শিরোনাম
◈ মন্ত্রিসভায় যুক্ত হচ্ছেন আরও চারজন, শপথ আজ সন্ধ্যায় ◈ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য সরকারের নির্দেশনা ◈ শিক্ষা খাতে সবচেয়ে বড় বাজেট বাস্তবায়ন করেছে বিএনপি সরকার: অর্থমন্ত্রী ◈ জিন্নাহর গোপন রোগের তথ্য ফাঁস, ৭৯ বছর পর পুরস্কৃত দুই চিকিৎসক ◈ জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা জানালেন নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ◈ ইতালি রোমের আলোচিত ঘটনা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে যা বললেন নগরবাউল জেমস! ◈ ডলারের দাম অপরিবর্তিত, সপ্তাহজুড়ে ওঠানামা পাউন্ড-ইউরোসহ অন্যান্য মুদ্রায় ◈ বিলের পানিতে হাঁস পালন করে বদলাচ্ছে নড়াইলের তরুণদের ভাগ্য, ডিমের বাজার ২২ কোটি টাকা! ◈ ‘ভুয়া’ খবর বিষয়ক সতর্কবার্তা দিল ভারতীয় হাইকমিশন ◈ পরিবারের বড় ছেলে, যার কাঁধে অনেক দায়িত্ব: মির্জা ফখরুলকে নিয়ে জামাতা ফাহাম

প্রকাশিত : ২১ আগস্ট, ২০২৬, ০৩:৩১ দুপুর
আপডেট : ২১ আগস্ট, ২০২৬, ০৪:১৬ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

জিন্নাহর গোপন রোগের তথ্য ফাঁস, ৭৯ বছর পর পুরস্কৃত দুই চিকিৎসক

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন।। ফুসফুসের ওপর পিংপং বলের চেয়েও বড় দুটি কালো বৃত্ত, চারপাশে সাদা গোল গোল দাগ-একটি এক্স-রেতে ধরা পড়েছিল পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ফুসফুসের ভয়াবহ চিত্র। চিকিৎসকেরা তখন বুঝতে পারেন, যক্ষ্মা তার ফুসফুসকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে দিচ্ছে।

সেই গোপন চিকিৎসা তথ্য প্রকাশ না করে কয়েক দশক ধরে গোপন রাখার স্বীকৃতি হিসেবে জিন্নাহর দুই চিকিৎসক ড. জল রতনজি প্যাটেল ও রেডিওলজিস্ট ড. জল ডেবুকে মরণোত্তর ‘নিশান-ই-কায়েদ-ই-আজম’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের ২০২৬ সালের বেসামরিক পুরস্কারের সরকারি তালিকাতেও তাদের নাম রয়েছে।

ল্যারি কলিন্স ও ডমিনিক ল্যাপিয়েরের ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত ‘ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট’ বইয়ে বলা হয়েছে, ১৯৪৬ সালের জুনে বোম্বের চিকিৎসক ড. প্যাটেল ও রেডিওলজিস্ট ড. ডেবু জিন্নাহর এক্স-রে পরীক্ষা করে বুঝতে পারেন, তার রোগ অনেকটাই ছড়িয়ে পড়েছে। চিকিৎসকদের ধারণা ছিল, তিনি হয়তো আর মাত্র এক বা দুই বছর বাঁচবেন।

কিন্তু জিন্নাহর নির্দেশে তারা তার অসুস্থতার কথা গোপন রাখেন। পাকিস্তানের আর্মি ইনস্টিটিউট অব মিলিটারি হিস্ট্রিও এই ঘটনাকে জিন্নাহর জীবনের অন্যতম গোপন তথ্য হিসেবে বর্ণনা করেছে।
পাকিস্তানের পরিকল্পনামন্ত্রী ও পুরস্কার কমিটির চেয়ারম্যান আহসান ইকবাল বলেছেন, দুই চিকিৎসকের পেশাগত আনুগত্য ও গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টি পাকিস্তান সৃষ্টির ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম ডন জানিয়েছে, সাত দশকেরও বেশি সময় পর জিন্নাহর চিকিৎসক ড. জল রতনজি প্যাটেল ও ড. জল ডেবুকে মরণোত্তর ‘নিশান-ই-কায়েদ-ই-আজম’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পুরস্কারটি আগামী ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসের আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে দেওয়া হবে।

জিন্নাহর অসুস্থতা দীর্ঘদিন বিশ্বের চোখের আড়ালেই ছিল। ইতিহাসবিদ আকবর আহমেদের ‘জিন্নাহ, পাকিস্তান অ্যান্ড ইসলামিক আইডেন্টিটি: ইন সার্চ অব সালাদিন’ বইয়ে বলা হয়েছে, জিন্নাহর পরিপাটি পোশাক, ব্যক্তিত্ব ও দৃঢ় মানসিকতা তার শারীরিক দুর্বলতাকে অনেকটাই আড়াল করে রেখেছিল। ১৯৩৮ সাল থেকেই তিনি স্নায়ু ও শারীরিক শক্তির ওপর প্রচণ্ড চাপের কথা বলছিলেন। এরপর তিনি প্রায়ই অসুস্থ হতে শুরু করেন, কিন্তু তার অসুস্থতার বিষয়টি গোপন রাখা হয়।

১৯৪৪ সালের সেপ্টেম্বরে ড. প্যাটেল যখন জিন্নাহকে পরীক্ষা করেন, তখন তার রক্তচাপ ছিল প্রায় ৯০ বলে হেক্টর বলিথোর ‘জিন্নাহ, ক্রিয়েটর অব পাকিস্তান’ বইয়ে উল্লেখ রয়েছে। সে সময় জিন্নাহ পূর্ণ উদ্যমে কাজ করলেও অত্যন্ত শীর্ণ ও দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। তিনি বুকে ব্যথা ও কাশির কথাও বলেছিলেন। তার ফুসফুসের নিচের অংশে নিউমোনিয়ার লক্ষণও ছিল।

ড. প্যাটেল তাকে ক্যালশিয়াম, পুষ্টিকর ওষুধ ও শর্ট-ওয়েভ ডায়াথার্মি ব্যবহারের পরামর্শ দেন। চিকিৎসার পর কাশি কমে গেলে জিন্নাহ বিশ্রামের জন্য পাহাড়ে চলে যান। ফিরে আসার পর তার ওজন ১৮ পাউন্ড বেড়েছিল। ওই সময় সংবাদপত্রে তার সুস্থতার খবর প্রকাশিত হলে ড. প্যাটেলের নামও সামনে আসে। এতে জিন্নাহ তার চিকিৎসককে ধন্যবাদ জানান।

আকবর আহমেদের মতে, ১৯৪৫ সালের প্রথম ছয় মাসের বেশিরভাগ সময় জিন্নাহ অসুস্থ ছিলেন। ওই বছরের ৯ অক্টোবরের একটি চিঠিতেও তিনি প্রচণ্ড চাপের কথা স্বীকার করেছিলেন। তার চিকিৎসকেরা তাকে বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দিলেও পাকিস্তানের জন্য রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং হাতে থাকা সীমিত সময় তাকে থামতে দেয়নি।

১৯৪৬ সালের মে মাসের শেষ দিকে মুসলিম লীগের এই নেতা শিমলায় আবার ব্রঙ্কাইটিসে আক্রান্ত হন। তার ঘনিষ্ঠ বোন ফাতিমা জিন্নাহ তাকে ট্রেনে করে বোম্বে নিয়ে আসেন। কিন্তু যাত্রাপথে তার অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। ফাতিমা সঙ্গে সঙ্গে ড. প্যাটেলকে খবর দেন। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে ড. প্যাটেল ট্রেনের পথেই তার সঙ্গে দেখা করেন এবং জিন্নাহকে জনসমাগম এড়িয়ে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান।

১৯৭০-এর দশকের গোড়ার দিকে ‘ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট’ বইয়ের গবেষণার সময় ড. প্যাটেল লেখকদের তার গোপন চিকিৎসা নথি দেখান। ফাইলটির ওপর শুধু ‘এম এ জিন্নাহ’ লেখা ছিল। ততদিনে রেডিওলজিস্ট ড. জল ডেবু মারা গিয়েছিলেন। তার মেয়ে হোমির কাছ থেকেও একই তথ্য পান লেখকেরা। এরপরই জিন্নাহর যক্ষ্মার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।

‘ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট’-এর বর্ণনা অনুযায়ী, ড. প্যাটেল জিন্নাহকে জানান যে তার শারীরিক শক্তি প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। কাজের চাপ না কমালে, নিয়মিত বিশ্রাম না নিলে ও ধূমপান না ছাড়লে তিনি হয়তো এক বা দুই বছরের বেশি বাঁচবেন না। কিন্তু এই সতর্কবার্তায় জিন্নাহ তার রাজনৈতিক লক্ষ্য থেকে সরে আসেননি। তিনি জানতেন, তার অসুস্থতার খবর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছে পৌঁছালে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।

বইটিতে আরও বলা হয়েছে, জিন্নাহর আশঙ্কা ছিল, বিরোধীরা যদি জানতে পারে তিনি মৃত্যুপথযাত্রী, তাহলে তারা তার মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকতে পারে এবং মুসলিম লীগের নেতৃত্বে আরও নমনীয় কাউকে সামনে আনতে পারে। তাই তিনি নিজের অসুস্থতা গোপন রাখার সিদ্ধান্ত নেন। ড. প্যাটেলের কাছ থেকে গোপনে চিকিৎসা নেওয়ার পাশাপাশি তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে থাকেন।

আকবর আহমেদের মতে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময় জিন্নাহর স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ছিল। তিনি যক্ষ্মায় আক্রান্ত ছিলেন এবং অতিরিক্ত ধূমপান ও কঠোর পরিশ্রম তার শারীরিক অবস্থাকে আরও খারাপ করে দিয়েছিল।

১৯৪৭ সালের আগস্টে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরও জিন্নাহ কাজের চাপ কমাননি। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতে তার দীর্ঘদিনের পার্সি বন্ধু জামশেদ নাসরওয়ানজি করাচির গভর্নমেন্ট হাউসের বাগানে তাকে প্রায় অর্ধনিদ্রিত অবস্থায় দেখতে পান। জিন্নাহ চোখ খুলে বলেছিলেন, ‘আমি খুব ক্লান্ত, জামশেদ, খুব ক্লান্ত।’

সেই সময় জিন্নাহ মাঝে মাঝে বাগানে বসে চুপচাপ থাকতেন এবং অল্প সময়ের জন্য ঘুমিয়ে নিতেন। একবার বাগানে হাঁটার সময় একটি ফুল তুলে কোটে লাগিয়েছিলেন বলেও হেক্টর বলিথোর বইয়ে উল্লেখ রয়েছে।

‘দ্য স্টেটসম্যান’-এর সাবেক সম্পাদক ইয়ান স্টিফেনস ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে জিন্নাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। পরে তিনি লিখেছিলেন, তখন কেউ বুঝতে পারেনি যে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মৃত্যুশয্যায় ছিলেন। তার ফুসফুস যক্ষ্মায় মারাত্মকভাবে আক্রান্ত ছিল এবং কয়েক মাস পরই এই রোগ তার জীবন কেড়ে নেয়।

১৯৪৮ সালের জুলাইয়ের দিকে জিন্নাহর দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগ আরও বেড়ে যায়। তাকে বেলুচিস্তানের জিয়ারাতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কিছুদিন অবস্থান করেও তার স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়নি। রক্ত পরীক্ষা ও বুকের এক্স-রে পর্যালোচনা করে তার চিকিৎসক কর্নেল এলাহি বখশও বুঝতে পারেন, তার দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগ আর সারার নয়।

জিন্নাহর চিকিৎসা নিয়ে গোপনীয়তার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় মার্কিন চিকিৎসক ও লেখক ড. ফ্র্যাঙ্ক রায়ানের বর্ণনায়। তার ‘টিউবারকুলোসিস: দ্য গ্রেটেস্ট স্টোরি নেভার টোল্ড’ বইয়ে তিনি লিখেছেন, ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত পাকিস্তানি দূতাবাস থেকে তাকে কয়েকবার রহস্যময় ফোন করে জরুরি ভিত্তিতে করাচিতে যাওয়ার অনুরোধ করা হয়েছিল। তবে রোগীর নাম বা শারীরিক অবস্থার কোনো তথ্য তাকে দেওয়া হয়নি। পরে জানানো হয়, রোগী মারা যাওয়ায় তার আর প্রয়োজন নেই। কয়েক বছর পর এক চিকিৎসকের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, সেই রোগী ছিলেন জিন্নাহ।

জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ফুসফুসের যক্ষ্মায় মারা যান। তার মৃত্যুর কয়েক দশক পর ‘ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট’ বইয়ে তার অসুস্থতার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। বইটির লেখকদের দাবি ছিল, ১৯৪৭ সালের আগে জিন্নাহর গুরুতর অসুস্থতার কথা ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন, জওহরলাল নেহেরু বা মহাত্মা গান্ধী জানলে ভারতের বিভাজনের ইতিহাস ভিন্ন হতে পারত।

বইটির গবেষকদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় মাউন্টব্যাটেন জিন্নাহর চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য জানতে পেরে বিস্মিত হয়েছিলেন বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে। তার বক্তব্য ছিল, ওই সময় জিন্নাহর অসুস্থতার ভয়াবহতা জানলে তিনি স্বাধীনতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত কয়েক মাস পিছিয়ে দিতে পারতেন এবং পাকিস্তান হয়তো সৃষ্টি নাও হতে পারত। তবে এই ব্যাখ্যা মূলত ‘ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট’-এর লেখকদের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ; জিন্নাহর অসুস্থতা ভারত ভাগ ঠেকাতে পারত-এটি নিশ্চিত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে সর্বসম্মত নয়।

ড. জল রতনজি প্যাটেল এর আগেও ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘পদ্মভূষণ’ পেয়েছিলেন। ১৯৬২ সালে ভারত সরকার তাকে এই পুরস্কারে ভূষিত করে। এবার পাকিস্তান তার পাশাপাশি রেডিওলজিস্ট ড. জল ডেবুকেও মরণোত্তর ‘নিশান-ই-কায়েদ-ই-আজম’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

পাকিস্তানের সরকারি পুরস্কার তালিকায় দুই চিকিৎসককেই ‘সার্ভিসেস টু পাকিস্তান’ শ্রেণিতে মরণোত্তর ‘নিশান-ই-কায়েদ-ই-আজম’-এর জন্য মনোনীত করা হয়েছে। আগামী ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসের অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের এই সম্মান দেওয়া হবে।

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়