এল আর বাদল : বিতাড়িত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে না দেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল ভারত। বেশি দিন আর রাখতেও চাচ্ছে না। আবার তৃতীয় কোনো দেশে স্থায়ীভাবে অবস্থানের ব্যবস্থা করে দিতে পারেনি। শেখ হাসিনাকে নিয়ে অস্বস্তিকর এ অবস্থায় ভারতে অবস্থান সম্পূর্ণই শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। বাহ্যত এমন কথা বললেও ভেতরের অবস্থা অন্য রকম। জয়শঙ্কর এও বলেছেন, শেখ হাসিনা যে পরিস্থিতিতে এখানে এসেছেন সেটি মূল বিষয়। তবে তার সিদ্ধান্ত তাকেই নিতে হবে।
শেখ হাসিনা দিল্লির কাছে সাময়িক সময়ের জন্য আশ্রয়ের অনুমতি চাইলেও দেশটিতে তার অবস্থান দীর্ঘ হয়েছে। ভারতের নামকরা কূটনীতিকেরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য তদবির করলেও ফল আসেনি। কূটনীতিতে বিশ্বজুড়ে ভারতের সুনাম থাকলেও শেখ হাসিনা ইস্যুতে এখন পর্যন্ত পেরে ওঠেনি। তাকে সুরক্ষা দেওয়া ভারতের দুর্নামের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্তৃত্ববাদী শাসনের কারণে শেখ হাসিনা থেকে আগেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে পশ্চিমা দুনিয়া। ------- ঠিকানা, নিউইয়র্ক
পশ্চিমা কোনো দেশই তাকে আশ্রয় দিতে চাচ্ছে না। তার ওপর এরই মধ্যে তিনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। এর মাঝেও ভারত-বাংলাদেশ উভয়ই চাইছে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়মিত করতে। এ নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টার মধ্যে বৈঠকও হয়েছে। তবে দুই দেশের সম্পর্কে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছেন শেখ হাসিনা।
ঢাকা খুব স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, ভারতে বসে শেখ হাসিনার বক্তব্য বা বিবৃতি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য সহায়ক হবে না। প্রায়ই বাংলাদেশ নিয়ে নেতাকর্মীর সঙ্গে তার দিকনির্দেশনামূলক ও আক্রমণাত্মক কথোপকথন ফাঁসের ঘটনায় বিরক্ত বাংলাদেশ। তা বিশ্বের কাছে প্রশ্নের মুখে ফেলছে ভারতকে। যুক্তরাজ্য, ফিনল্যান্ড, বেলারুশ, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বেশ কয়েকটি দেশে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার চেষ্টায় বিফল হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত- আইসিসির তেমন তোয়াক্কা করে না, রাশিয়ার আশপাশের এমন কয়েকটি দেশও ‘না’ করে দিয়েছে।
ছেলে জয়, মেয়ে পুতুল, ছোট বোন শেখ রেহানা, তার মেয়ে টিউলিপ, ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকসহ তাদের গোটা পরিবারই বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন। বিভিন্ন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত বা অভিযুক্ত সবাই। ভারতকে তা একটা বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। তার ওপর ওয়ান ইলেভেনের সময় মাইনাস টু নিয়ে কাজ করা প্রায় সবাই গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আছেন।
তাদের কেউ কেউ এখন হয় ক্ষমতায় অথবা ক্ষমতার কাছাকাছি অবস্থানে। সংস্কার কমিটিগুলোর শীর্ষ পদে থাকা অনেকে ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিনদের সমর্থক ছিলেন। তাদের পেছনে ডিপ স্টেট নড়ছে। ডিপ স্টেট কোথাও একবার ব্যর্থ হলে হাত গুটিয়ে চলে যায় না। বরং নতুন সুযোগের অপেক্ষা করে। বাংলাদেশকে ঘিরে তা এখনো চক্কর দিচ্ছে। ভারত এ নমুনাদৃষ্টে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের রূপান্তরকালীন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগ নিচ্ছে। নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন ঢাকায় যোগ দিলে তা পুরো গতি পাবে। নাটকীয় মোড় নেবে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক। দৃশ্যপট তখন বদলে যাবে। কেটে যাবে ধোঁয়াশা অবস্থা।
এসবের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকে। এর পেছনে রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি দেশের দূতিয়ালি।
ঢাকায় পাকিস্তানের সামরিক জেনারেল বা সরকারি কর্মকর্তাদের ঘন ঘন সফরও ভারতকে খুব টেনশনে ফেলেছে। সামনে বিএনপির ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনাও ভাবাচ্ছে দেশটিকে।
দেশীয় রাজনীতিতে যেমন তটস্থ করে তুলেছে জামায়াতকে। আঙুল বাঁকা করে হলেও ঘি খেতেই হবে, মানুষ ভোট না দিলেও ক্ষমতায় যেতেই হবেÑজামায়াতের আমির ও নায়েবে আমিরের এ ধরনের কথার মাঝে সেই উতলা ভাবের প্রকাশ ঘটেছে। বিএনপির বিরুদ্ধে অবিরাম প্রচারণা চালানো তাদের অ্যাজেন্ডা। ঘটনার পরম্পরায় জামায়াতের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক তারেক রহমানও। জামায়াতের ধর্মকে রাজনীতিতে টেনে আনার সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি বলে বসেছেন, ভোটের বিনিময়ে জান্নাতের টিকিট বিক্রি শিরকের পর্যায়ে পড়ে।
জামায়াতও এখন আর কাউকে ছেড়ে কথা বলছে না। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাউদ্দিন আহমেদ কাউকেই না।
বিএনপির নেতৃত্বকে বিতর্কিত করার যাবতীয় কৌশলই নেওয়া আছে তাদের। তারেক রহমানের দেশে আসতে দেরি হলে, নির্বাচনের সময়টিতে ডা. জোবাইদা রহমান দেশে থেকে নেতৃত্ব দিলে তাকেও ছাড়বে না। তাকেও পচানোর বয়ান রয়েছে জামায়াতের স্টকে। মায়ের এই করুণ অবস্থায়ও দেশে না আসায় তারেক রহমানকে নিয়ে ন্যারেটিভের ছড়াছড়ির পেছনেও জামায়াতের ব্যাপক কন্ট্রিবিউশন।
ঝুঁকি নিয়েও তারেক রহমান কেন দেশে এসে নিজেকে গ্লোরিফাই করলেন না, এ-সংক্রান্ত কথামালার ব্যাপক ধুম জাগাতে পেরেছে জামায়াত। তাকে ডিসকোয়ালিফাই প্রমাণের তেমন বাকি রাখা হয়নি। গত দেড় বছরে নানা কারণে বিএনপির জনপ্রিয়তা কিছুটা হলেও কমেছে। এর মধ্যে প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছেÑবিএনপির বিভিন্ন নেতা-কর্মীর বাড়াবাড়ি। দেশের বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজি, দখলদারির অভিযোগ। মনোনয়ন নিয়ে দলের ভেতরে দ্বন্দ্ব। দেশজুড়ে দলের অন্তঃকলহ। তার ওপর তারেক রহমানের দেশে না ফেরা নিয়ে প্রশ্নমালা।
অথচ দলটি বিগত ১৫ বছর ছিল বিরোধী রাজনীতির ঐক্যের প্রতীক। সব দলকে নিয়ে গণতন্ত্রের জন্য লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছে বিএনপি। কিন্তু আওয়ামী লীগের পতনের পর বিএনপি ক্রমশ যেন একলা হয়ে যাচ্ছে। দলটির গুরুত্বপূর্ণ জোটসঙ্গী জামায়াতসহ দলগুলো আলাদা হয়ে গেছে। দলটি রাজনীতিতে নতুন নতুন চমকে ভ্যালুয়েবল হয়ে উঠেছে।
তাদের পরিকল্পিত কৌশল বুঝতে কারও কারও, বিশেষ করে বিএনপির অনেক সময় লেগে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিপুল সাফল্য জামায়াতের জন্য বড় অর্জন। দলটি রক্ষণশীল ইমেজ থেকে বেরিয়ে একটি উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে চাইছে।
এর আগে কোনো জাতীয় নির্বাচনে দলের নেতাদের বাইরে কাউকে প্রার্থী করেনি। জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যে ন্যূনতম রুকন পদধারী নেতারা ছিলেন। এবার সেখানে দলটি কিছুটা শিথিল অবস্থান নিয়েছে। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদেরও এবার প্রার্থী করছে।