রমজান মাসে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ছন্দে বড় পরিবর্তন আসে। সেহরির জন্য ভোরে ঘুম থেকে ওঠা, রাতে তারাবি ও ইফতারের ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে স্বাভাবিক ঘুমের রুটিনে ব্যাঘাত ঘটে। ফলে অনেকেই দিনের বেলা ঝিমুনি, মাথাব্যথা, মনোযোগের ঘাটতি বা অস্বস্তি অনুভব করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তন মূলত শরীরের জৈবিক ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদমে প্রভাব ফেলে। ঘুমের সময় ভেঙে গেলে বা কমে গেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, মেজাজ ও কর্মক্ষমতা কমে যেতে পারে।
আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব স্লিপিং মেডিসিনের পরামর্শ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন গড়ে ৭–৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। রমজানে টানা ঘুম সম্ভব না হলেও মোট ঘুমের সময় যেন ৬–৮ ঘণ্টার কম না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
কেন ঘুমের সমস্যা বাড়ে?
১. সময়সূচির পরিবর্তন
ভোরে সেহরির জন্য উঠতে হওয়ায় রাতের গভীর ঘুম ভেঙে যায়। এতে শরীর পূর্ণ বিশ্রাম পায় না।
২. ইফতারে ভারী খাবার
অতিরিক্ত তেল–ঝাল, ভাজাপোড়া বা মিষ্টিজাত খাবার হজমে সমস্যা তৈরি করে। বুকজ্বালা, গ্যাস বা অস্বস্তির কারণে ঘুম ব্যাহত হয়।
৩. ক্যাফেইনের প্রভাব
ইফতারের পর চা বা কফি পান করলে ক্যাফেইন কয়েক ঘণ্টা সক্রিয় থাকে, যা ঘুমের হরমোনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।
৪. স্ক্রিন টাইম বৃদ্ধি
শোবার আগে মোবাইল বা টিভির নীল আলো মেলাটোনিন নিঃসরণে বাধা দেয়, ফলে ঘুম আসতে দেরি হয়।
রোজায় ভালো ঘুমের জন্য করণীয়
১. মোট ঘুমের সময় ঠিক রাখুন
তারাবির পর ৪–৫ ঘণ্টা এবং সেহরির পর ১–২ ঘণ্টা ঘুমানো যেতে পারে। সম্ভব হলে দিনে ২০–৩০ মিনিটের পাওয়ার ন্যাপ উপকারী।
২. নির্দিষ্ট রুটিন বজায় রাখুন
প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে ও উঠতে চেষ্টা করুন। এতে শরীর দ্রুত নতুন সময়সূচির সঙ্গে মানিয়ে নেয়।
৩. ইফতার হালকা রাখুন
পানি ও খেজুর দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে সুষম খাবার খান। অতিরিক্ত ভাজাপোড়া এড়িয়ে চলুন।
৪. ক্যাফেইন নিয়ন্ত্রণ করুন
শোবার অন্তত ৪–৬ ঘণ্টা আগে চা–কফি এড়িয়ে চলুন।
৫. পর্যাপ্ত পানি পান করুন
ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত ধাপে ধাপে ৮–১০ গ্লাস পানি পান করুন।
৬. শোবার আগে স্ক্রিন ব্যবহার কমান
ঘুমের অন্তত ৩০–৪৫ মিনিট আগে মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহার বন্ধ রাখুন।
৭. আরামদায়ক ঘুমের পরিবেশ তৈরি করুন
ঘর অন্ধকার, শান্ত ও হালকা ঠান্ডা রাখুন। বিছানা আরামদায়ক হওয়া জরুরি।
৮. হালকা শারীরিক কার্যকলাপ করুন
ইফতারের ৩০–৬০ মিনিট পর হালকা হাঁটা হজমে সহায়ক এবং রাতে ঘুম ভালো হতে সাহায্য করে।
৯. মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখুন
স্ট্রেস কমাতে গভীর শ্বাস–প্রশ্বাস, প্রার্থনা বা ধ্যানের অভ্যাস উপকারী।
কারা বিশেষভাবে সতর্ক থাকবেন?
ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, বয়স্ক ব্যক্তি বা দীর্ঘদিন মানসিক চাপে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ঘুমের ঘাটতি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। দীর্ঘদিন অনিদ্রা, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।