শিরোনাম

প্রকাশিত : ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ০৬:৪৭ সকাল
আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ০৬:৪৭ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

রাষ্ট্রীয় পদক প্রদানের মানদণ্ড কী? 

ইমতিয়াজ মাহমুদ

ইমতিয়াজ মাহমুদ: [১] একুশে পদক নিয়ে কথাটা না বললেই নয়। একুশে পদক দেওয়া শুরু হয় ১৯৭৬, আর স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া শুরু হয় ১৯৭৭ সাল থেকে। স্বাধীনতা পদক হচ্ছে আমাদের দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা আর একুশে পদক হচ্ছে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এই দুইটাই শুরু করেন জিয়াউর রহমান। সরকারিভাবে এরকম পদক পুরস্কার ইত্যাদি নিয়ে নাগরিকদের সম্মানিত করার বিধান প্রায় সব দেশেই আছে। নিজেদের নাগরিকদের এবং কোন কোন ক্ষেত্রে বিদেশিদেরও নিজ নিজ ক্ষেত্রে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য এরকম পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করা হয়।  

বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকা পর্যন্ত বাংলাদেশে এরকম কোনো পদক ইত্যাদি দেওয়া হতো না। এইগুলো শুরুই হয়েছে ১৯৭৫ সালের পর। আগে এরকম পুরস্কারের প্রচল কেন শুরু করা হয়নি? আনুষ্ঠানিক এরকম কখনো কোনো পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে কিনা, সেটা  আমি সুনির্দিষ্ট করে জানি না। যেটা শুনেছি সেটা হচ্ছে যে, কলোনিয়াল সময় নাগরিকদের মধ্যে আনুগত্যের স্বীকৃতি হিসেবে যে ওইসব রায় বাহাদুর, খান বাহাদুর এরকম আরও কী কী সব পুরস্কার দিয়ে নানা রকম মেকি অভিজাত তৈরি করা হতো সেরকম কিছু যাতে না হয় সেটা একটা কারণ ছিলো। এখন তো এসব পুরস্কার একরকম প্রতিষ্ঠিত প্রথা হয়ে গেছে। সকল সরকারই ওদের পছন্দমতো লোকজনকে এরকম কোনো একটা পুরস্কার দিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতে তোলার চেষ্টা করে। এসব পুরস্কারের একটা অর্থমূল্য আছে, সেটা খুব বেশি না হলেও নেহায়েত তুচ্ছ নয়। মেডেল ফেডেলও দেয়। একটা সম্মাননা স্মারক দেওয়া হয়। এসব একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি হয়- সেটা হচ্ছে যে একবার রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত হলে আপনার নামটা সরকারের খাতায় সেই হিসেবে লিপিবদ্ধ থাকবে, ভিআইপি হয়তো নয়, তবে একরকম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি আরকি। 

[৩] এরকম ছয়টা পদক ও পুরস্কার আছে- স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদক, বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার, বেগম রোকেয়া পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার। এর মধ্যে স্বাধীনতা পুরস্কারের দায়িত্ব কেবিনেট ডিভিশনের, আর অন্যান্য পুরস্কারের দায়িত্ব একেকটা মন্ত্রণালয়ের। এসব পুরস্কারের জন্য নমিনেশন দেওয়া থেকে শুরু করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পর্যন্ত সবই আমলারা গ্রহণ করে। তদবির তো চলেই। আপনাদের মনে থাকবে, একবার এক উপসচিব তার অকবি পিতাকে কবি বানিয়ে তার জন্যে একুশে পদক বাগিয়ে নিয়েছিল। পদক ও পুরস্কারগুলোতে যে অযোগ্য লোকজন ঢুকে পড়ে, এমনকি চূড়ান্ত রকমের মন্দ লোকজনও ঢুকে পড়ে সেকথা তো আপনি জানেনই। জিয়াউর রহমান রাজাকারদেরও স্বাধীনতা পুরস্কার দিয়েছেন, এরশাদের সময়ও এসব কাণ্ড হয়েছে। সব সরকারের সময়ই এসব পদক ও পুরস্কার রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। চলচ্চিত্র ও ক্রীড়া পুরস্কারের ক্ষেত্রে একদম ডাহা অযোগ্য লোকজনকে চট করে তালিকায় ঢুকানো যায় না, অন্যান্য ক্ষেত্রে বেশি হয়। কয়েকজন যোগ্য লোকজনকেও দেওয়া হয় যাতে করে পুরস্কারের মানটা থাকে।  এবারের একুশে পদক যাদের দেওয়া হয়েছে সেই তালিকার দিকে তাকালেই আপনি দেখতে পাবেন পুরস্কারের মানটা কোথায় দাঁড়িয়েছে। শুভ্র দেবের কথাই ধরেন। না, তিনি গান গাইতে পারেন, কিন্তু সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে আপনি তাকে কি খুব বড় শিল্পী বলবেন? মন্দ শিল্পীও বলতে পারবেন না, গাইতে তো পারেন। সঙ্গীত সম্পর্কিত দক্ষতা আছে, কায়দা করে কখনো একটু নাকে বাজিয়ে, উপরের স্কেল এড়িয়ে গান গেয়ে ফেলেন। এই মানের বা এর চেয়ে ভালো মানের কয়েকজন করে শিল্পী আপনি প্রায় প্রতিটা জেলা শহরে পাবেন। 

[৪] এ বছরের তালিকায় আবৃত্তি শিল্পীরাও আছেন। ওরা আবৃতি যে খারাপ করেন সেকথা নয়, কিন্তু একুশে পদক। মাফ করবেন, আমার হয়তো বুদ্ধি কিঞ্চিৎ কম বলে বুঝতে পারছি না, ওদের ঠিক কী কারণে একুশে পদক দেওয়া হয়েছে। শুভ দেবের ক্ষেত্রেও। না, তিনি একটি সাংস্কৃতিক পরিবার থেকে এসেছেন, সেই বিটিভি থেকে শুরু করে গাইছেন, বাজে শিল্পী তো নন। কিন্তু আপনি যখন একই ক্ষেত্রে অন্যদের ডিঙিয়ে তাকে একুশে পদক দিতে যাবেন তখন তো অন্য প্রশ্ন চলে আসে। অন্য শিল্পীদের কথা কী বলবো, শুভ্রর চেয়ে ওর দুই দিদিও অনেক ভালো গান করে। এখন কথা হচ্ছে এসব ইয়ে থেকে আপনি পরিত্রাণ পাবেন কীভাবে? গণতন্ত্র থাকতে হয়। শিল্প, সাহিত্য বা সৃজনশীল কিছুর জন্য তো আর প্যারিসে রক্ষিত কোনো মিটার স্কেল নেই যে আপনি মাপ দিয়ে মান নির্ধারণ করবেন। সেরকম কিছু থাকলে না হয় আপনি আদালতে গিয়ে বলতে পারেন যে মান তো মিললো না। এইগুলো ফয়সালা করার জন্যে দেশে কার্যকর একটা গণতন্ত্র থাকতে হয়। সেরকম কার্যকর একটা পার্লামেন্ট থাকলে পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে একজন এমপি সাহেব জিজ্ঞাসা কোর্টে পারতেন সংস্কৃতি মন্ত্রীকে, যে এদের আপনি কী বিবেচনায় একুশে পদক দিচ্ছেন। আপনিই বিবেচনা করুন, যে পদক আপনি সাবিনা ইয়াসমিনকে দিয়েছেন, ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদ, বারীন মজুমদার, নীনা হামিদ, রথিন্দ্রনাথ রায়কে দিয়েছেন, ওদের সারিতে শুভ্র দেবকে কি বিবেচনায় বসাচ্ছেন? আর কোনো শিল্পীকে পেলেন না? আমি তুলনা করে ভালো শিল্পীদের ছোট করতে চাই না, কিন্তু আপনি যদি নিজেই ভেবে দেখেন দেখবেন শুভ্রর আগে এই পদক পেতে পারেন এরকম কয়েক ডজন শিল্পী আপনি জীবিত শিল্পীদের মধ্যেই পাবেন। আর এই বছরের তালিকাই দেখেন, বিদিত লাল দাসের সাথে এক কাতারে আপনি শুভ্র দাসকে কী করে বসাবেন?

[৫] মাফ করবেন, আমি দীর্ঘ পোস্ট লিখে আপানদের বিরক্ত করছি। আজকে যদি দেশে একটা কার্যকর গণতন্ত্র থাকতো তাহলে হয়তো এই অধমকে এরকম লেখা লিখে আপানদের বিরক্তও করতে হতো না। পার্লামেন্টেই এসব নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা হতে পারতো, জবাব দিতে গিয়ে সরকারের মন্ত্রীরা হিমসিম খেতেন, আর কোনো ক্ষেত্রে কাউকে পদক প্রদানের পেছনে কোনো কেলেঙ্কারি থাকলে সেটাও হয়তো বেরিয়ে আসতো। পুনশ্চঃ শুভ্র দেবের প্রতি আমার কোনো ব্যক্তিগত বিদ্বেষ নেই। নিতান্ত উদাহরণ হিসেবেই ওর নামটা উল্লেখ করছি। তাকে ছোট করার জন্য নয়। একজন শিল্পীকে নিয়ে এরকম সব কথা বলছি, নিজেকে ছোট লাগছে। লেখক: আইনজীবী। ফেসবুকে ১৯-২-২৪ প্রকাশিত হয়েছে। 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়