শিরোনাম
◈ বিএনপিতে শুদ্ধি অভিযান শুরু, সরকারের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগে ফেঁসে যাচ্ছেন শতাধিক নেতা  ◈ তুরস্কে কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ে বাংলাদেশি কৃষিবিদ ও কৃষক নিয়োগের প্রস্তাব  ◈ ফুটপাত থে‌কে জ্বলন্ত চুলা ও সিলিন্ডার সরা‌লো পু‌লিশ, আটক ৮  ◈ প্রধানমন্ত্রীকে বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানীর (র.) মাজার জিয়ারতের আমন্ত্রণ ◈ রাজধানীজুড়ে রেস্তোরাঁয় পুলিশি অভিযান, আটক ৩৫ ◈ প্রবাসী আয়ে চমক, ৮ মাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স ফেব্রুয়ারিতে ◈ রমজানে সৌদি আরবে মাইক ব্যবহার ও সম্প্রচার সীমিত করে ৯ দফা নির্দেশনা ◈ পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ◈ বেইলি রোডে অগ্নিকাণ্ড হাইকোর্টে রিট দায়ের ◈ গাজায় মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বন্ধে ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগের আহবান বাংলাদেশের

প্রকাশিত : ০১ ডিসেম্বর, ২০২৩, ০২:২২ রাত
আপডেট : ০১ ডিসেম্বর, ২০২৩, ০২:২২ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

নির্বাচন, গণতন্ত্র, শ্রেণিনির্ভর রাজনীতি ও শ্রমিক আন্দোলন

ফরহাদ মজহার

ফরহাদ মজহার: The industrial reserve army, therefore, means more than merely the unemployed and underemployed. It means the mass of workers, always available, and that can be turned on to the labour-market at a moment's notice under the conditions imposed by capital.’- কার্ল মার্কস

নির্বাচনের তফশীল ঘোষিত হয়েছে। বিরোধী দল ও তাদের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে যুক্ত বিভিন্ন দল জানিয়ে দিয়েছে তারা যে শর্তে নির্বাচন চাইছে, সেটা না মানলে তারা নির্বাচনে যাবে না। ইতোমধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বিদেশি শক্তির চাপ রয়েছে। এই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। শ্রমিকরা তাদের ন্যূনতম মজুরির জন্য আন্দোলন করছেন। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি ও সংগ্রামকে ইতিবাচক জাতীয় রাজনৈতিক লক্ষ্যের দিকে নিতে পারেন সেই ভরসা করা কঠিন। সেই ইচ্ছা দলবাজ নির্বাচনবাদী রাজনীতির মধ্যে সে কারণেই আমরা দেখি না। শ্রমিকদের প্রতি ধনী ও লুটেরা শ্রেণীর কোনো নৈতিক বা মানবিক দরদ নেই। এটা আমরা বুঝতে পারি। থাকলে কারখানা আইনে থাকুক না  থাকুক শ্রমিকেরা আগুনে পুড়ে, কিংবা ভবন ধসে জ্যান্ত কবর হয়ে যেতো না। মুখে যাই বলুক লুটেরা ও মাফিয়া শ্রেণী বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীরও রোল মডেল। দেশ জাহান্নামে যাক, সকলে দ্রুত ধনী হতে চায়। বাড়ি গাড়ি করা ও  দ্রুত ধনী হওয়ার মধ্যে মধ্যবিত্ত শ্রেণি নিজের জীবনের চরিতার্থতা খুঁজে পায়। তাই মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণীর মধ্যেও শ্রমিক বা খেটে খাওয়া মানুষের প্রতি মানবিক দরদের প্রকট অভাব রয়েছে। 

মাফিয়া ও লুটেরা শ্রেণীনির্ভর রাজনীতি ভোটের অধিকারকেই একমাত্র জাতীয় রাজনৈতিক ইস্যু বলে হাজির করে। ফলে সমাজের মাফিয়া ও লুটেরা শ্রেণীর ফ্যাসিস্ট শাসন ও জুলুম দীর্ঘস্থায়ী হয়। এই মতাদর্শিক প্রপাগান্ডার মধ্য দিয়ে তারা শ্রমিক, কৃষক, নারী, সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অধিকারসহ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সকল মানবাধিকারকে আড়াল করে ফেলে। স্রেফ রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য যে সকল জাতীয় বোঝাপড়া দরকার সেই সকল বিষয়ও অদৃশ্য করে ফেলা সহজ হয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসাবে টিকে থাকুক এই শ্রেণীর তাতে কিছুই আসে যায় না। তাই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু যেমন, শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরির প্রশ্ন জাতীয় ইস্যু তো নয়ই, বরং শ্রমিককে কতো কম মজুরি দেওয়া যায় সেটাই যেন জাতীয় সাধনা হয়ে ওঠে। মালিক পক্ষের হয়ে শ্রমিকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কার্যত নীরব জেহাদ চালিয়ে যায়। তার নিষ্ঠুর কুফল শুধু শ্রমিকদের ওপর নয়, মাফিয়া ও লুটেরা শ্রেণী ছাড়া সমাজের সকল শ্রেণীর স্বার্থে আঘাত হানে। 

ক্ষমতাসীন ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম সবসময়ই জনগণকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করবার সমূহ সম্ভাবনা তৈরি করে। জাতীয় ইস্যু বা সংকট জাতীয়ভাবে বোঝা এবং মীমাংসার চেতনা ও পরিসর তৈরি করে। এই পরিসর আরও বিকশিত করতে হলে সবার আগে লুটেরা-মাফিয়া শ্রেণীর নির্বাচনবাদী সংকীর্ণ রাজনৈতিক মতাদর্শ আমাদের ত্যাগ করতে হবে। 

আমাদের সম্পূর্ণ মনোযোগ নিবিষ্ট করতে হবে বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে অবিলম্বে গঠন করার কর্তব্যের ওপর। সংকীর্ণ নির্বাচনবাদী মতাদর্শ আমাদের রাজনৈতিকভাবে বারবার কীভাবে পিছে টেনে ধরে রেখেছে সেটা বুঝতে হবে। সংকীর্ণ নির্বাচনবাদ ফ্যাসিস্ট শক্তি ও ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখার মতাদর্শ। এর ফলে শ্রমিকের আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত ন্যায়সঙ্গত অধিকারকে জাতীয় স্বার্থের জায়গা থেকে আমরা বোঝার চেষ্টা করি না। বাংলাদেশের শ্রমিক আন্তর্জাতিক পুঁজির গোলকায়ন কিংবা বি-গোলকায়ন বৃত্তের বাইরে নয় একদমই। বাংলাদেশ কাঁটা তারের বেড়ার মধ্যে দেশের ভেতরে বা বাইরে আন্তর্জাতিক পুঁজি বাজারের জন্য সস্তা শ্রম সরবরাহের কারাগার। কার্ল মার্কসের পরিভাষায় বাংলাদেশ ‘ইন্ড্রাস্টিয়াল রিজার্ভ আর্মি’ মজুদ রাখবার দেশ। ফ্যাসিস্ট শক্তি তার সৈন্যসামন্ত পুলিশ র‌্যাব দিয়ে এই রিজার্ভ আর্মি পাহারা দেয়। দিল্লি তাদের কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখে। যখন তখন তাদের গুলি করে। এটা আমরা দেখি। কিন্তু কীভাবে তা মার্কসের ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিজার্ভ আর্মি’র ধারণার সঙ্গে যুক্ত বুঝতে পারি না। আমরা তত্ত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে সম্পর্ক পাতাতে শিখি নি। 

তাহলে বাংলাদেশের শ্রমিকের অবস্থা বাস্তবোচিত ভাবে বোঝা এবং বর্তমান বন্দিদশা থেকে মুক্তির পথ সন্ধান করতে হলে আমাদের অবশ্যই বাংলাদেশের শ্রমিককে পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়ন বা বি-গোলকায়নের বৃত্তের মধ্যে পর্যালোচনার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এবারের ১১ নম্বর ভাববৈঠকিতে আমরা কীভাবে তা শুরু করতে পারি তার কংক্রিট সূত্র সন্ধানের চেষ্টা করবো। বর্তমান পোশাক তৈরি কারখানার শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি আন্দোলনের গুরুত্ব অনেক। তাই শুরুতেই বুঝতে হবে ন্যায্য মজুরির এই আন্দোলন শুধু ন্যূনতম মজুরি ২৫,০০০/= টাকা আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের গুরুত্ব ও ব্যাপ্তি অনেক বড়। এই ক্ষেত্রে শ্রমিক আন্দোলনে প্রতি আমাদের পূর্ণ সংহতি থাকতে হবে। বাংলাদেশের পোশাক তৈরি কারখানার ইস্যু শুধু শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে দরকষাকষির বিষয় মাত্র নয়, এটি আমাদের প্রধান এবং অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতীয় ইস্যু। ন্যূনতম মজুরি নির্ণয়ের ওপর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অস্তিত্ব দাঁড়ানো। এই জন্য নয় যে পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাত বা এই শিল্পের ওপর দেশের বৈদেশিক আয় নির্ভরশীল। বরং আগামীতে তুফানের মতো সারা বিশ্বে যে ওলট পালট ঘটতে যাচ্ছে সেখানে আমরা যেন অগ্রগামী ভূমিকা রাখতে পারি তার প্রস্তুতি দরকার। তাই পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থাকে বাংলাদেশের শ্রমিকের ন্যায্য মজুরির আন্দোলনের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত সেটা অবশ্যই আমাদের বুঝতে হবে। লেখক : কবি। ফেসবুকে ৩০-১১-২৩ প্রকাশিত হয়েছে। 

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়