প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে আর্থিক সহায়তা নিয়ে করা প্রশ্নে বিব্রত হওয়ার কথা বলেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
চীনের কাছ থেকে প্রকল্প সহায়তার বিষয়ে করা এক প্রশ্নের রেশ ধরে তিনি বলেন, “উনি নগদ প্রাপ্তির কথা বললেন। ভাই, এ সমস্ত প্রশ্ন করবেন না, আমরা খুব বিব্রত হই। এখানে উনি ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে যান নাই।“এখানে গেছেন দুই দেশের সম্পর্কের অভিমুখ, তার কন্টেন্ট এবং তার উচ্চতা, ব্যাপ্তি এবং গভীরতা এইটা এস্টাবলিশ করার জন্য। কোনো দিন কোনো সরকারপ্রধান আরেক সরকারপ্রধানের সঙ্গে দিস্তা কাগজ নিয়ে, পেন্সিল নিয়ে বসে না, ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে যায় না। একটু আত্মসম্মান রাখেন। আমরা অন্য জায়গায় পৌঁছে গেছি। এটা বিশ্বাস করুন। এগুলো খুব বিব্রতকর প্রশ্ন।”
প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর নিয়ে শনিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তার সঙ্গে ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম এবং বিনিয়োগ উন্নয়ন বোর্ডের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন নিরঙ্কুশ জয় পাওয়া বিএনপি সরকার গঠনের পর তারেক রহমান প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে গত ২১ জুন মালয়েশিয়া যান। পরের দিন প্রধানমন্ত্রী পৌঁছান চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর তালিয়ানে। সেখানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে অংশগ্রহণ শেষে বুধবার বিকালে তারেক রহমানের বেইজিংয়ে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে তার তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শুরু হয়।
এই সফরে তারেক রহমান চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রীর লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার ১৭টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর শেষে প্রকাশিত দুই দেশের ১৫ দফা যৌথ ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, দুই দেশ তাদের ‘সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্ব’ আরও এগিয়ে নিয়ে ‘নতুন যুগের চীন-বাংলাদেশ অভিন্ন ভবিষ্যতের সম্প্রদায়’ গড়ে তুলবে, যাতে দুই দেশের জনগণ আরও বেশি উপকৃত হয়।
বাংলাদেশের তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের সহায়তা এবং দুই দেশের মধ্যে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা খাতে ‘টু প্লাস টু’ কৌশলগত সংলাপ চালুর মত বিষয়ও যৌথ ঘোষণায় এসেছে।
এছাড়া বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি এবং সামরিক খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধি; চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের আওতায় দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার আলোচনার পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে মিয়ানমারকে আলোচনায় আনতে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে চীন।
চীন অন্য দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে সর্বোচ্চ যে পর্যায়ে নিয়ে থাকে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককেও সে পর্যায়ে নেওয়ার ঘোষণা আসার কথা বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিল।
তিনি বলেন, “আমাদের পার্টনারশিপের প্রকৃতি আগে ছিল ‘কমপ্রিহেন্সিভ স্ট্র্যাটেজিক কোঅপারেটিভ পার্টনারশিপ’। সেটা থেকে আমরা ‘চায়না-বাংলাদেশ কমিউনিটি অব শেয়ার্ড ফিউচারে’ চলে গেছি। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটা চীনের সর্বোচ্চ পর্যায়।”
মন্ত্রী বলেন, “আগে আমাদের দুই দেশের যে রেগুলার সংলাপ, এটা হতো পররাষ্ট্র সচিবের লেভেলে। এখন এটা চলে গেছে ফরেন মিনিস্টার লেভেল, পলিসি লেভেলে চলে গেছে। এটা বড় ধরনের একটা পরিবর্তন, যেটা আগে ছিল খুব অল্প দেশের সঙ্গে।
‘টু প্লাস টু’ ব্যবস্থাপনা অনুসন্ধানের প্রসঙ্গ ধরে তিনি বলেন, “এটা আমরা ‘এক্সপ্লোর’ করব। কারণ আজকে যে ধরনের একটা অস্থির অবস্থা পৃথিবীতে, ‘ফরেন পলিসি এবং স্ট্রাটেজিক ইম্পারেটিভস’ কিন্তু এখন যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। এটা আপনি অস্বীকার করতে পারবেন না।
“যার কারণে তুরস্কের সঙ্গে আমরা ‘টু প্লাস টু’ করছি, কারণ মিডিল ইস্টে আমাদের যথেষ্ট পরিমাণ স্বার্থ আছে। তেমনি আমরা চীনের সঙ্গে ‘এক্সপ্লোর’ করব। এখন এটা ‘এক্সপ্লোরেটরি স্টেজে’ আছে। আমরা কোনো সিদ্ধান্ত এখনো সেভাবে নিয়ে নিই।”
খলিলুর রহমান বলেন, “আমরা যারা ডিপ্লোম্যাট বা কূটনীতিবিদ একটা মিটিং এ যখন যাই, আমাদের কাউন্টারপার্ট কারা বসছেন, সেটা দেখলে আমরা অপরপক্ষ কী গুরুত্ব দিচ্ছেন, সেটা আমরা বুঝতে পারি।
“চীনের জিডিপি হচ্ছে ২১ ট্রিলিয়ন ডলার, ফরেন রিজার্ভ সাড়ে তিন ট্রিলিয়ন ডলার। প্রত্যেক বছর তার ‘ট্রেড সারপ্লাস’ এক ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থনীতির আকারটা, তাদের উদ্বৃত্ত বুঝার চেষ্টা করুন। বৃহত্তম উদ্বৃত্তদের দেশ তারা।”
চীনা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে উপস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীতো ছিলেন; সেখানে বসেছিলেন অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, চীনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর। তাতেই বুঝতে পারছেন। এবং এরা এত বড় একটা ইকোনমি চালান, আপনি বুঝতে পারছেন যে, এতটুকু সময়, ঘন্টাখানেক সময় তারা আমাদেরকে দিয়েছেন সম্মিলিতভাবে।
“সুতরাং এই ভিজিটের সিগনিফিকেন্স আপনি শুধু এগুলো দেখলে বুঝবেন, আগের ভিজিটগুলোর তুলনায় এটা ‘কমপ্লিটলি’ একটা ‘ডিফারেন্ট ভিজিট’।”
মিয়ানমার হয়ে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক করিডোরের বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটা একটা অর্থনৈতিক প্রস্তাব। এখনও রাখাইন হয়ে সড়ক তৈরির পর্যায়ে যায়নি দুই দেশ।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এক্ষেত্রে ‘মাল্টিমোডাল কানেক্টিভিটি’ হবে। মিয়ানমারে যে সমস্ত বন্দর চীন ব্যবহার করছে, সেগুলো থেকে বাংলাদেশে ছোট জাহাজে করে পণ্য আনতে পারে কি-না। সেটা করতে পারলে ‘টাইম টু মার্কেট’, ‘কস্ট টু মার্কেট’ অনেক কমে যাচ্ছে।
“আরাকানের শান্তি ফিরে এলে, স্থিতিশীলতা ফিরলে, এগুলোর (সড়ক) কথা আমরা নিশ্চয়ই চিন্তা করব। সেখানে শুধু একটি রোড না ‘মাল্টিপল’ রোড হতে পারে। বাংলাদেশের তারা নিকট একটা প্রতিবেশী অঞ্চল, তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ থাকতেই পারে।”