্জ বা ভারসাম্য রাখার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা থাকবে না বলে বিএনপি মনে করছে। তবে ভূ-রাজনীতির আঞ্চলিক ও বিশ্ব পরিসরে বাস্তবতা ভিন্ন বলে উল্লেখ করছেন বিশ্লেষকেরা।