ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ করে পুরান ঢাকাকে উন্নত বিশ্বের ‘আরবান রি-জেনারেশন’ (শহরের পরিকল্পিত পুনর্জীবন) ধারণার আলোকে সাংহাই মডেলে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ‘ইন্টিগ্রেটেড প্রজেক্ট ফর রিভাইটালাইজেশন অব ওল্ড ঢাকা’ শীর্ষক একটি প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) নীতিগত অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশনার পর এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদেশি অর্থায়ন নিশ্চিত হলে মহাপরিকল্পনা (মাস্টারপ্ল্যান) প্রণয়নে আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হবে। এরপর ধাপে ধাপে প্রকল্প বাস্তবায়নের কার্যক্রম শুরু হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সাংহাই মডেল অনুসরণ করে পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখে রাজধানীর সবচেয়ে পুরোনো ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাটিকে পরিকল্পিত, বাসযোগ্য ও আধুনিক নগর এলাকায় রূপান্তর করাই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
সাংহাই মডেল বলতে সাধারণত চীনের সাংহাই শহরকেন্দ্রিক নগর উন্নয়ন ও পুনর্গঠনের একটি পরিকল্পিত মডেলকে বোঝায়। এর মূল বৈশিষ্ট্য হলো- জরাজীর্ণ ও অনিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোকে পুনর্বিন্যাস করে আধুনিক আবাসন, উন্নত সড়ক ও গণপরিবহন, পর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থান, বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং উন্নত নাগরিক সুবিধা গড়ে তোলা। একই সঙ্গে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো সংরক্ষণেরও চেষ্টা করা হয়। এই মডেলের লক্ষ্য হলো পরিকল্পিত নগরায়ণের মাধ্যমে জীবনমান উন্নত করা এবং শহরকে আরও বাসযোগ্য ও অর্থনৈতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক করে তোলা।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঐতিহাসিক ভবনগুলো সংরক্ষণ করে পুরান ঢাকা ও হাজারীবাগ এলাকাকে উন্নত বিশ্বের রি-জেনারেশন কনসেপ্ট (পুনর্জীবনভিত্তিক নগর উন্নয়ন ধারণা) অনুসারে নতুনভাবে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীও এ বিষয়ে নীতিগত নির্দেশনা দিয়েছেন। তার নির্দেশনা অনুযায়ী, চীনের সাংহাই শহরের পুনর্গঠনের অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে পুরান ঢাকার রি-জেনারেশন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অনুবিভাগ) মো. আব্দুল মতিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘পুরান ঢাকাকে পরিকল্পিতভাবে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে সরকার একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। উন্নত বিশ্বের রি-জেনারেশন ও রি-ডেভেলপমেন্ট (পুনর্গঠন) ধারণার ভিত্তিতে এলাকাটিকে নতুনভাবে গড়ে তোলাই এর মূল উদ্দেশ্য। এজন্য এরই মধ্যে একটি গাইডলাইনও প্রস্তুত করা হয়েছে। রাজউকের সর্বশেষ বিধিমালার মধ্যেই রি-ডেভেলপমেন্ট ও রি-জেনারেশন-সংক্রান্ত বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’
পুরান ঢাকাকে পরিকল্পিতভাবে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে সমন্বিত একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। উন্নত বিশ্বের রি-জেনারেশন ও রি-ডেভেলপমেন্ট ধারণার ভিত্তিতে এলাকাটিকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে এরই মধ্যে একটি গাইডলাইন প্রস্তুত করা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত বিধান রাজউকের সর্বশেষ বিধিমালাতেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।— গৃহায়ন ও গণপূর্তের অতিরিক্ত সচিব মো. আব্দুল মতিন
অতিরিক্ত সচিব বলেন, পুরান ঢাকা ও হাজারীবাগ এলাকার জন্য পৃথক মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় বিদেশি অর্থায়নের সম্ভাবনা খোঁজা হচ্ছে।
মো. আব্দুল মতিন বলেন, ‘প্রথমে মাস্টারপ্ল্যান করতে হবে। মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া সেখানে কোনো উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এ কারণে পরিকল্পনা কমিশনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে (ইআরডি) সম্ভাব্য বিদেশি অর্থায়নের উৎস অনুসন্ধানের অনুরোধ করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘প্রকল্পটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। একটি পিডিপিপি প্রস্তুত করে জমা দেওয়া হয়েছে। এখন ইআরডি সম্ভাব্য উন্নয়ন সহযোগী খুঁজবে। কোনো সংস্থা আগ্রহ দেখালে তাদের সঙ্গে পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনা শুরু হবে।’
গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আরেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, মাস্টারপ্ল্যান সম্পন্ন হওয়ার পরই প্রকৃত উন্নয়ন ও বিনিয়োগ কার্যক্রম শুরু হবে। এক্ষেত্রে রাজউক নিজস্ব উদ্যোগে কাজ করতে পারে, স্থানীয় বাসিন্দারা যৌথভাবে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন অথবা বেসরকারি ডেভেলপাররাও এতে অংশ নিতে পারেন।
ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মাস্টারপ্ল্যান তৈরির সময় সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যবাহী ভবন ও স্থাপনাগুলো সংরক্ষণ করেই পরিকল্পনা করা হবে। যেসব ভবন ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে, সেগুলো সরকার সংরক্ষণ করবে। অন্য এলাকাগুলো আধুনিক নগর পরিকল্পনার আলোকে পুনর্গঠন করা হবে।
‘এ বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, পরিবেশ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মতামত নেওয়া হবে। কোন স্থাপনা সংরক্ষিত হবে, কোনটি পুনর্গঠনের আওতায় আসবে এবং কীভাবে পুরো এলাকাকে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করা হবে, তা মাস্টারপ্ল্যানেই নির্ধারণ করা হবে’ বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, পুরান ঢাকা বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র। কয়েকশ বছরের পুরোনো অসংখ্য ভবন, সরু সড়ক, অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ, অতিরিক্ত জনঘনত্ব, অগ্নিঝুঁকি, যানজট এবং অপর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধার কারণে এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকটে রয়েছে। অন্যদিকে হাজারীবাগ দীর্ঘদিন ট্যানারি শিল্পের কারণে পরিবেশ দূষণের শিকার হলেও বর্তমানে এলাকাটিকে নতুনভাবে পরিকল্পিত নগরায়ণের আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আরবান রি-জেনারেশন (শহরের পুনর্জীবন) বলতে শুধু পুরোনো ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণকে বোঝায় না। এর মাধ্যমে ঐতিহাসিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ, উন্নত গণপরিবহন, উন্মুক্ত স্থান সৃষ্টি, পরিবেশ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পুনরুজ্জীবন এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত শহরে এই মডেল সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে।
অতিরিক্ত সচিব মো. আব্দুল মতিন বলেন, সাংহাইয়ের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নব্বইয়ের দশকের সাংহাইয়ের অবস্থা অনেকাংশে ঢাকার মতো ছিল। পরে দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের মাধ্যমে শহরটির আমূল পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে। শুধু সাংহাই নয়, টোকিওসহ বিশ্বের অনেক শহরই সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্গঠন ও পুনর্জীবনের মধ্য দিয়ে আধুনিক নগরে পরিণত হয়েছে। তবে সব ক্ষেত্রেই ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সংরক্ষণ করা হয়েছে।
যা আছে পরিকল্পনায়
প্রস্তাবিত 'ওল্ড ঢাকা রিভাইটালাইজেশন' প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৬ হাজার ৫০০ একর এলাকা পুনর্গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৪ থেকে ৬১ নম্বর ওয়ার্ড এবং ৬২ নম্বর ওয়ার্ডের একটি অংশ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ২৫৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এর মধ্যে সমীক্ষা ও প্রস্তুতিমূলক কাজের জন্য ৩৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা এবং মূল বিনিয়োগ প্রকল্পের জন্য প্রায় ৫ হাজার ২২১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা প্রয়োজন হবে।
যা থাকছে নতুন নকশায়
প্রকল্পের আওতায় ব্যক্তিমালিকানাধীন জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো সামাজিক আবাসন (সোশ্যাল হাউজিং) মডেলে পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে মোট ভূমির প্রায় ৬০ শতাংশ উন্মুক্ত স্থান হিসেবে সংরক্ষণ করা হবে। সেখানে প্রশস্ত সড়ক, সবুজ এলাকা, কমিউনিটি পার্কিং, জলাধার, আর্ট মিউজিয়াম এবং ঐতিহ্যবাহী খাবারের কর্নার গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রথম ধাপে বিস্তারিত সমীক্ষা, বেসলাইন জরিপ ও মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হবে। এরপর স্থানীয় বাসিন্দাদের মতামত এবং একটি পাইলট প্রকল্পের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মূল বিনিয়োগ প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের নীতিগত অনুমোদনের পর অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মাধ্যমে বিশ্বব্যাংক, জাইকা, এডিবি ও এআইআইবিসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর কাছে অর্থায়নের প্রস্তাব পাঠানো হবে। এছাড়া কোরিয়া ও চীনের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও এই ধরনের নগর উন্নয়ন প্রকল্পে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।
প্রকল্পটির মাধ্যমে অতিরিক্ত জনঘনত্ব, সরু সড়ক, যানজট, পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, দুর্বল পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংকট এবং ভূমিকম্প ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপনা, স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সূত্র: জাগো নিউস ২৪