মহসিন কবির: বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে আসার পর উজ্জীবিত হয়েছে দলের নেতাকর্মীরা। এটা তারা জানান দিচ্ছে বার বার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলে আদেশ না মেনে নির্বাচন করলে দুইকুলই হরাতে হতে পারে নেতাদের। প্রায় অর্ধশত আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছে। এরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবেন। এদের সামলাতে না পারলে দলকেও খেসারত দিতে হতে পারে।
বিএনপি নেতারা বলছেন, তারেক রহমানের ফেরার মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সরাসরি নেতৃত্বের যে শূন্যতা ছিল তা কেটে গেছে। নেতাকর্মীদের মধ্যে তারেক রহমানকে নিয়ে যে উদ্দীপনা সেটি ভোটের মাঠে বড় সহায়ক ভূমিকা রাখবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীরাও বেশ উচ্ছ্বসিত। তবে কিছু আসনে প্রার্থী জটিলতা আর কোন্দল ভোগাচ্ছে দলটিকে।
গত ৩ নভেম্বর বিএনপি প্রথম পর্যায়ে ২৩৭ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে। একদিন পরেই মাদারীপুর-১ আসনের ঘোষিত প্রার্থী কামাল জামাল মোল্লার নাম স্থগিত করা হয়। পরে ৪ ডিসেম্বর আরও ৩৬টি আসনে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করে দলটি। পরবর্তী ২৮ আসনে প্রার্থী তালিকা ঘোষণা না করলেও চূড়ান্ত মনোনয়ন দিয়েছে। এর মধ্যে মনোনয়ন নিশ্চিত হয়েছে ৮ জোট নেতার। এর বাইরে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করবেন আরও ৫ নেতা।
বিএনপি নেতাকর্মীরা জানান, বিএনপির প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পর থেকে বিভিন্ন আসনে বিদ্রোহ শুরু করেন মনোনয়নবঞ্চিত নেতা ও তাদের অনুসারীরা। কোনো কোনো স্থানে এই বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ লাভ করে। হতাহতের ঘটনাও ঘটে। মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের অভিযোগ, বিগত দিনের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা, জনপ্রিয়তাকে মাপকাঠি হিসেবে না নিয়ে কতিপয় সিন্ডিকেটের তল্পিবাহকদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এতে ত্যাগী আর যোগ্যরা উপেক্ষিত হয়েছেন আর নব্য ও হাইব্রিডদের মূল্যায়ন করা হয়েছে।
যদিও বিএনপির পক্ষ থেকে প্রার্থী তালিকা ঘোষণার সময়েই বলা হয়েছিল, ঘোষিত তালিকা প্রাথমিক কিংবা সম্ভাব্য। এই প্রার্থীরা চূড়ান্ত নন এবং প্রয়োজনে যে কোনো সময় পরিবর্তন হতে পারে। দলের স্থায়ী কমিটি মনে করে, পার্লামেন্টারি বোর্ড যদি মনে করে, তারা কোনো আসনে পরিবর্তন আনবে, সেটি নিঃসন্দেহে নিয়ম মেনে পরিবর্তন নিয়ে আসবে।
তারই ধারাবাহিকতায় ১৬টি আসনে রদবদল করেছে বিএনপি। এর মধ্যে কয়েকটি আসনে নিজ দলের প্রার্থীকে সরিয়ে জোটের প্রার্থীকে সমর্থন জানানো হয়েছে। আবার কোনো কোনো আসনে বয়স্ক, ঋণখেলাপিসহ আরও কিছু কারণে প্রার্থী বদল করা হয়েছে। ওইসব আসনে যোগ্যরা মূল্যায়িত হওয়ায় নেতাকর্মীদের মধ্যে স্বস্তি এলেও প্রায় অর্ধশত আসনে ক্ষোভ রয়েই গেছে। এসব আসনের বেশির ভাগ জায়গায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন নেতারা। আজ মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিনে তারা মনোনয়ন দাখিল করবেন।
যেসব আসনে রদবদল
গত কয়েক দিনের ধারাবাহিকতায় গতকাল রোববারও দেশের পাঁচটি আসনে মনোনয়ন রদবদল করা হয়েছে। এ নিয়ে মোট ১৭টি আসনের মনোনয়ন পরিবর্তন করেছে দলটি। এর মধ্যে ঢাকা-১৭ আসনে সমমনা শরিক দল বিজেপি চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থকে দেওয়া হলেও এটি পরিবর্তন করা হয়েছে। এখানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজে নির্বাচন করবেন। পার্থকে ভোলা-১ আসনে চূড়ান্ত করা হয়েছে। সেখানে জেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম নবী আলমগীরকে মনোনয়ন দিয়েছিল বিএনপি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনে সাবেক এমপি মুশফিকুর রহমানকে দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। বয়স ও অসুস্থতার কারণে তাঁর স্থানে বিএনপি নেতা কবির আহমদ ভূইয়ার মনোনয়ন চূড়ান্ত করেছে দলটি।
চট্টগ্রাম-৬ আসনে দল থেকে মনোনয়ন পেয়েছিলেন গিয়াস কাদের চৌধুরী। নানা বিতর্কের কারণে গতকাল সেখানে মনোনয়ন পরিবর্তন করে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা গোলাম আকবর খোন্দকারকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয় বিএনপি।
এর আগে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপি থেকে চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছেন আবুল কালাম। তিনি তিনবারের সংসদ সদস্য ও মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি। এর আগে এই আসনে মনোনয়ন পেয়েছিলেন ব্যবসায়ী মাসুদুজ্জামান মাসুদ।
স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে পারেন যারা
চট্টগ্রাম-১২ আসনে এস আলম গ্রুপের গাড়িকাণ্ডে দল থেকে বহিষ্কৃত ও বিতর্কিত নেতা এনামুল হককে মনোনয়ন দেওয়া নিয়ে নেতাকর্মীদের চাপে রয়েছে বিএনপি। এই আসনে কেন্দ্রীয় বিএনপির সাবেক সদস্য ও আওয়ামী লীগ আমলে গুমের শিকার সৈয়দ সাদাত আহমেদ আজ মনোনয়ন জমা দেবেন বলে জানা গেছে।
এলাকার বিএনপি নেতা আকরামুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেছেন, দল থেকে পরিচ্ছন্ন, শিক্ষিত, মার্জিতদের মূল্যায়ন করার আশ্বাস দেওয়া হলেও এই আসনে তার বিপরীত হয়েছে। এতে ফলাফল বিপর্যয় ঘটতে পারে।
নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনে বিএনপির প্রয়াত নেতা ফজলুর রহমান পটলের ছোট মেয়ে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট ফারজানা শারমিন পুতুলকে মনোনয়ন দিয়েছে দল। সেখানে বিএনপির
কেন্দ্রীয় সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু স্বতন্ত্র নির্বাচন করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। এই নেতা বলেন, ‘আমি আশা করছি, শেষ মুহূর্তে হলেও দল আমাকে মনোনয়ন দেবে। আর যদি মনোনয়ন না-ও দেয়, তাহলে এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবোই। সে লক্ষ্যে ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছি। ব্যাপক সাড়াও পাচ্ছি।’
নোয়াখালী-৫ আসনে দল মনোনীত প্রার্থী ফকরুল ইসলামকে মনোনয়ন দেওয়ায় গতকাল বিএনপিকে উকিল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বরাবর মিরাজ উদ্দিন নামে এক ব্যক্তির পক্ষে এ নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট ড. মুহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন বাবু। এই আসনে প্রার্থী বদল না হলে কেন্দ্রীয় নেতা বজলুর করিম চৌধুরী আবেদ স্বতন্ত্র নির্বাচন করবেন।
ঢাকা-১২ আসনে শুরুতে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল বিএনপি নেতা সাইফুল আলম নিরবকে। তাঁকে পরিবর্তন করে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হককে আসনটি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এই আসনেও নিরব স্বতন্ত্র নির্বাচন করবেন।
এদিকে দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় সাবেক এমপি নুরুল কবির শাহীন দল থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি ময়মনসিংহ-৮ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। এই আসনে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে লুৎফুল্লাহেল মাজেদকে।
পটুয়াখালী-৩ আসনে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরের আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান মামুন নির্বাচন করার ঘোষণা আগেই দিয়েছেন। অন্যদিকে সদ্য যোগদানকারী রাশেদ খানের ঝিনাইদহ-২ আসনেও স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনে এই আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেছিলেন।
এর বাইরে কুষ্টিয়া-৪, জামালপুর-২, দিনাজপুর-২ আসনসহ অন্তত পঞ্চাশটির মতো আসনে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন মনোনয়নবঞ্চিত বিএনপি নেতারা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তপশিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ হয়েছে গত সোমবার। রিটার্নিং কর্মকর্তা কর্তৃক মনোনয়নপত্র বাছাই চলবে মঙ্গলবার থেকে রোববার পর্যন্ত। মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল দায়েরের তারিখ ৫ থেকে ৯ জানুয়ারি। আপিল নিষ্পত্তির তারিখ ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ২০ জানুয়ারি। প্রতীক বরাদ্দ ২১ জানুয়ারি এবং ভোটগ্রহণ ১২ ফেব্রুয়ারি।