শিরোনাম
◈ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ থেকে ‘সাদা মহিষ’, নাম ও বানান বিতর্কে পদ হারালেন জাতীয় চিড়িয়াখানার কিউরেটর ◈ যশোরের রাজারহাটে চামড়ার দাম নিয়ে হতাশা, আবারও বাজার ধসের শঙ্কা ◈ বাংলাদেশসহ বিশ্বের আকাশে আজ রাতে দেখা মিলতে পারে বিরল ‘ব্লু মুন' ◈ ১০ মিটারের মধ্যে এলেই 'নীরব মৃত্যু' : ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ বাহিনীকে কোণঠাসা করছে ঘাতক রোবট ◈ শেখ হাসিনা পদত্যাগপত্র লিখেছিলেন কিন্তু তিনি জমা দিয়ে যেতে পারেন নাই, ভ্যানিটি ব্যাগে করে নিয়ে গেছেন: মতিউর রহমান চৌধুরী ◈ চাকরি, স্বাস্থ্যসেবা ও আবাসন থেকে বঞ্চিত করে যেভাবে অভিবাসীদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছেন ট্রাম্প ◈ নতুন জীবনের খোঁজে দেশ ছাড়ছেন আমেরিকানরা, পরামর্শ নিতে খরচ করছেন শত শত ডলার ◈ বাংলাদেশ সীমান্ত নিয়ে অমিত শাহর ‘ব্লুপ্রিন্ট’, কী আছে পরিকল্পনায়? ◈ রোবটের শক্তিতে পাল্টে যাচ্ছে ইউক্রেন যুদ্ধ, রাশিয়া পড়েছে রক্ষণাত্মক অবস্থানে (ভিডিও) ◈ নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার: ডিএনএ পরীক্ষায় স্তন ক্যানসারের অনেক রোগীর আর লাগবে না কেমোথেরাপি

প্রকাশিত : ৩১ মে, ২০২৬, ০১:৪৩ দুপুর
আপডেট : ৩১ মে, ২০২৬, ১০:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

বাংলাদেশ সীমান্ত নিয়ে অমিত শাহর ‘ব্লুপ্রিন্ট’, কী আছে পরিকল্পনায়?

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে জিতেছে বিজেপি। এর ফলে, দলটির ভাষায় ‘ডাবল ইঞ্জিনের সরকার’ গঠিত হয়েছে রাজ্যটিতে। অর্থাৎ কেন্দ্র ও রাজ্য উভয় স্তরেই বিজেপি ক্ষমতা। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর ভারতের অন্যতম রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল ইস্যু দ্রুত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। সেটি হলো ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত।

বহু বছর ধরে সীমান্ত নিরাপত্তা, অনুপ্রবেশ, অবৈধ অভিবাসন, চোরাচালান এবং সীমান্তে বেড়া নির্মাণ নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য ও বিতর্কের বিষয় ছিল। তবে এখন বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, তারা স্লোগান ও প্রতীকী পদক্ষেপের গণ্ডি পেরিয়ে সরাসরি প্রশাসনিক কার্যক্রমের পর্যায়ে প্রবেশ করতে চায়।

খবরে প্রকাশ, ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন—সীমান্ত-সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে প্রতীকী ঘোষণা নয়, বরং বাস্তবসম্মত ও ফলাফলমুখী পদ্ধতিতে মোকাবিলা করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, অমিত শাহ বারবার জোর দিয়ে বলেছেন—শুধু প্রচারের উদ্দেশ্যে কোনো ‘অর্ধসমাপ্ত’ অভিযান পরিচালনা করা যাবে না। তাঁর মতে, প্রতিটি পদক্ষেপ এমন হতে হবে যা আইনি দিক থেকে টেকসই, কূটনৈতিকভাবে সতর্ক এবং কার্যকরভাবে বাস্তবায়নযোগ্য।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এবং সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর (বিএসএফ) শীর্ষ কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে তথাকথিত অনুপ্রবেশ মোকাবিলায় একটি বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত করেছেন। এখন মূল গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে প্রকৃত অনুপ্রবেশকারীদের সতর্কতার সঙ্গে শনাক্ত করার ওপর, যাতে এলোমেলো বা তড়িঘড়ি করে কাউকে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেওয়ার (পুশব্যাক) মতো পদক্ষেপ নেওয়া না হয়।

সূত্রগুলোর মতে, অমিত শাহ কর্মকর্তাদের এমন কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, যা অপ্রয়োজনীয়ভাবে ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষতি করতে পারে। অতীতে যখন যথাযথ যাচাই-বাছাই বা বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়াই কথিত অনুপ্রবেশকারীদের সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দেওয়া হতো, তখন ঢাকা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। এর ফলে অপ্রয়োজনীয় কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল।

এবার কৌশলটি ভিন্ন বলে মনে হচ্ছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এমন এক প্রক্রিয়া চালু করতে চায়, যেখানে অনুপ্রবেশকারীদের যথাযথভাবে শনাক্ত করা হবে, তাদের নথিভুক্ত করা হবে এবং এরপর সরকারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এর লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক বিতর্ক এড়িয়ে একটি সুশৃঙ্খল উপায়ে সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করা।

এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান পদ্ধতির ভিত্তি হলো এই উপলব্ধি যে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা শুধু আইন-শৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি একই সঙ্গে মানবিক, ভূরাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন হোল্ডিং সেন্টারে আটক ৪০০ জন, চলছে বাংলাদেশে পাঠানোর প্রচেষ্টাপশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন হোল্ডিং সেন্টারে আটক ৪০০ জন, চলছে বাংলাদেশে পাঠানোর প্রচেষ্টা
বিশ্বব্যাপীও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ রাজনৈতিক বক্তৃতায় যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তা অনেক বেশি জটিল। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে মেক্সিকো সীমান্ত পুরোপুরি সিল করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বারবার দিয়েছিলেন। কিন্তু কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসন বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ ও ছিদ্রযুক্ত আন্তর্জাতিক সীমান্ত পুরোপুরি নিরাপদ করা কতটা কঠিন, তা বোঝাতে এখন সেই উদাহরণ অভ্যন্তরীণ আলোচনায় প্রায়ই উল্লেখ করা হচ্ছে।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ অংশে, পরিস্থিতি আরও জটিল। সীমান্তের বড় অংশ ঘনবসতিপূর্ণ গ্রাম, কৃষিজমি, নদীবেষ্টিত এলাকা, চরাঞ্চল, বনভূমি এবং ভৌগোলিকভাবে কঠিন অঞ্চলে বিস্তৃত। অনেক স্থানে তথাকথিত ‘জিরো লাইন’ বা প্রকৃত আন্তর্জাতিক সীমারেখা এমন বসতিপূর্ণ এলাকা দিয়ে গেছে, যেখানে পরিবারগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করে আসছে।

ভারত সরকার এখন পশ্চিমবঙ্গজুড়ে সীমান্তে বেড়া নির্মাণ প্রকল্পের গতি বাড়িয়েছে। যেসব জমি বেড়া নির্মাণ ও বিএসএফের অবকাঠামো তৈরির জন্য প্রয়োজন, সেসব জমির মালিকদের জন্য ক্ষতিপূরণ প্যাকেজও প্রস্তুত করা হচ্ছে। তবে কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন, পুরো সীমান্তজুড়ে বেড়া নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করা সহজ নয়।

সরকার মনে করছে, শুধু শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া সফল হবে না। স্থানীয় জনগণকে আস্থায় নিতে হবে এবং তাদের সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে। সীমান্তবর্তী এলাকার কৃষক, গ্রামবাসী এবং জমির মালিকদের সঙ্গে সতর্কতার সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। কারণ, বেড়া নির্মাণ প্রায়ই তাদের কৃষিকাজ, চলাচল এবং জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলে।

গত মে পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তের দৈর্ঘ্য ২ হাজার ২১৬ দশমিক ৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৬৪৭ দশমিক ৬৯৬ কিলোমিটার সীমান্তে ইতিমধ্যে বেড়া নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। প্রায় ৫৬৯ কিলোমিটার সীমান্ত এখনো বেড়াহীন। প্রায় ১১২ দশমিক ৭৮০ কিলোমিটার এলাকা নদীবেষ্টিত ও জলাভূমিপূর্ণ হওয়ায় প্রচলিত পদ্ধতিতে বেড়া নির্মাণ ‘অকার্যকর’ বা বাস্তবসম্মত নয় বলে বিবেচিত। প্রায় ৪৫৬ দশমিক ২২৪ কিলোমিটার এলাকা প্রযুক্তিগতভাবে বেড়া নির্মাণের উপযোগী হলেও কাজ এখনো সম্পূর্ণ হয়নি।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নির্বাচনী জয়ের পর নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সীমান্তে বেড়া নির্মাণকে নতুন সরকারের অন্যতম শীর্ষ প্রশাসনিক অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বলে জানা গেছে। সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় অগ্রগতি হলো সীমান্তে বেড়া ও অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের জন্য বিএসএফকে প্রায় ৬০০ একর জমি হস্তান্তরের অনুমোদন। শিলিগুড়ির কাছে ফাঁসিদেওয়ায় রাজ্য সরকার ইতিমধ্যে ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি অংশ বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করেছে। সেখানে ২১ থেকে ২২ মে-র মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে বেড়া নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে।

রাজ্যের মুখ্যসচিব এবং ভূমি দপ্তরকে অবশিষ্ট সব জমি হস্তান্তরের কাজ ৪৫ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে। বেড়া নির্মাণের পাশাপাশি নতুন সীমান্ত চৌকি (বিওপি) এবং বিএসএফের অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের জন্যও জমি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে রাজ্য সরকার।

এটিকে বড় নীতিগত পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ অতীতে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি ছিল জমি অধিগ্রহণ এবং প্রশাসনিক বিলম্ব। কলকাতা হাইকোর্ট অতীতে একাধিকবার তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) সরকারের সমালোচনা করেছে। কারণ, অধিগ্রহণ করা জমি বিএসএফের কাছে হস্তান্তরে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিয়েছিল। ২০২৬ সালের ২৭ জানুয়ারি হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছিল যে, অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ সম্পন্ন হওয়া ১২৭ কিলোমিটার জমি ৩১ মার্চের মধ্যে বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। কিন্তু ২২ এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র ৮ কিলোমিটার জমি হস্তান্তর করা হয়েছিল বলে জানা যায়। আদালত নির্দেশ অমান্যের অভিযোগে এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানাও আরোপ করেছিল।

২০২৫ সালের আগস্টে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী—৭৭ দশমিক ৯৩৫ কিলোমিটার জমি সীমান্ত বেড়া নির্মাণের জন্য হস্তান্তর করা হয়েছিল। ১৪৮ দশমিক ৯৭১ কিলোমিটার এলাকায় জমি অধিগ্রহণের কাজই শুরু হয়নি। ২২৯ দশমিক ৩১৮ কিলোমিটার এলাকা এখনো প্রক্রিয়াধীন ছিল এবং ১৮১ দশমিক ৬৩৫ কিলোমিটারের জন্য ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করা হলেও জমির দখল হস্তান্তর করা হয়নি।

এখন নতুন প্রশাসনের অধীনে সরকার দাবি করছে, অবশেষে পুরো প্রক্রিয়া গতি পেয়েছে। ফাঁসিদেওয়ার মতো বিভিন্ন সীমান্ত এলাকার মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অনেক বাসিন্দা স্বস্তি অনুভব করছেন। কয়েকজন গ্রামবাসী জানিয়েছেন, বছরের পর বছর তারা সীমান্তপারের অপরাধ, গবাদিপশু চোরাচালান চক্র এবং অবৈধ অনুপ্রবেশের আতঙ্কে বসবাস করেছেন। কিছু বাসিন্দা এমনও দাবি করেছেন যে, সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় সক্রিয় সংঘবদ্ধ অপরাধী গোষ্ঠীর কারণে তারা নিরাপদে গবাদিপশু পালন পর্যন্ত করতে পারতেন না।

বিজেপি সরকার এখন কর্মকর্তাদের ভাষায় ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ (শনাক্ত, তালিকা থেকে বাদ এবং বহিষ্কার) কাঠামো গ্রহণ করেছে। এই ব্যবস্থার আওতায় সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করতে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে সরাসরি বিএসএফের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার কথা বলা হয়েছে। বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে মালদা, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর ২৪ পরগনার মতো সংবেদনশীল জেলাগুলোর ওপর। দীর্ঘদিন ধরেই সীমান্তের ছিদ্রযুক্ত অংশগুলোর কারণে এসব এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

তবে এত জোরালো উদ্যোগের পরও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। গোয়েন্দা ব্যুরোর (আইবি) সাবেক কর্মকর্তারা এবং নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা ইতিমধ্যেই সতর্ক করে বলেছেন, স্বল্প সময়ের মধ্যে পুরো সীমান্তে বেড়া নির্মাণ সম্পন্ন করা বাস্তবসম্মত নয়। আইনি বিরোধ, পুনর্বাসন সংক্রান্ত জটিলতা, জমির ক্ষতিপূরণ, পরিবেশগত সমস্যা এবং দুর্গম ভূপ্রকৃতি পুরো প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত ধীর করে তুলেছে।

সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো ১৯৭৫ সালের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত চুক্তির আওতায় থাকা ‘১৫০-ইয়ার্ড বিধান।’ এই সমঝোতা অনুযায়ী, দুই দেশের সম্মতি ছাড়া সাধারণত শূন্যরেখা (জিরো লাইন) থেকে ১৫০ গজের মধ্যে কোনো স্থায়ী প্রতিরক্ষা স্থাপনা নির্মাণ করা যায় না।

ভারত সীমান্ত বেড়াকে সামরিক প্রতিরক্ষা স্থাপনা হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে না। কিন্তু আন্তর্জাতিক সীমান্তের খুব কাছাকাছি বেড়া নির্মাণের বিষয়ে বাংলাদেশ প্রায়ই আপত্তি জানিয়ে এসেছে। ফলে সাধারণত ভারতের ভেতরে, সীমান্তরেখা থেকে প্রায় ১৫০ গজ দূরে বেড়া নির্মাণ করা হয়।

এর ফলে এমন একটি এলাকা সৃষ্টি হয়, যাকে অনেক গ্রামবাসী ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ হিসেবে বর্ণনা করেন। বিভিন্ন সীমান্ত জেলায় প্রকৃত আন্তর্জাতিক সীমান্ত ও বেড়ার মাঝামাঝি অংশে গ্রাম, স্কুল, মন্দির, কৃষিজমি এবং বাজার রয়েছে। এর ফলে বহু ভারতীয় নাগরিক কার্যত বেড়ার বাইরে বসবাস করেন, যদিও তারা ভারতের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই রয়েছেন।

এতে ব্যাপক নিরাপত্তা ও মানবিক সমস্যা সৃষ্টি হয়। বেড়ার বাইরে বসবাসকারী মানুষ প্রায়ই চোরাচালান চক্র, অনুপ্রবেশ, চাঁদাবাজি এবং আন্তসীমান্ত অপরাধের ঝুঁকিতে থাকেন। কৃষকেরা নিজেদের জমিতে যাতায়াতেও নানা বিধিনিষেধের মুখে পড়েন, কারণ বিএসএফের নিয়ম অনুযায়ী চলাচলের সময়সীমা প্রায়ই সীমিত থাকে।

ফলে অনেক গ্রামবাসী দাবি জানিয়েছেন, সীমান্ত বেড়া হয় সরাসরি জিরো লাইনে নির্মাণ করতে হবে, অথবা অন্তত তার আরও কাছাকাছি স্থাপন করতে হবে। তবে বাংলাদেশ বহু সীমান্ত খাতে এখনো আপত্তি জানিয়ে আসছে। তাদের দাবি, এ ধরনের নির্মাণকাজ পূর্ববর্তী সীমান্ত-সমঝোতার লঙ্ঘন।

সাম্প্রতিক দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) প্রায় ৯০টি বিতর্কিত স্থানে নতুন করে যৌথ পরিদর্শনের দাবি জানিয়েছে বলে জানা গেছে। এসব স্থানে ভারত সীমান্তের আরও কাছাকাছি বেড়া নির্মাণ করতে চায়।

একই সময়ে দুর্গম ভূপ্রকৃতিও কাজকে জটিল করে তুলছে। প্রায় ১৭৫ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা নদীবেষ্টিত বা জলাভূমিপূর্ণ। ইছামতী ও পদ্মার মতো নদীগুলোতে চরভূমির অবস্থান ক্রমাগত পরিবর্তিত হয় এবং মাটির স্থিতিশীলতা কম থাকে। ফলে সেখানে প্রচলিত পদ্ধতিতে সীমান্ত বেড়া নির্মাণ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভারত ক্রমবর্ধমানভাবে ‘স্মার্ট ফেন্সিং’ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্যামেরা, থার্মাল সেন্সর, লেজার সিস্টেম, ড্রোন এবং রাডারভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ভৌত অবকাঠামোভিত্তিক বেড়া এবং ইলেকট্রনিক নজরদারির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই হাইব্রিড মডেল ভবিষ্যতে পূর্ব ভারতের সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

তবে কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন, প্রযুক্তি একাই এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত নিরাপত্তা রাজনীতি, কূটনীতি, অর্থনীতি, অভিবাসন, জনসংখ্যাগত পরিবর্তন এবং স্থানীয় সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সে কারণেই কেন্দ্রীয় সরকার এখন কেবল আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে আরও পরিকল্পিত, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য একটি কৌশল গ্রহণ করছে বলে মনে হচ্ছে।

তবু রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিজেপি বর্তমান সময়কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে। দলটির বিশ্বাস, যদি ‘ডাবল-ইঞ্জিন সরকার’ দৃশ্যমানভাবে সীমান্ত নিরাপত্তার উন্নতি করতে পারে, অনুপ্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং বহুদিন ধরে ঝুলে থাকা সীমান্ত বেড়া নির্মাণ প্রকল্পগুলো সম্পন্ন করতে পারে, তাহলে তা আগামী বহু বছর পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির রাজনৈতিক অবস্থানকে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করতে পারে।

২০২৬ সালের মে মাসের শেষ দিক পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ বিলম্বের পর অবশেষে সীমান্ত বেড়া নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। তবে এখনো প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার সীমান্তে বেড়া নির্মাণ বাকি রয়েছে এবং একাধিক আইনি ও ভৌগোলিক জটিলতার সমাধান হয়নি। ফলে সরকারি সূত্রের অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে স্বীকার করছেন, পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সময়সীমার তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগবে। অনুবাদ: আজকের পত্রিকা।

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়