প্রিয় মানুষটির দেহ মাটিতে শুয়ে আছে কিন্তু তার আমলনামা এখন বন্ধ। কেবল কিছু সীমিত উপায়ে জীবিতদের আমল তার জন্য উপকার বয়ে আনতে পারে। ইসলাম আমাদের সেই পথগুলোই শিখিয়েছে—যেগুলো সত্যিই মৃতের উপকারে আসে। স্বজন ও প্রিয়জনের মৃত্যুর পর যে কাজগুলো গুরুত্বসহকারে করতে হবে, তা তুলে ধরা হলো—
১️. ধৈর্য ও আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা
স্বজন বা প্রিয়জন মারা গেলে অস্থিরতা, বিলাপ, চিৎকার— এসব থেকে বিরত থাকা ইমানের দাবি। প্রথম ও সবচেয়ে জরুরি আমল হলো সবর (ধৈর্যধারণ) করা। আর এ আয়াত তেলাওয়াত করা—
إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ
‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’।
‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর, আর আমরা তার কাছেই ফিরে যাব।’ (সুরা বাকারা: ১৫৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
‘যে ব্যক্তি বিপদের সময় ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ বলবে, আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দেবেন।’ (মুসলিম)
২️. মৃতের জন্য বেশি বেশি দোয়া করা (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ)।
দোয়া হলো মৃতের জন্য সবচেয়ে উপকারী ও শক্তিশালী আমল।
> اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ
‘আল্লাহুম্মাগফির লাহু ওয়ারহামহু’
‘হে আল্লাহ! তাকে ক্ষমা করুন, তার প্রতি রহম করুন।’
> رَحِمَهُ اللَّهُ رَحْمَةً وَاسِعَةً
‘রাহিমাহুল্লাহু রাহমাতান ওয়াসিয়াহ’
‘আল্লাহ তাকে প্রশস্ততা ও ব্যাপক রহমত দান করুন।’
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثٍ: صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ
‘মানুষ মারা গেলে তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি আমল ছাড়া—
> সাদকায়ে জারিয়া;
> উপকারী জ্ঞান এবং
> নেক সন্তান— যে তার জন্য দোয়া করে।’ (তিরমিজি ১৩৮০)
নিয়মিত নামাজের পর, তাহাজ্জুদের সময়, জুমার দিন—দোয়া করা উত্তম।
৩️. মৃতের পক্ষ থেকে সদকা ও দান করা
মৃতের নামে সদকা করা তার কবরের অন্ধকারে আলো হয়ে যায়। এক সাহাবি জিজ্ঞাসা করলেন—
إِنَّ أُمِّي افْتُلِتَتْ نَفْسُهَا، وَأُرَاهَا لَوْ تَكَلَّمَتْ تَصَدَّقَتْ، أَفَلَهَا أَجْرٌ إِنْ تَصَدَّقْتُ عَنْهَا؟ قَالَ: نَعَمْ
‘আমার মা হঠাৎ মারা গেছেন, তিনি কথা বলতে পারেননি। আমি যদি তার পক্ষ থেকে সদকা করি, উপকার হবে?’
রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন— ‘হ্যাঁ।’ (বুখারি ২৭৬০)
মৃতব্যক্তির পক্ষে দান হতে পারে এমন—
> খাবার দান
> কূপ/নলকূপ
> কুরআন বিতরণ
> মসজিদ, মাদরাসায় সাহায্য
৪️. কুরআন তিলাওয়াত করে সওয়াব পৌঁছানো
ইসলামিক স্কলারদের মতে— কুরআন পড়ে মৃতের জন্য সওয়াব হাদিয়া করা। বিশেষভাবে পড়া যায়—
> সুরা ইয়াসিন
> সুরা ইখলাস
> সুরা ফালাক ও নাস
তবে এটিকে নির্দিষ্ট দিন বা বাধ্যতামূলক রীতি বানানো যাবে না।
৫️. ঋণ ও অধিকার আদায় করা
মৃত্যুর পর সর্বপ্রথম মৃতের ঋণ পরিশোধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
نَفْسُ الْمُؤْمِنِ مُعَلَّقَةٌ بِدَيْنِهِ حَتَّى يُقْضَى عَنْهُ
‘মুমিনের আত্মা তার ঋণের কারণে ঝুলে থাকে, যতক্ষণ না তা পরিশোধ করা হয়।’ (তিরমিজি ১০৭৮)
এ পাওনা বা অধিকার হতে পারে এমন—
> আর্থিক ঋণ
> মানুষের অধিকার
> অন্যায় করলে ক্ষমা চাওয়া
৬️. ভালো কাজ অব্যাহত রাখা—যা সে শুরু করে গেছে। যেগুলো সাদকায়ে জারিয়া হিসেবে চলতে থাকে। তাহলো—
> তার রেখে যাওয়া নেক কাজগুলো চালু রাখা
> তার সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া
> তার নামে দোয়া অব্যাহত রাখা
৭️. বিদআত ও ভুল রীতি থেকে দূরে থাকা
ইসলাম সহজ ও শুদ্ধ আমল চায়, লোকাচার নয়।
> তৃতীয় দিন, চল্লিশা, বার্ষিক মিলাদ— এগুলো ফরজ বা সুন্নাহ নয়
> শোককে প্রদর্শনী বানানো ইসলামসম্মত নয়
৮. সর্বোপরি মৃতের জন্য মাগফেরাত ও রহমতের দোয়া করা
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ، وَعَافِهِ وَاعْفُ عَنْهُ، وَأَكْرِمْ نُزُلَهُ، وَوَسِّعْ مُدْخَلَهُ
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মাগফিরলাহু ওয়ারহামহু; ওয়া আফিহি ওয়াফু আনহু; ওয়া আকরিম নুযুলাহু; ওয়া ওয়াসসিঅ মুদখালাহু।’
অর্থ: হে আল্লাহ! তাকে ক্ষমা করুন; তার প্রতি রহম করুন; তাকে নিরাপদ রাখুন; তাকে মার্জনা করুন; তার আতিথেয়তা সম্মানিত করুন এবং তার কবর প্রশস্ত করে দিন। (নাসাঈ ১৯৮৮)
প্রিয়জন চলে যাওয়ার পর— কান্না নয় দোয়া করুন, আয়োজন নয় সদকা দিন, রীতি নয় শুদ্ধ আমল করুন; কারণ দোয়া— সবচেয়ে শক্তিশালী উপহার; সদকা— কবরে নূর; ঋণ পরিশোধ— আত্মার মুক্তি এবং সবর ও তাকওয়া— আল্লাহর সন্তুষ্টির অন্যতম মাধ্যম। আল্লাহ আমাদের সকল মৃত স্বজনকে মাগফিরাত ও জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।
সূত্র: যুগান্তর