আল জাজিরা’র বিশেষ প্রতিবেদন: ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি (ভারতীয় জনতা পার্টি) জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর রাজ্যটির রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। মে মাসের শুরুর দিকে ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই নতুন সরকারের কড়া আইনি কড়াকড়ি এবং উগ্র রাজনৈতিক তৎপরতার কারণে আসন্ন ঈদুল আজহার (কোরবানির ঈদ) প্রস্তুতিতে বড় ধাক্কা লেগেছে।
ঐতিহ্যবাহী গরুর হাটগুলো এখন প্রায় জনশূন্য, আর পুরো রাজ্যজুড়ে মুসলিম ব্যবসায়ী, খামারি এবং সাধারণ মানুষের মাঝে বিরাজ করছে চরম আতঙ্ক। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘আল জাজিরা’র এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।
আইনের কড়াকড়ি ও ‘বার্থ সার্টিফিকেট’ বিতর্ক: প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে ১৯৫০ সালের একটি পুরনো আইনকে কঠোরভাবে কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছে নতুন বিজেপি সরকার। এই নির্দেশিকা অনুযায়ী, ১৪ বছরের কম বয়সী কোনো গবাদিপশু জবাই করা যাবে না এবং পশু পরিবহনের জন্য স্থানীয় প্রশাসন বা রাজ্য প্রাণিসম্পদ বিভাগের লিখিত পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এই নিয়ম কার্যকর করতে গিয়ে রাজ্যটির বিভিন্ন স্থানে অদ্ভুত ও চরমপন্থী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনার হিঙ্গলগঞ্জের মতো সীমান্ত এলাকায় বিজেপি বিধায়কদের নেতৃত্বে পশুবাহী গাড়ি থামিয়ে গরুর বয়স প্রমাণ করার নথিপত্র বা অদ্ভুতভাবে গরুর ‘বার্থ সার্টিফিকেট’ (জন্মনিবন্ধন সনদ) দাবি করা হচ্ছে। সঠিক নথিপত্র দেখাতে না পারলে পশুগুলোকে আটকে দেওয়া হচ্ছে। ফলে রাজ্যজুড়ে গবাদিপশু পরিবহন ও ব্যবসা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
ধুঁকছে ব্যবসা, মাথায় হাত ব্যবসায়ী ও খামারিদের: হঠাৎ এই নিষেধাজ্ঞার কারণে পশ্চিমবঙ্গের পশুর হাটগুলো এখন ক্রেতা-বিক্রেতাহীন খাঁ খাঁ করছে। কলকাতার বিখ্যাত নাখোদা মসজিদের ইমাম মাওলানা মোহাম্মদ শফিক কাসমি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, এই আইনের কারণে পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন ঈদুল আজহায় কোরবানি দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে এবং সাধারণ সময়েও মাংসের জোগান বজায় রাখা অসম্ভব হবে।
ব্যবসায়িক মন্দার প্রভাব পড়েছে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁ ও মাংসের দোকানগুলোতেও। বহু মুসলিম মাংস ব্যবসায়ী গত ৬০ বছর ধরে লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করলেও এখন আতঙ্কে দোকান বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। বাজারে গরুর মাংসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় এবং তীব্র আতঙ্কের কারণে জীবিত গরুর দাম কেজিপ্রতি ৪০০ রুপি (প্রায় ৫ ডলার) থেকে নেমে মাত্র ১৫০ রুপিতে (১.৭০ ডলার) এসে ঠেকেছে। এর ফলে শুধু মুসলিম ব্যবসায়ীরাই নন, বরং বিপুল সংখ্যক হিন্দু খামারি ও ব্যবসায়ীও চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন, যাদের আয়ের মূল মৌসুমই ছিল এই কোরবানি ঈদ।
মানবাধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্ন: বিশ্লেষক ও অধিকারকর্মীদের মতে, বুলডোজার সংস্কৃতির মাধ্যমে মুসলিম প্রধান এলাকার স্থাপনা উচ্ছেদ এবং ঈদের ঠিক আগে গরুর মাংস ও হাটের ওপর এই কঠোর নিষেধাজ্ঞা মূলত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকার খর্ব করার রাজনৈতিক হাতিয়ার। এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ঐতিহ্যবাহী অর্থনৈতিক কাঠামোকে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।