এল আর বাদল : বাংলাদেশের সরকারি দল বিএনপির একজন নেতা এমপি পদ ছাড়তে বাধ্য হন এ মাসের শুরুতে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন আরেকজন। দুটি পদত্যাগের পেছনেই তারেক রহমানের নির্দেশের আলোচনা সামনে এসেছে।
ঢাকার মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে গত পহেলা অক্টোবর জাতীয় সংসদের সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন দলের মনোনয়নে সংরক্ষিত আসনে এমপি হওয়া ফেরদৌস আহমেদ মিষ্টি। ------ সূত্র, বিবিসি বাংলা
সারাদেশে আলোচনার জন্ম দেওয়া ওই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই 'অস্ত্র হাতে মাদক বিরোধী অভিযান চালিয়ে' বিতর্কে আসা প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনও প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়েন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পদত্যাগ করেছেন বলে যেমন আলোচনা রয়েছে, আবার মি. হোসেন দাবি করেছেন তিনি নিজেই পদত্যাগের আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো এ দুটি ঘটনার পর কী বার্তা দিতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান?
তিনি কী দলের ভেতরে ক্রমশ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়া নেতাদের সামলানোর চেষ্টা থেকে এই পদক্ষেপ নিয়েছেন? 'বিতর্ক তৈরি করলেই' পদ হারাতে হবে- এই বার্তা দিতে চেয়েছেন দলের নেতাদের? নাকি শুধু দল ও সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার চেষ্টা করেছেন তিনি?
যদিও দলের ভেতরে এই আলোচনাও আছে যে মি. হোসেনের 'অস্ত্র হাতে মাদক বিরোধী অভিযান' আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতাকেই তুলে ধরেছে যা দলের প্রভাবশালী একটি অংশকে ক্ষুব্ধ করেছে। মি. হোসেন প্রকাশ্যেই বলেছেন, মাদক নিয়ে পুলিশকে জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ অবশ্য বলছেন, সব জায়গাতে এত নৈরাজ্য যে সামাল দেওয়া কঠিন এবং সে কারণে হয়তো প্রধানমন্ত্রী 'স্যাম্পল অ্যাকশন' বা প্রতীকী ব্যবস্থা নিয়েছেন। তার মতে, এই ব্যবস্থা দল ও সরকারের জন্য ইতিবাচক হবে।
আরেকজন বিশ্লেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবকে উপাচার্য কামরুল আহসান বলছেন, সরকারের খুব অল্প সময়ের মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত বলছে যে তিনি তা উপলব্ধি করতে পারছেন।
বিএনপি যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর পদক্ষেপ একটিই বার্তা দিচ্ছে, তা হলো অন্যায় বা অপরাধ করে কেউ রেহাই পাবে না।
ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ও ইশরাক হোসেন, কিছু প্রশ্ন
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের অগাস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই সারাদেশে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়াসহ বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ উঠেছিল।
তখন বিভিন্ন সময়ে দলটি তার তিন হাজারেরও বেশি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছিল। কিন্তু চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পরেও বিএনপি তার নেতাকর্মীদের কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে সেই প্রশ্ন জোরালো হয়ে উঠছে।
বিরোধী দলগুলো থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির যে দাবি উঠে আসছিল, সেখানেও বিএনপি নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে সরকারি ব্যর্থতাই প্রধান কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যানই করে আসছেন। এমনকি, আইনশৃঙ্খলা ক্রমশ উন্নতি হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।
কিন্তু এর মধ্যেই গত ২৪শে সেপ্টেম্বর ঢাকার মিরপুরে স্বল্প আয়ের পরিবারের নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া বেসরকারি সংস্থা রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি এর কার্যালয় গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা আলোচনা তৈরি করে।
এর পরপরই আলোচনায় আসে ইউটিউবার সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা ও ভাংচুরের ঘটনা। দুইটি ক্ষেত্রেই দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে, সঙ্গে আঙ্গুল ওঠে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার।
রাড্ডার ঘটনায় জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের এমপি ফেরদৌসি আহমেদ মিষ্টি এমপির নাম সামনে উঠে আসে। পরে এ নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে পহেলা অক্টোবর পদত্যাগ করেন মিজ আহমেদ।
এসব ঘটনার জের ধরে বিএনপি দলীয় কর্মীদের দখল-চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে সরকারের কঠোর সমালোচনা করে রাজনৈতিক দলগুলো।
সেইসাথে সামাজিক মাধ্যমেও এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চোখে পড়ে। এসবের রেশ কাটতে না কাটতেই গত শনিবার অস্ত্র হাতে অবৈধ মাদক ব্যবসায়ীদের ধাওয়া করার একটি ভিডিও নিজেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেন ইশরাক হোসেন।
এর আগে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর গাড়ির পেছনে দৌড়ানো, জিয়াউর রহমানের মাজারে গিয়ে ঠেলাঠেলি কিংবা জাতীয় স্মৃতি সৌধে তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে স্যালুটে অংশগ্রহণের মতো বিষয়গুলো নিয়েও গত কয়েক মাসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা ট্রলের শিকার হন তিনি।
এবার তার অস্ত্র হাতে দৌঁড়ানোর ভিডিও সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় সরকারের ভেতরে ও বাইরে। ওই ভিডিও ও পরে এ নিয়ে করা মন্তব্যে তিনি স্পষ্টতই মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকারি ব্যর্থতাকে সামনে নিয়ে এসেছেন, যা সরকারের ভেতরে অনেককে ক্ষুব্ধ করেছেন বলে ধারণা পাওয়া গেছে।
দলের একজন নেতা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "ইশরাক মাদক নিয়ে যা বলেছেন তা তো ভুল না। মাদকের ভয়াবহ বিস্তার তো বাস্তবতা। পুলিশ বা প্রশাসন তো কিছুই করতে পারছে না। ফলে ইশরাককে শুরুতেই পদত্যাগ না করিয়ে শোকজও করা যেত। কিন্তু হয়তো মনে করা হয়েছে হিরোইজমকে সামাল না দিলে ভবিষ্যতে এটি দলের ভেতরে প্রবণতা হয়ে উঠতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন ইশরাককে পদত্যাগ করতে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন কি-না তা তো সরকার স্পষ্ট বলেনি।
দলের কিছু নেতার আচরণ ও পরিম