বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যেকার দ্বিপক্ষীয়, রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার বিশেষ বার্তা নিয়ে বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ঢাকা এসে পৌঁছেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। রাত সোয়া ১০টায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বহনকারী বিশেষ বিমানটি অবতরণ করলে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা ও লাল গালিচা সংবর্ধনা জানান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
দক্ষিণ কোরিয়া সফর শেষ করে ফিরতি সফরে বাংলাদেশে আসা হাকান ফিদানের এই সফরটি ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর কোনো তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম ঢাকা সফর। একই সাথে বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গুরুত্বপূর্ণ কোনো শক্তিশালী দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এটাই প্রথম ঢাকা সফর হওয়ায় কূটনৈতিক মহলে এটি ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ আগামীকাল শুক্রবার সকালে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সাথে এক হাই-প্রোফাইল দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন। এরপর শুক্রবার দুপুরের পর তিনি সরাসরি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবির পরিদর্শনে যাবেন এবং সেখানে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের বর্তমান পরিস্থিতি ও তুর্কি মানবিক সহায়তা কার্যক্রম সরেজমিনে ঘুরে দেখবেন।
সফর শেষ করার আগে আগামী শনিবার (৬ জুন) তিনি তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে এক বিশেষ সৌজন্য সাক্ষাৎ ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেবেন। উল্লেখ্য, চলতি বছরের মার্চ মাসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান আঙ্কারায় এক সফল দ্বিপক্ষীয় সফর করেছিলেন, যারই ধারাবাহিকতায় এই ফিরতি সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
ঢাকা ও আঙ্কারার কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তুরস্ক দ্রুত ঢাকার সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করে। বিশেষ করে, সদ্য সমাপ্ত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ের নেপথ্যে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী ভূমিকা রেখেছে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের দেশ।
প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘এমআইটি’ এর সাবেক প্রধান হাকান ফিদানকে দেশটির বর্তমান পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতির অন্যতম প্রধান স্থপতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই কারণে বিশ্ব রাজনীতি ও কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা তার এই ঢাকা সফরকে কেবল সাধারণ কূটনৈতিক প্রোটোকল হিসেবে না দেখে, দক্ষিণ এশিয়ায় তুরস্কের ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত চাল হিসেবে দেখছেন।
কূটনৈতিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুক্রবার অনুষ্ঠেয় দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে আগে থেকে নির্ধারিত কোনো কঠোর আলোচ্যসূচি বা এজেন্ডা নেই। তবে দুই দেশের গভীর হৃদ্যতার কারণে এই মুক্ত আলোচনায় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, নিরাপত্তা সংলাপ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে পারস্পরিক সমন্বয়ের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রসঙ্গগুলো জোরালোভাবে সামনে আসতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুরস্কের সামরিক ও প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা, বিশেষ করে ড্রোন, সামরিক প্রযুক্তি ও আধুনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে বিশ্ববাজারে একচ্ছত্র অবস্থান তৈরি করেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশও তার সামরিক বাহিনীকে আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে তুরস্কের সাথে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে আগ্রহী। বিশ্লেষকদের মতে, তুরস্ক বাংলাদেশকে শুধু বাণিজ্যিক অংশীদার নয়, বরং বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের একটি অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় এক সম্ভাবনাময় কৌশলগত পার্টনার হিসেবে মূল্যায়ন করছে।
রোহিঙ্গা সংকটের শুরু থেকেই আঙ্কারা আন্তর্জাতিক প্রতিটি ফোরামে বাংলাদেশের অবস্থানের প্রতি তাদের সবচেয়ে সক্রিয় ও দৃশ্যমান সমর্থন জানিয়ে আসছে। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই হাই-প্রোফাইল সফরের মধ্য দিয়ে তুরস্ক স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ঢাকা ও আঙ্কারা তাদের বহুমাত্রিক সম্পর্ককে সাধারণ বাণিজ্যিক সহযোগিতার গণ্ডি ছাড়িয়ে এক দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ও কৌশলগত পরিসরে নিয়ে যেতে চায়। ফলে হাকান ফিদানের এই ঢাকা সফরকে দুই ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা।