জীবনের পথে পথে নানা সংকট রয়েছে। চলার পথে রয়েছে বাঁক। আপনি যতই ভাবেন সোজা পথে চলবেন, শান্তিতে থাকবেন তা সবসময় সম্ভব নয়। আপনার চারপাশে অর্থাৎ পরিবার ও আত্মীয়, বন্ধু কিংবা সহকর্মীদের মধ্যে এমন এক বা একাধিক ব্যক্তিকে পাবেন, যারা আপনার পেছনে লেগে থাকে। কেউ আপনার সাফল্যে অস্বস্তি বোধ করে, কেউ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে নাক গলায়, কেউ আবার সুযোগ পেলেই সমালোচনা করে। কখনো তারা সরাসরি বিরোধিতা করে, পেছনে কথা বলে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজর রাখে। আপনার বা অন্যের জীবন নিয়েই তাদের আলাদা এক ব্যস্ততা। প্রশ্ন হলো, মানুষ কেন অন্যের পেছনে লেগে থাকে?
এই প্রবণতা নতুন নয়। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এর পেছনে কাজ করে মানুষের কিছু মানসিক সংকট, অপূর্ণতা ও সামাজিক বাস্তবতা। হ্যান্ডিক্যাপ ইন্টারন্যাশনালের সাইকোলজিস্ট ও টিম ম্যানেজার নাঈমা ইসলাম অন্তরা জানান, অন্যের পিছে লাগা অর্থাৎ কাজে বাধা দেওয়া, মানসিক নির্যাতন, অপবাদ দেওয়া বা শত্রুতা- একটি জটিল আচরণ। এর পেছনে একাধিক মনস্তাত্ত্বিক কারণ বিদ্যমান। মূলত হীনমন্যতা ও আত্মমর্যাদার ঘাটতি, ঈর্ষা ও সামাজিক তুলনা, প্রতিশোধ ও পূর্ব অভিজ্ঞতা, গোষ্ঠীগত বিদ্বেষ, নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয় ইত্যাদি কারণে মানুষ অন্যের পেছনে লেগে থাকে। বুলিং করে বা বিদ্রুপ করে ব্যক্তিকে হীনমন্যতায় ভোগানোর চেষ্টা করে।
নিজের অপূর্ণতা ঢাকতে
যারা অন্যকে ছোট করতে চান, অন্যকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করেন খেয়াল করে দেখবেন তারা ভেতরে ভেতরে নিজের জীবন নিয়েই অসন্তুষ্ট থাকেন। নিজের ব্যর্থতা বা অপূর্ণতা মেনে নিতে না পেরে তারা অন্যের দিকে আঙুল তোলেন। এতে সাময়িকভাবে তারা পোশাচিক আনন্দ লাভ করে। এ ধরনের মানুষ নিজের ভেতরের অস্বস্তি অন্যের ওপর চাপিয়ে দেন। যে ব্যক্তি নিজেকে যথেষ্ট সফল মনে করে না, সে অন্যের সাফল্যে অস্বস্তি বোধ করে। আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবেই মানুষ সমালোচনা, বিদ্রূপ বা অযাচিত মন্তব্য করে।
ঈর্ষা থেকে
কে কত সুন্দর, সফল, জনপ্রিয়, সুখী-এসব তুলনা করা মানুষের অভ্যাস। তুলনা থেকেই ঈর্ষার জন্ম হয়। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলা যায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যের সাজানো জীবন দেখে অনেকেই মেনে নিতে পারেন না। অন্যের সুখও সহ্য করতে পারেন না। আর তখনই অকারণ খোঁচা, বিদ্বেষ কিংবা অবমূল্যায়ন করতে থাকেন। অন্যের জীবন নিয়ে অতিরিক্ত আগ্রহ দেখিয়ে অনেকে একধরনের মানসিক তৃপ্তি পায়।
নিয়ন্ত্রণ করার ইচ্ছা
ঈর্ষা বা অপূর্ণতা থেকেই যে মানুষ পেছনে লেগে থাকে তা নয়। নিয়ন্ত্রণ করার ইচ্ছা থেকেও মানুষ পেছনে লাগে। সমাজে এমন কিছু মানুষ আছে যারা অন্যের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেন না। তারা চান সবাই তাদের ভাবনা অনুযায়ী চলুক। পরিবার, সম্পর্ক বা কর্মক্ষেত্রে এ ধরনের মানুষ প্রায়ই দেখা যায়। কেউ নিজের মতের বাইরে গেলেই তারা বিরূপ হয়ে ওঠেন। এই আচরণের পেছনে থাকে নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়। তারা মনে করেন, অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই নিজের গুরুত্ব বজায় থাকবে।
মনোযোগ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা
কিছু মানুষ আছেন যারা সমালোচনা বা বিরোধ তৈরির মাধ্যমে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে চান। তারা মনে করেন, কাউকে নিয়ে আলোচনা করতে পারলে বা কারো জীবনে প্রভাব ফেলতে পারলে তারা আলোচনায় থাকবেন। এ কারণেই অনেক সময় দেখা যায়, যারা নিজের জীবনে খুব বেশি ইতিবাচক কাজ করতে পারেন না, তারা অন্যের জীবন নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকেন।
মানুষ আপনাকে নিয়ে গসিপ করলে, আপনার সমালোচনা করলে আপনি ভুল তা মনে করবেন না। বরং ভাবতে হবে আপনি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। আবার সবসময় সমালোচনাকে খারাপভাবে দেখলে চলবে না। কখনো কখনো সমালোচনা প্রয়োজনীয়ও হতে পারে। কাছের মানুষ ভুল ধরিয়ে দিলে তা উন্নতির সুযোগ তৈরি করে। তবে পার্থক্য হলো, গঠনমূলক সমালোচনার উদ্দেশ্য সংশোধন, আর বিদ্বেষপূর্ণ সমালোচনার উদ্দেশ্য আঘাত দেওয়া। যদি গঠনমূলক সমালোচনা পান, তবে নিজেকে শোধরে নিন।
বুলিং, বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ কিংবা সমালোচনাকে কীভাবে সামলাবেন
নাঈমা ইসলাম অন্তরা জানান, অন্যের নেতিবাচক আচরণে ভেঙে না পড়ে বুঝতে হবে ব্যক্তির নিজেরই হয়তো নানান সংকট ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই কেউ কিছু বললে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেখানো যাবে না। কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে, শ্বাস প্রশ্বাসের অনুশীলন করলে অনেকটা শান্ত থাকা যায়।
সবসময় বিদ্রুপ বা সমালোচনাকে ব্যক্তিগতভাবে না নিয়ে প্রকৃত ঘটনা বোঝার চেষ্টা করুন। মন দিয়ে তাদের ব্যাখা শুনুন। এরপর নিজের অনুভূতি শান্তভাবে প্রকাশ করুন।
যারা সবসময় আপনাকে উত্যক্ত করে তাদের সঙ্গে বাউন্ডারি সেট করুন। প্রয়োজন হলে দূরত্ব বজায় রাখুন। নেতিবাচক মানুষ নয়, ইতিবাচক মানুষদের সঙ্গে মিশুন।
এরপরও যদি আপনার আত্মবিশ্বাস ভেঙে যায়, চাপ অনুভব করেন তাহলে সাইকোথেরাপি বা কাউন্সিলিং সেশন নিন।