শিরোনাম
◈ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ থেকে ‘সাদা মহিষ’, নাম ও বানান বিতর্কে পদ হারালেন জাতীয় চিড়িয়াখানার কিউরেটর ◈ যশোরের রাজারহাটে চামড়ার দাম নিয়ে হতাশা, আবারও বাজার ধসের শঙ্কা ◈ বাংলাদেশসহ বিশ্বের আকাশে আজ রাতে দেখা মিলতে পারে বিরল ‘ব্লু মুন' ◈ ১০ মিটারের মধ্যে এলেই 'নীরব মৃত্যু' : ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ বাহিনীকে কোণঠাসা করছে ঘাতক রোবট ◈ শেখ হাসিনা পদত্যাগপত্র লিখেছিলেন কিন্তু তিনি জমা দিয়ে যেতে পারেন নাই, ভ্যানিটি ব্যাগে করে নিয়ে গেছেন: মতিউর রহমান চৌধুরী ◈ চাকরি, স্বাস্থ্যসেবা ও আবাসন থেকে বঞ্চিত করে যেভাবে অভিবাসীদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছেন ট্রাম্প ◈ নতুন জীবনের খোঁজে দেশ ছাড়ছেন আমেরিকানরা, পরামর্শ নিতে খরচ করছেন শত শত ডলার ◈ বাংলাদেশ সীমান্ত নিয়ে অমিত শাহর ‘ব্লুপ্রিন্ট’, কী আছে পরিকল্পনায়? ◈ রোবটের শক্তিতে পাল্টে যাচ্ছে ইউক্রেন যুদ্ধ, রাশিয়া পড়েছে রক্ষণাত্মক অবস্থানে (ভিডিও) ◈ নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার: ডিএনএ পরীক্ষায় স্তন ক্যানসারের অনেক রোগীর আর লাগবে না কেমোথেরাপি

প্রকাশিত : ৩১ মে, ২০২৬, ০১:০৩ দুপুর
আপডেট : ৩১ মে, ২০২৬, ১০:০০ রাত

প্রতিবেদক : আর রিয়াজ

রোবটের শক্তিতে পাল্টে যাচ্ছে ইউক্রেন যুদ্ধ, রাশিয়া পড়েছে রক্ষণাত্মক অবস্থানে (ভিডিও)

সিএনএনের প্রতিবেদন: ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার সেনাদের অবস্থান লক্ষ্য করে একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটছে। তবে এসব অভিযানে মাটিতে কোনো ইউক্রেনীয় সেনা নেই। যুদ্ধ পরিচালিত হচ্ছে ভূগর্ভস্থ নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে, চেয়ারে বসে। আকাশে থাকা নজরদারি ড্রোনের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, আর হামলা চালাচ্ছে বিস্ফোরকবোঝাই মানববিহীন রোবট।

চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা রুশ আগ্রাসনের মধ্যে জনবল-সংকটে পড়া ইউক্রেন এখন দ্রুতগতিতে যুদ্ধের ধরন বদলে ফেলেছে। রোবট, ড্রোন ও দূরনিয়ন্ত্রিত সাঁজোয়া যানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নতুন যুদ্ধব্যবস্থা। ইউক্রেনের দাবি, এসব প্রযুক্তি তাদের শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সুবিধাই এনে দেয়নি, হাজারো সেনার প্রাণ বাঁচিয়েছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি গত এপ্রিলে দাবি করেন, প্রথমবারের মতো শুধু রোবট ও ড্রোন ব্যবহার করে একটি রুশ অবস্থান দখল করা হয়েছে। তিনি জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মানববিহীন যন্ত্রের মাধ্যমে ২২ হাজার অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

‘নীরব মৃত্যু’ নামে পরিচিত রোবট

ইউক্রেনীয় বাহিনীর একটি ইউনিটের সদস্যরা জানান, রুশ যুদ্ধবন্দীদের কাছ থেকে তাঁরা জেনেছেন, বিস্ফোরকবোঝাই চার চাকার রোবটগুলোকে রুশ সেনারা ‘সাইলেন্ট ডেথ’ বা ‘নীরব মৃত্যু’ নামে ডাকে। কারণ, এসব রোবটের উপস্থিতি টের পাওয়া যায় মাত্র ১০ মিটার দূরত্বে আসার পর।

সম্প্রতি এমন এক অভিযানে ছয়টি রোবট পাঠানো হয় পূর্ব ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর তিনটি ফ্রন্ট লাইন লক্ষ্যবস্তুর দিকে। প্রথম রোবটটি ধ্বংসাবশেষে আটকে গেলেও পরে এগিয়ে যায় এবং বিস্ফোরণ ঘটায়। পরপর দ্বিতীয় বিস্ফোরণও সংঘটিত হয়। এরপর আরও চারটি রোবটকে রুশ অবস্থানের পেছনের দিকে পৌঁছানোর সুযোগ করে দেওয়া হয়।

ইউক্রেনের থার্ড অ্যাসল্ট ব্রিগেডের ‘এনসি ১৩’ ইউনিটের হিসাব অনুযায়ী, এ ধরনের ১৬৪টি অভিযানে একই ফল পেতে হলে প্রায় ২ হাজার ৩০০ সেনার প্রয়োজন হতো। সে ক্ষেত্রে ইউনিটটির অর্ধেক সদস্য নিহত বা আহত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। ইউনিটটির মতে, রোবট ব্যবহারের ফলে প্রায় ১ হাজার ইউক্রেনীয় সেনার জীবন রক্ষা পেয়েছে।

ইউনিটটির উপকমান্ডার বার বলেন, অতীতে দনবাসে যুদ্ধ করার সময় তিনি এমন প্রযুক্তির কথা কল্পনাও করতে পারেননি। তাঁর ভাষায়, যদি তখন এসব ব্যবস্থা থাকত, তবে আরও অনেক সহযোদ্ধা বেঁচে ফিরতে পারতেন।

তবে ইউনিটের কমান্ডার মাইকোলা ‘মাকার’ জিঙ্কেভিচ মনে করেন, যুদ্ধের চরিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। তিনি বলেন, ‘আগে যুদ্ধ অনেক বেশি ব্যক্তিগত দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও শৃঙ্খলার ওপর নির্ভর করত। এখন প্রযুক্তিই সবকিছু নির্ধারণ করছে। তাঁর মতে, এই পরিবর্তন থেকে আর ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই।’

জনবল-সংকট থেকে প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ

ইউক্রেনের এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে তীব্র জনবল-সংকট। চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে দেশটির তুলনামূলক ছোট জনসংখ্যার ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এই বাস্তবতায় ইউক্রেন এখন ড্রোন ও রোবটনির্ভর যুদ্ধকে কৌশলগত অগ্রাধিকার দিয়েছে। দেশটির নীতিনির্ধারকেরা প্রতি মাসে প্রায় ৩৫ হাজার রুশ সেনাকে হত্যা বা আহত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। ইউক্রেনের দাবি, চলতি বছর তারা সেই লক্ষ্য পূরণ করেছে।

কিয়েভের আশা, এতে রাশিয়াকে বড় শহর ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে আরও বেশি সেনা সংগ্রহে বাধ্য হতে হবে, যা রাজনৈতিকভাবে ক্রেমলিনের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে। গত বুধবার প্রকাশিত ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা জিসিএইচকিউর একটি মূল্যায়নে বলা হয়, নতুন তথ্যের ভিত্তিতে রাশিয়ার মোট নিহত সেনার সংখ্যা ৫ লাখে পৌঁছেছে।

নতুন যুদ্ধের নতুন নায়ক

এই প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধে নতুন ধরনের কর্মীরও উত্থান ঘটেছে। তাঁদের একজন ২২ বছর বয়সী গোরা। তিনি নিজেকে শুধু সফটওয়্যার প্রকৌশলী বলতে রাজি নন। তাঁর পরিচয়, তিনি একজন এমবেডেড হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার প্রকৌশলী। যুদ্ধ শুরুর সময় তাঁর বয়স ছিল ১৮ বছর। পূর্ব কিয়েভে রুশ ড্রোন হামলার কারণে রাতের পর রাত ঘুমাতে না পেরে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, তথ্যপ্রযুক্তি দক্ষতাকেই যুদ্ধের অংশ হিসেবে ব্যবহার করবেন।

গোরার মতে, মূল বিষয় রোবট নয়, বরং সেগুলো পরিচালনাকারী মানুষের পরিকল্পনা। যানবাহন, অপারেটর ও যোগাযোগব্যবস্থাকে কার্যকরভাবে যুক্ত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জও বাড়ছে। একপর্যায়ে একটি ‘সালামান্ডার ৬’ রোবটের জিপিএস সংকেত বিভ্রান্ত করে দেওয়া হয়। ফলে অপারেটরদের আনুমানিক পথ নির্ধারণ করে জিপিএস ছাড়াই সেটিকে পরিচালনা করতে হয়।

যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান-সংক্রান্ত তথ্যের নিয়ন্ত্রণ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে দিনের বেলায় ধারণ করা ড্রোনচিত্র এবং দীর্ঘ সময়ের গবেষণার ভিত্তিতে রোবটের চলার পথ নির্ধারণ করা হয়।

মেশিনগানবাহী রোবটের ব্যবহার

ইউক্রেনীয় বাহিনী এখন শুধু বিস্ফোরকবাহী নয়, অস্ত্রবাহী রোবটও ব্যবহার করছে। সিবার নামের এক সেনাসদস্যের দল একটি ট্রাকচালিত রোবটের ওপর ব্রাউনিং ভারী মেশিনগান স্থাপন করছে। একাধিক ক্যামেরা-সংবলিত যানটি দিনের পর দিন ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে থাকতে পারে। এর খাবার, পানি বা বিশ্রামের প্রয়োজন হয় না।

সিবার জানান, কেবল গোলাবারুদই এর একমাত্র সীমাবদ্ধতা। ৪০০ গুলি শেষ হলে এটিকে ঘাঁটিতে ফিরে আসতে হয়। তাঁর দাবি, ‘প্রথমবার এ ধরনের রোবট ব্যবহারের সময় রুশ সেনারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল এবং কী করতে হবে বুঝতে পারেনি।’

সিবারের ইউনিটের কাছে বর্তমানে এমন পাঁচটি রোবট রয়েছে। পাশাপাশি ঘণ্টায় প্রায় ১০ মাইল গতিতে চলতে সক্ষম নতুন একটি রোবটও প্রস্তুত করা হচ্ছে, যা কালাশনিকভ রাইফেল বহন করে যুদ্ধ করতে পারবে।

রসদও পৌঁছাচ্ছে রোবট

কয়েক মাসের মধ্যেই যুদ্ধক্ষেত্রে মানববিহীন যানবাহন বিরল প্রযুক্তি থেকে নিয়মিত সরঞ্জামে পরিণত হয়েছে। আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার, গোলাবারুদ সরবরাহ এবং খাদ্য পৌঁছে দেওয়ার কাজও এখন রোবটের মাধ্যমে করা হচ্ছে। তবে রুশ ড্রোন হামলার কারণে এসব রোবটেও রসদ তোলা ঝুঁকিপূর্ণ।

ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর ৯৩তম ব্রিগেডের সদস্যরা দ্রুঝিভকা শহরের বিভিন্ন স্থানে দ্রুত ছুটে গিয়ে গাছের নিচে লুকিয়ে থাকা রোবট সরবরাহ ইউনিটগুলোর কাছে খাদ্য, পানি ও গোলাবারুদ পৌঁছে দেন। শহরটিতে এখনো বেসামরিক মানুষ বাস করলেও রুশ ড্রোনের নির্ভুলতা এত বেশি যে ইউক্রেনীয় সেনারা আর সাধারণ মানুষের ভিড়ে নিজেদের আড়াল করতে পারেন না।

একটি খামারবাড়িতে পাঁচ বাক্স গোলাবারুদ একটি রোবটের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়। পরে দূরের একটি বাঙ্কার থেকে একজন অপারেটর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেটিকে সামনের সারির উদ্দেশে পাঠান। সরু কাদাময় পথ ধরে যাত্রা শুরু করা রোবটটির গন্তব্যে পৌঁছাতে প্রায় ১০ ঘণ্টা সময় লাগে।

প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার সত্ত্বেও ইউক্রেনের জনবল-সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠছে রণক্ষেত্রে। ২৪তম মেকানাইজড ব্রিগেডের দুই সেনা, যাঁদের ডাকনাম ক্রো ও ক্রিপি, যথাক্রমে ৩৪৪ ও ৩৩৪ দিন ধরে ফ্রন্ট লাইনে দায়িত্ব পালন করেছেন। ক্রো জানান, তাঁর দায়িত্ব শেষ হয়েছে সেদিন ভোরে। নিরাপদ এলাকায় পৌঁছাতে তাঁকে ১২ ঘণ্টা ধরে প্রায় ২০ মাইল হাঁটতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সন্তান ও স্ত্রীই তাঁকে মানসিকভাবে টিকিয়ে রেখেছে।’ তা না হলে অনেক আগেই তিনি ভেঙে পড়তেন।

তাঁর ৯ বছর বয়সী ছেলের জন্মদিনের এক দিন পরে তিনি বাড়ি ফিরবেন। তবে অবস্থানে যাওয়ার পর থেকে তিনি স্ত্রীর সঙ্গে একবারও সরাসরি কথা বলতে পারেননি। রেডিওর মাধ্যমে রেকর্ড করা বার্তাই ছিল যোগাযোগের একমাত্র উপায়।

অন্যদিকে ক্রিপি জানান, ড্রোন হামলা এতটা ঘন ঘন ছিল যে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নির্মাণের কাজ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। তিনি বলেন, মাটিভর্তি বস্তা তৈরি ও সাজিয়ে রাখার কাজের সঙ্গে তাঁরা তাল মেলাতে পারছিলেন না। একসময় বস্তাও ফুরিয়ে যায়। নিজেদের রক্ষার জন্য তখন হাতের কাছে যা পেয়েছেন, তাই ব্যবহার করতে হয়েছে।

প্রায় এক বছর পর প্রথমবারের মতো কোমল পানীয় পান করতে করতে এবং পরিষ্কার পোশাকের কথা বলতে বলতে দুই সেনা কিছুটা স্বস্তি খুঁজছিলেন। কিন্তু সেই মুহূর্তেও যুদ্ধ তাদের পিছু ছাড়েনি। ক্রামাতোরস্ক শহরের আকাশে একটি ফার্স্ট পার্সন ভিউ (এফপিভি) ড্রোনের শব্দ শোনা মাত্র স্থানীয় বাসিন্দারা ছুটে আশ্রয় খুঁজতে শুরু করেন। আর ইউক্রেন যুদ্ধের বর্তমান বাস্তবতায় ড্রোন, রোবট ও অন্যান্য মানববিহীন যন্ত্র এখন সর্বত্র। আর এসব প্রযুক্তি ক্রমেই যুদ্ধের চরিত্র ও ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে।

অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকা

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়