স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দিতে অনুরোধ জানিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে চিঠি লিখেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ বিষয়ে তিনি জাতিসংঘ মহাসচিবের ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। উত্তরণ পেছানোর প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে সোমবার প্রধানমন্ত্রী ওই চিঠি দিয়েছেন।
নতুন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় সৃষ্ট চলমান জ্বালানি সংকট, আর্থিক খাতের দুর্বলতা, পুঁজিবাজারে দীর্ঘস্থায়ী সংকট, ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্যসহ একগুচ্ছ কারণের কথা চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া মসৃণ উত্তরণে গত পাঁচ বছরে কার্যকর কোনো প্রস্তুতি না থাকার কথা বলা হয়েছে।
সম্প্রতি জাতিসংঘের সংস্থা ইউনাইটেড নেশনস অফিস অব দ্য হাই রিপ্রেজেনটেটিভ ফর দ্য লেস্ট ডেভেলপমেন্ট কান্ট্রিজ, ল্যান্ডলকড ডেভেলপিং কান্ট্রিজ অ্যান্ড স্মল আইল্যান্ড ডেভেলপিং স্ট্যাটস (ইউএনওএইচআরএলএলএস)-এর মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়, এলডিসি থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের প্রস্তুতির বড় ঘাটতি রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর চিঠিতে যা উল্লেখ করেছেন।
চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা পূর্ণ আস্থার সঙ্গে আপনার ব্যক্তিগত সমর্থন বিনীতভাবে কামনা করছি। আমাদের লক্ষ্য এই বহু আকাঙ্ক্ষিত উত্তরণকে প্রতিহত করা নয়; বরং এটি যেন টেকসই এবং স্থিতিস্থাপক হয়, তা প্রকৃত অর্থেই নিশ্চিত করা।’ এতে উল্লেখ করা হয়, এলডিসি থেকে উত্তরণ দীর্ঘদিনের জাতীয় আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু ধারাবাহিক সংকট এবং অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক প্রতিবন্ধকতার ক্রমবর্ধমান চাপ বাংলাদেশকে একটি সতর্ক ও তথ্য-প্রমাণভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণে বাধ্য করেছে।
জানা গেছে, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) তাদের চ্যানেলের মাধ্যমে চিঠিটি মহাসচিবের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। জানতে চাইলে ইআরডির শীর্ষ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা গতকাল সমকালকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ চিঠিটি জাতিসংঘের মহাসচিব পেয়েছেন। সরকারপ্রধানের অনুরোধ বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করবে বলে তারা মনে করছেন।
মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা– এই তিন সূচকে উত্তীর্ণ হয়ে ২০২১ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে। পাঁচ বছর প্রস্তুতিকালীন সময় শেষে চলতি বছরের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এরই মধ্যে গণঅভ্যুত্থানে গত আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়েছে। দেড় বছর একটি অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব পালন করেছে। এলডিসি থেকে বের হলে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাতে হবে। আরও অনেক সুবিধা হারানোর ইস্যু রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রস্তুতির জন্য এটি যথেষ্ট নয়। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ অর্থনীতির সংকট বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সরকারের পক্ষ থেকে ইআরডি জাতিসংঘের কমিটি ফর পলিসির কাছে বাংলাদেশের উত্তরণ তিন বছর পেছানোর আনুষ্ঠানিক আবেদন করে। ওই কমিটি এখন এ বিষয়ে কাজ করছে। কমিটি তাদের পর্যবেক্ষণ জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদকে জানাবে।
গত রোববার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে ইউএনওএইচআরএলএলএসের মূল্যায়ন প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু উপস্থাপন করা হয়। এতে বলা হয়, এলডিসি থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের প্রস্তুতিতে এখনও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এ অবস্থায় উত্তরণ হলে রপ্তানি সক্ষমতা কমবে। রপ্তানি কমলে খেলাপি ঋণ আরও বাড়তে পারে, যা বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত করবে। সরকারের আয় কমলে দেশি-বিদেশি ঋণ পরিশোধ করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। সব মিলিয়ে চাপে পড়বে অর্থনীতি।
প্রধানমন্ত্রীর চিঠিতে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, আমরা একটি ভয়াবহ বিপর্যস্ত সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিবেশ উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি। যার বৈশিষ্ট্য হলো– বেসরকারি খাতের জন্য অর্থায়নের সীমিত সুযোগ, একটি দুর্বল পুঁজিবাজার, আর্থিক খাতের দুর্বলতা ও ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য। বেশির ভাগ সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক নিম্নমুখী প্রবণতা দেখিয়েছে। নতুন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক পণ্য ও সেবামূল্যে অস্থিরতা আমাদের রাজস্ব সংস্থান এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে আরও সংকুচিত করেছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের উত্তরণের বিষয়টি এমন এক সময় বিবেচনা করা হচ্ছে, যখন দেশ চলমান সংঘাত থেকে উদ্ভূত ব্যাপক জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি। বর্তমান জ্বালানি সংকট ইতোমধ্যে অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে চাপের মধ্যে ফেলেছে। জনগণের বছরের পর বছর ধরে অর্জিত কষ্টসাধ্য অগ্রগতি উল্টে যাওয়ার গুরুতর ঝুঁকিতে রয়েছে।
প্রস্তুতিতে ঘাটতি থাকার কারণ হিসেবে চিঠিতে বলা হয়, দুর্ভাগ্যবশত অন্তর্বর্তী সরকারের পূর্ববর্তী শাসনামলে নির্ধারিত পাঁচ বছরের প্রস্তুতি পর্বের বেশির ভাগ সময়ই পর্যাপ্ত অগ্রগতি ছাড়াই অতিবাহিত হয়েছে। এ রকম একটি বাস্তবতায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের চেতনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ একটি মসৃণ, টেকসই এবং স্থিতিশীল উত্তরণ নিশ্চিত করার জন্য মেয়াদ বৃদ্ধির জরুরি প্রয়োজন রয়েছে।
চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনসংখ্যা, জিডিপি এবং পণ্য রপ্তানির দিক থেকে বাংলাদেশ বৃহত্তম স্বল্পোন্নত দেশ। দেশের অগ্রগতির পেছনে বহুলাংশে রয়েছে এলডিসিকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থা। যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা এবং মেধাস্বত্বের ক্ষেত্রে নমনীয়তা। এসব ব্যবস্থা প্রত্যাহার করা হলে তা উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে এবং অর্জিত উন্নয়নকে উল্টে দেওয়ার একটি বাস্তব ঝুঁকি তৈরি করবে।
সূত্র: সমকাল