শিরোনাম

প্রকাশিত : ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ০৯:০২ রাত
আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ০৬:০০ বিকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

“তারেক রহমানের নতুন বাংলাদেশের মন্ত্রীসভায়, মেধার চেয়ে দেশপ্রেমিক মন্ত্রী চাই": শাহাজাদা এমরান

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনে এককভাবে ২০৯টি এবং জোটগতভাবে ২১২টি আসন লাভ করে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ভূমিধস বিজয় অর্জন করেছে।আর এর নেপথ্যে নায়ক ছিলেন নির্বাচনকালীন প্রচারণার সময় হ্যামিলিওনের বাঁশিওয়ালা খ্যাত দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। প্রতিটি জনসভাতেই যার নাম শুনেই চলে আসতো হাজার হাজার নারী -পুরুষ। নির্বাচন শেষ। এখন প্রস্তুতি চলছে শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে নতুন সরকারের আনুষ্ঠানিক যাত্রার। যা  শুরু হবে আগামীকাল ১৭ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার। সকালে নব নির্বাচিত ২৯৭জন এমপির শপথ আর বিকেলে হবে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির নতুন মন্ত্রী সভার শপথ।

৫ আগস্টের পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে তারুণ্যের প্রতীক ও বদলে যাওয়া  তারেক রহমানের মন্ত্রী সভায় কেমন সদস্য চাই –একজন ক্ষুদ্র গণমাধ্যম কর্মী ও নগন্য কলামিষ্ট হিসেবে আমার প্রত্যাশা কি তা নিয়েই আজকের সময়ের কড়চা।

দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা,ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগের প্রায় ১৭ বছরের অত্যাচার, নির্যাতন,  দমন-পীড়ন ও প্রত্যাশার পর জনগণ একটি পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে। কিন্তু নির্বাচন শেষ মানেই দায়িত্ব শেষ নয়; বরং এখান থেকেই প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হবে ভূমিধস বিজয় অর্জন করা নেতা তারেক রহমানের।

গত ১৭ বছর দেশের মানুষ নানা সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, মামলা-হামলা, দমন-পীড়ন, অর্থনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল একটি ভিন্ন পরিবেশের। এবারের নির্বাচন মোটের ওপর শান্তিপূর্ণ হয়েছে। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া বড় কোনো সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি। কুমিল্লার ১১টি আসনেও পরিস্থিতি ছিল নিয়ন্ত্রণে, অনুকূলে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও উল্লেখযোগ্য অস্থিরতার খবর নেই। এটি অবশ্যই ইতিবাচক দিক। এজন্য অবশ্য অন্তবর্তিকালীন সরকার প্রশংসা পেতে পারে। তারা দেশবাসীর ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।

তবে এখন মূল প্রশ্ন—নতুন সরকার কেমন হবে? দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয় নিঃসন্দেহে বিএনপির  শক্ত অবস্থান তৈরি করে। কিন্তু অতিরিক্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা কখনো কখনো আত্মতুষ্টি বা কর্তৃত্ববাদী মানসিকতার জন্ম দেয়। গণতন্ত্রে বিরোধী দল দুর্বল হলেও জনগণ, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ কখনো দুর্বল হয় না। তাই নতুন সরকারের প্রতি প্রত্যাশা—তারা যেন সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তিকে সেবার শক্তিতে রূপান্তর করে।বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগ সরকারের মতো না হয়।

বিএনপি প্রধান তারেক রহমানের নির্বাচনী প্রচারণায় নেতৃত্বের পরিবর্তিত ভাষা ও উপস্থাপন অনেকের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। দীর্ঘ প্রবাসজীবনের পর দেশে ফিরে তার  নেতৃত্ব নতুন করে রাজনৈতিক আস্থা অর্জন করেছে—ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটের ফল সেই আস্থারই প্রতিফলন। বলতে দ্বিধা নেই দেশের জনগণ তারেক রহমানের নেতৃত্ব পেতে উন্মুখ হয়ে আছে। যার কারণে বিএনপিকে একক ভাবে ২০৯টি আসন উপহার দিয়েছে। বাকী যে ৭টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয় লাভ করেছে তারাও বিএনপির নেতাকর্মী। মনোনয়ন না পেয়ে দলের বিদ্রোহী হয়ে তারা নির্বাচন করে জয়লাভ করেছে। এই ৭টি ধরলে বিএনপির একক আসন হয় ২১৬ আর শরিক জোটের ৩টিসহ মোট আসন হয় ২১৯। বাকী আছে আরো ৩টির ফলাফলের।

কিন্তু জনপ্রিয়তা ও নির্বাচনী সাফল্যের চেয়ে বড় বিষয় হলো রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিকতা। মন্ত্রীসভা গঠনই হবে সেই নৈতিকতার প্রথম পরীক্ষা।

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, নতুন মন্ত্রীসভায় শুধু মেধাবী হলেই চলবে না; দেশপ্রেমিক হতে হবে। আমাদের দেশের অতীত সরকার গুলোর মন্ত্রীসভার গুলোর দিকে তাকালে এ তথ্য আরো দৃঢ় হয়। দেশপ্রেমের অভাবে মন্ত্রীরা দ্রুত ভুল করে,নিজের আমিত্ব প্রকাশ করে। সত্যকে অস্বীকার করে দিন শেষে গোটা দল তথা সরকারকে বিপদে ফেলে জনগণের চক্ষুসূলে পরিণত হয়।

আমাদের প্রশাসনে অসংখ্য উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ কর্মকর্তা রয়েছেন। বিসিএস ক্যাডারসহ বিভিন্ন স্তরে মেধাবী আমলা আছেন—এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু মেধার সঙ্গে যদি সমানভাবে যুক্ত না থাকে দেশপ্রেম, জবাবদিহিতা ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা, তাহলে সেই মেধা রাষ্ট্রের কল্যাণে কতটা কার্যকর হবে—তা প্রশ্নসাপেক্ষ।আমাদের আমলাদের মধ্যে গত তিন দশকের পেশাগত জীবনে সেই দেশপ্রেম খুবই কম দেখেছি।

রাজনৈতিক ইতিহাসে আমরা দেখেছি, ক্ষমতার পালাবদলের সময় রাজনৈতিক নেতারা জবাবদিহির মুখে পড়েছেন, কেউ জেলে গেছেন, কেউ আত্মগোপনে গেছেন। কেউবা বিদেশে পালিয়ে গেছেন। কিন্তু প্রশাসনিক কাঠামোর বড় অংশ প্রায় অপরিবর্তিত থেকেছে। দুর্নীতির অভিযোগ অনেক সময় রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘাড়ে পড়ে, কিন্তু বাস্তবায়নের স্তরে প্রশাসনিক সম্পৃক্ততা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। এই বাস্তবতা আমাদের ভাবায়। আমাদের রাজনৈতিক সরকার গুলোকে আমলা নির্ভরতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

আমি মনে করি, রাষ্ট্র পরিচালনায় মেধার আগে প্রয়োজন নৈতিক সাহস ও দেশপ্রেম। দেশপ্রেমিক ব্যক্তি যদি তুলনামূলকভাবে কম মেধাবীও হন, তাঁর দায়িত্ববোধ ও জনগণের প্রতি কমিটমেন্ট তাঁকে ঘাটতি পূরণে সহায়তা করবে। কিন্তু অতি মেধাবী অথচ আত্মকেন্দ্রিক ব্যক্তি রাষ্ট্রের জন্য আশীর্বাদ নন। রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো করপোরেট ব্যবস্থাপনা নয়; এটি নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—দলের দুঃসময়ের পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়ন। যারা দীর্ঘদিন মামলা-হামলা, নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করেছেন, সংগঠনকে টিকিয়ে রেখেছেন, তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছেন—তাদের যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া উচিত। সুবিধাবাদী বা সাময়িকভাবে যুক্ত হওয়া ব্যক্তিদের চেয়ে পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতৃত্ব মন্ত্রিসভায় বেশি গ্রহণযোগ্যতা পাবে। কারণ জনগণের সঙ্গে তাদের বাস্তব সম্পর্ক রয়েছে।

কুমিল্লার প্রসঙ্গ এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। ১১টি আসনের মধ্যে একজন বিদ্রোহীসহ ৯টি আসনেই  বিপুল ভোটে জয় পেয়েছে বিএনপি। জনগণ উজাড় করে ভোট দিয়েছে। এই ভোট শাসনের লাইসেন্স নয়; এটি সেবার দায়িত্ব। অতীতে আমরা দেখেছি, ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে কিছু ব্যক্তি চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলদারিত্ব কিংবা মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেন। নতুন সরকারের শুরুতেই এসব অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কঠোরতা প্রয়োজন।

গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়। বরং সমালোচনা গ্রহণের মানসিকতা একটি আত্মবিশ্বাসী সরকারের লক্ষণ। গণমাধ্যমের কাজ প্রশ্ন করা; সরকারের কাজ উত্তর দেওয়া। এই ভারসাম্যই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে।

নতুন সরকারের প্রতি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা—সবল যেন দুর্বলের ওপর আক্রমণ না করে। যেটা জনাব তারেক রহমান তাঁর নির্বাচন উত্তর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে নিজেও বলেছেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, ভিন্নমতাবলম্বী বা সংখ্যালঘু মতের মানুষ যেন প্রতিহিংসার শিকার না হন। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে নিরাপত্তা ও সহনশীলতার পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে নতুন নেতৃত্বের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয়। বিজয় যদি প্রতিশোধে রূপ নেয়, তবে সেই বিজয় স্থায়ী হয় না।

দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা যেমন শক্তি, তেমনি এটি বড় দায়িত্বও। জনগণ দুই হাতে ভোট দিয়েছে। এখন দেওয়ার পালা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের। উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি দমন ও সামাজিক ন্যায়বিচারে দৃশ্যমান অগ্রগতি আনতে না পারলে এই বিপুল সমর্থন ধরে রাখা কঠিন হবে।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে মন্ত্রীর পরিচয় হবে সেবক হিসেবে, ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে নয়। যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, নাগরিক অধিকার হবে প্রধান পরিচয়। যেখানে প্রশাসন ও রাজনীতি মিলেই জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে।

তাই আবারও বলি—মেধাবী মন্ত্রী অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তার আগে দরকার দেশপ্রেমিক, জবাবদিহিমূলক ও নৈতিক নেতৃত্ব। সংখ্যাগরিষ্ঠতার উল্লাস নয়, দায়িত্বের বোধই হোক নতুন মন্ত্রিসভার ভিত্তি। জাতি আজ সেই প্রত্যাশায় তাকিয়ে আছে।

আশা নয়,দৃঢ় বিশ্বাস,স্বাধীনতার মহান ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও মাদার অব ডেমোক্রেসি খ্যাত প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সন্তান জনাব তারেক রহমান জাতিকে নিরাশ করবেন না।

লেখক : সম্পাদক দৈনিক কুমিল্লার জমিন ও সাধারণ সম্পাদক,বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি কুমিল্লা জেলা। 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়