মহান আল্লাহ তায়ালার প্রেরিত নবী-রাসূলদের চেনার অন্যতম নির্ভরযোগ্য উপায় হলো তাঁদের চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা। কারণ নবুওয়াতের দাবি শুধু অলৌকিক নিদর্শনের ওপর নির্ভর করে না; বরং তা ব্যক্তিত্বের সততা, নৈতিক দৃঢ়তা, মানবিকতা এবং সমাজের প্রতি তাঁদের আচরণের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়। ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইসলামের দ্রুত বিস্তার এবং মানুষের অন্তরে এর গভীর প্রভাব বিস্তারের প্রধান কারণ ছিল মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর অসাধারণ চরিত্র, মাধুর্যপূর্ণ আচরণ এবং মানবিক গুণাবলী।
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-ইমরানের ১৫৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেন, আল্লাহর রহমতের কারণেই আপনি তাদের প্রতি কোমল হয়েছেন। যদি আপনি রুক্ষ ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, তবে তারা আপনার চারপাশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। অতএব তাদের অপরাধ মার্জনা করো, আর তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করো। আর তাদের সঙ্গে কাজেকর্মে পরামর্শ করো। আর যখন সংকল্প গ্রহণ করেছো তখন আল্লাহর ওপর নির্ভর করো।
এই আয়াত প্রমাণ করে যে নেতৃত্বের মূল ভিত্তি হলো নম্রতা, সহমর্মিতা এবং ক্ষমাশীলতা। একজন নেতা মানুষের মন জয় করতে পারেন তাঁর চারিত্র্যিক মাধুর্যের মাধ্যমে, শক্তি বা ভয়ের মাধ্যমে নয়। মহানবী (সা.) মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন তাঁর আন্তরিকতা এবং বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) মানুষের সাথে সুন্দর সম্পর্ক স্থাপনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। তিনি শিক্ষা দিয়েছেন, মানুষের সাথে সদাচরণ করা ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর জীবন ছিল মানবতার জন্য এক উন্মুক্ত বিদ্যালয়, যেখানে দয়া, সহানুভূতি, ক্ষমা এবং ধৈর্যের বাস্তব শিক্ষা ছিল উপস্থিত।
সূরা আত-তাওবার ১২৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের কাছে একজন রাসূল এসেছেন, তোমাদের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত দুঃসহ। তিনি তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু ও করুণাময়। এই আয়াতে মহানবী (সা.) এর মানবিকতার সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছে। মহানবী (সা.) শুধু একজন ধর্মীয় নেতা ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন মানবতার এক মহান সেবক। মানুষের দুঃখ-কষ্ট তাঁকে ব্যথিত করত, মানুষের কল্যাণ ছিল তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য।
হজরত আলী (রা.) মহানবী (সা.) কে এমন একজন চিকিৎসকের সাথে তুলনা করেছেন, যিনি রোগীদের চিকিৎসার জন্য তাঁদের কাছে নিজেই চলে যান। এই উপমা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সাধারণত রোগী চিকিৎসকের কাছে যায়, কিন্তু মহানবী (সা.) নিজেই মানুষের কাছে গিয়ে তাঁদের অজ্ঞতা, বিভ্রান্তি এবং নৈতিক অবক্ষয়ের রোগ থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন আত্মার চিকিৎসক, যিনি মানবতার আধ্যাত্মিক পুনর্জাগরণ ঘটিয়েছেন।
মহানবী (সা.) এর চারিত্র্যিক সৌন্দর্যের অন্যতম দিক ছিল তাঁর অসীম ধৈর্য এবং ক্ষমাশীলতা। মুশরিকরা যখন তাঁকে উপহাস করত, অপমান করত এবং নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতো, তখনও তিনি প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি, বরং তিনি ধৈর্য ধারণ করেছেন এবং আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী তাদের উপেক্ষা করেছেন। সূরা আল-আরাফের ১৯৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, ক্ষমাশীল হও, সৎকাজের আদেশ দাও এবং অজ্ঞদের এড়িয়ে চলো। মহানবী (সা.) এই নীতিকে তাঁর জীবনে বাস্তবায়ন করেছিলেন।
তাঁর বিনয় ছিল অসাধারণ। তিনি ধনী-গরিব, শিশু-বৃদ্ধ—সবার সাথে সমান আচরণ করতেন। তিনি শিশুদের আগে সালাম দিতেন, দরিদ্রদের সাথে বসতেন এবং কখনো নিজের জন্য বিশেষ সম্মান দাবি করতেন না। কোনো সভায় গেলে তিনি অন্যদের তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করতে নিষেধ করতেন। তাঁর এই আচরণ মানুষের হৃদয়ে গভীর ভালোবাসা সৃষ্টি করেছিল।
হাতেম তাঈয়ের কন্যা সেফানার ঘটনাটি মহানবী (সা.) এর চরিত্রের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সেফানা বন্দী হওয়ার পর যখন তাঁর পিতার মানবিক গুণাবলীর কথা উল্লেখ করে মুক্তির আবেদন করেন, তখন মহানবী (সা.) তাঁর পিতার মহান চরিত্রের প্রতি সম্মান দেখিয়ে তাকে মুক্ত করে দেন। শুধু তাই নয়, তাকে সম্মানের সাথে তার পরিবারে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে মহানবী (সা.) শুধু মুসলমানদের প্রতিই নয়, বরং সব মানুষের প্রতিই মানবিক আচরণ করতেন, কারণ তিনি প্রেরিত হয়েছিলেন বিশ্ব মানব কল্যাণের জন্য সব শ্রেণির মানুষের জন্য।
আরেকটি ঘটনা হলো ওদাই ইবনে হাতেমের ইসলাম গ্রহণ। তিনি যখন মহানবী (সা.)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন, তখন দেখেন যে তিনি একজন সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করছেন। রাসূল (সা.) তাঁর জন্য নিজের আসন ছেড়ে দেন এবং নিজে মাটিতে বসেন। পথে একজন দরিদ্র বৃদ্ধার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। এই বিনয়, মানবিকতা এবং সরলতা ওদাইকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে এবং শেষ পর্যন্ত তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে মহানবী (সা.)-এর চরিত্রই ছিল ইসলামের সবচেয়ে বড় দাওয়াত।
মহানবী (সা.) কখনো ব্যক্তিগত অপমানের প্রতিশোধ নেননি, কিন্তু আল্লাহর বিধানের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন আপসহীন। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে ন্যায় প্রতিষ্ঠা ছাড়া সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তাঁর জীবন আমাদের শিক্ষা দেয় যে নম্রতা এবং দৃঢ়তা এই দুটি গুণ একসাথে থাকা সম্ভব এবং একজন আদর্শ নেতার জন্য এই দুটি গুণ অপরিহার্য।
বর্তমান বিশ্বে যখন সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা এবং নৈতিক অবক্ষয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন মহানবী (সা.) এর চরিত্র সবার জন্যই হতে পারে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় কিভাবে মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হয়, কিভাবে ক্ষমা করতে হয় এবং কিভাবে সত্য ও ন্যায়ের পথে দৃঢ় থাকতে হয়।
সূত্র: চ্যানেল ২৪