হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ট্রলি নিয়ে যাত্রীদের ভোগান্তি দীর্ঘদিনের। ইমিগ্রেশন শেষ করে ট্রলি পেতে অনেক সময় যাত্রীদের মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। একসঙ্গে দুই-তিনটি ফ্লাইট অবতরণ করলেই দেখা দেয় ট্রলির সংকট। বেল্ট থেকে লাগেজ সংগ্রহ করে ট্রলিতে করে বের হতে সময় লাগে দুই থেকে তিন ঘণ্টা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিমানবন্দরে ট্রলি সংকট চলছে এক বছরের বেশি সময় ধরে। বিগত হজ মৌসুমের আগেই বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা বিমানবন্দরে পর্যাপ্ত ট্রলি রাখার বিষয়ে বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (বেবিচক) লিখিতভাবে জানিয়েছিল। হজ শেষে হাজিরা ফিরলে ট্রলির তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে এবং বিমানবন্দরের ভেতরে ট্রলি নিয়ে নানা ঘটনা ঘটতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল।
এ অবস্থায় মন্ত্রণালয় থেকেও বেবিচককে বিষয়টি সমাধানের নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরে বেবিচকের কেনাকাটা দফতর (সেমসু) থেকে ৫০০টি ট্রলি কেনার প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সদর দফতরে পাঠানো হয়। তবে সেই প্রস্তাব অনুমোদন হয়নি।
ফলে বিগত ফিরতি হজ মৌসুমে ট্রলি নিয়ে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। যাত্রীরা নিয়মিত ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকেন। এমনকি বিমানবন্দরের ভেতরে মারামারির ঘটনাও ঘটে। উত্তেজিত যাত্রীরা বিমানবন্দরের ভেতরের গ্লাসও ভেঙে ফেলেন। পরে চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকে ২৫০টি ট্রলি এনে পরিস্থিতি কোনোমতে সামাল দেয় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।
সম্প্রতি জামায়াতের এমপিরা ওমরা শেষে দেশে ফিরলেও ট্রলি সংকট নিয়ে বড় ধরনের ঘটনা ঘটে। এরপর আবারও আলোচনায় আসে শাহজালাল বিমানবন্দরের ট্রলি সংকট। বর্তমানে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে ট্রলি নিয়ে সংকট সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।
ট্রলি না কেনার নেপথ্যে
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ট্রলি কেনার প্রস্তাব অনুমোদন না হওয়ার পেছনে টাকা খরচের বিষয়টি ছিল একটি কারণ। কর্মকর্তারা মনে করেছিলেন, দ্রুতই থার্ড টার্মিনাল চালু হবে। থার্ড টার্মিনাল অপারেশনালভাবে চালু হলে জাপানি প্রতিষ্ঠান ট্রলি নিয়ে আসবে এবং সেগুলোর সঙ্গে বর্তমান ট্রলিও ব্যবহার করা যাবে। কিন্তু সময় গড়ালেও থার্ড টার্মিনাল চালু হয়নি। অন্যদিকে ট্রলি সংকটের কারণে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়তে থাকে।
কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা যায়, ট্রলি কেনার প্রস্তাব এলেও অনুদান হিসেবে ট্রলি পাওয়ার চেষ্টা করতে থাকে বেবিচক। পরে একটি কোম্পানির সঙ্গে কথাও হয়। তারা ট্রলি দিতে রাজি হলেও আজ পর্যন্ত সেই ট্রলি শাহজালাল বিমানবন্দরে যোগ হয়নি।
বিমানবন্দরে কর্মরত গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, ট্রলি সংকটের কারণে যাত্রীদের ক্ষোভ ও হয়রানির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গত এক বছর ধরে তারা বিষয়টি বেবিচককে জানিয়ে আসছিলেন। তবে তাদের পর্যবেক্ষণের কোনও মূল্য দেওয়া হয়নি।
তারা বলেন, দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ট্রলি সংকট কেন থাকবে, এ প্রশ্ন সবার। ট্রলি কিনলে টাকা অপচয় হবে কেন? দেশের অন্যান্য বিমানবন্দরেও ট্রলি সংকট রয়েছে। থার্ড টার্মিনাল চালু হওয়ার পর পর্যাপ্ত ট্রলি হলে বর্তমান ট্রলিগুলো অন্যান্য বিমানবন্দরে দিয়ে সেখানকার সমস্যার সমাধান করা যেত।
বেবিচকের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা বলেন, যেখানে শত কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে, সেখানে ৫০০টি ট্রলি কিনতে আর কত টাকাইবা লাগতো। এই ট্রলি থাকলে সাধারণ যাত্রীদের ট্রলির জন্য হাহাকার করতে হতো না। ট্রলি কেনার জন্য মন্ত্রণালয় থেকেও নির্দেশনা ছিল। কিন্তু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সেই নির্দেশনা মানেননি।
এদিকে ট্রলি না পাওয়ায় যাত্রীদের ক্ষোভও বাড়ছে। বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সময় ঠিকমতো ট্রলি না পেয়ে যাত্রীরা মোবাইলে ভিডিও করে নানা নেতিবাচক কথা বলছেন। সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। এক নারী যাত্রীকে বলতে দেখা যায়, ‘যদি ট্রলিই দিতে না পারেন তবে বিমানবন্দর কেন বানাইছেন, বন্ধ করে দেন।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে আরেক যাত্রী বলছেন, বেবিচকের কি ট্রলি কেনার টাকা নেই? নাকি সমস্যা জিইয়ে রাখার জন্য কৌশলে এমন আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে?
এ বিষয়ে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগিব সামাদ বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের ৪ হাজার ১৯০টি ট্রলি আছে। আরও ৫০০টি যোগ হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। ৫০০ ট্রলি যোগ হলে ট্রলির আরও কোনও সমস্যা থাকবে না।’
তিনি বলেন, ‘একসঙ্গে অনেক ফ্লাইট নামলে যাত্রীর সংখ্যা বেশি হয়ে যায়। ঠিক সেই সময়ে ট্রলির ঘাটতি পড়ে যায়। এতে সমস্যার মধ্যে আমরা পড়ে যাই।’
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন