শিরোনাম
◈ মধ্যপ্রাচ্য সংকটে এশিয়ার নজর ব্রাজিলের তেলের দিকে ◈ পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ক্ষমতায় আসতেই মেনু থেকে উধাও গরুর মাংস, আতঙ্কে খামারি-রেস্তোরাঁ মালিকরা ◈ মিনহাজুল আ‌বে‌দিন নান্নু বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিসিবির পরিচালক  ◈ হাম-উপসর্গে দেশে ২৪ ঘণ্টায় ১৭ শিশুর মৃত্যু ◈ আগামী ৫ বছরে বাংলাদেশে ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে এডিবি ◈ কিচেন কেবিনেট’ সব সিদ্ধান্ত নিতো, ৩ বার পদত্যাগ করতে চেয়েছিলাম: সাবেক উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন (ভিডিও) ◈ ‘ভারত যা চাইবে তাই পাবে’: মোদিকে নিয়ে ট্রাম্পের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা ◈ কারখানা প্রস্তুত, নেই গ্যাস: ঋণের চাপে দিশেহারা শিল্প উদ্যোক্তারা, থমকে গেছে হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ◈ পুঁজিবাজারে নতুন বড় কোম্পানি: বিআরবি ক্যাবলের আইপিওর প্রস্তুতি শুরু ◈ বাংলাদেশে ধর্ষণ ও হত্যার আলোচিত ছয়টি মামলা কী অবস্থায় আছে? 

প্রকাশিত : ২৫ মে, ২০২৬, ০৯:৪৯ রাত
আপডেট : ২৫ মে, ২০২৬, ১০:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলে বাড়ছে ধনীদের সংখ্যা, নতুন সুযোগ দেখছে আমেরিকানরা

১৯৯৪ সালে গ্রেগ ফ্লিন যখন বিখ্যাত স্ট্যানফোর্ড বিজনেস স্কুল থেকে পড়াশোনা শেষ করেন, তখন আমেরিকায় ‘ডটকম’ বা ইন্টারনেট বিপ্লবের জয়জয়কার। তার সহপাঠীরা সবাই বড় বড় করপোরেট সংস্থায় যোগ দিয়ে রাতারাতি কাগজে-কলমে ‘মিলিয়নিয়ার’ বনে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ফ্লিন হাঁটলেন ভিন্ন পথে। এক বন্ধুর রেস্তোরাঁ ব্যবসায় সাহায্য করতে যোগ দিলেন তিনি। এর কয়েক বছর পর আমেরিকার ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থার দারুণ অর্থায়নের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ফ্লিন নিজেই আটটি ‘অ্যাপলবিস’ রেস্তোরাঁ কিনে নেন।

আজ ২৬ বছর পর গ্রেগ ফ্লিন কোনো সাধারণ ব্যবসায়ী নন। তিনটি দেশে সাতটি বড় ব্র্যান্ডের তিন হাজারেরও বেশি ফ্র্যাঞ্চাইজি আউটলেট পরিচালনা করছেন তিনি। তার বর্তমান সম্পদের পরিমাণ ১০০ কোটি ডলার (এক বিলিয়ন) ছাড়িয়েছে। ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবসা করে ইতিহাসে তিনিই প্রথম ‘বিলিয়নিয়ার’ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। গত ২২ ফেব্রুয়ারি ইন্টারন্যাশনাল ফ্র্যাঞ্চাইজি অ্যাসোসিয়েশন (আইএফএ) তাকে তাদের ‘হল অব ফেম’-এ অন্তর্ভুক্ত করেছে, যে সম্মান আগে কেবল ম্যাকডোনাল্ডসের রেফ ক্রক বা কেএফসির কর্নেল স্যান্ডার্সের মতো বড় ব্র্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতাদের জন্যই তোলা ছিল।

‘আমরা সবাই তো আর স্টিভ জবস বা ইলন মাস্ক হতে পারব না। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষও টাকা জমিয়ে একটি বার্গারের দোকান দেওয়ার স্বপ্ন দেখতেই পারেন।’

গ্রেগ ফ্লিনের এই গল্প আসলে আমেরিকার ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলের অভাবনীয় সাফল্যের এক জীবন্ত উদাহরণ। বর্তমানে এটিই হয়ে উঠেছে বহু সাধারণ মার্কিন নাগরিকের ধনী হওয়ার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম।

মার্কিন অর্থনীতির চালিকাশক্তি

১৯৫০-এর দশক থেকে আমেরিকায় ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলের বিস্তার শুরু হয়। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ৮ লাখ ৫০ হাজার ফ্র্যাঞ্চাইজি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা পরিচালনা করছেন প্রায় আড়াই লাখ মালিক। এই খাতে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৯০ লাখ মানুষের, যা আমেরিকার মোট জিডিপির প্রায় তিন শতাংশ। ডানকিন ডোনাটস, ইউপিএস স্টোর থেকে শুরু করে ম্যারিয়ট হোটেলের মতো বড় বড় নামগুলো মূলত এই ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলেই চলে।

আইএফএ’র প্রধান ম্যাট হ্যালার বলেন, ‘আমরা সবাই তো আর স্টিভ জবস বা ইলন মাস্ক হতে পারব না। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষও টাকা জমিয়ে একটি বার্গারের দোকান দেওয়ার স্বপ্ন দেখতেই পারেন।’ এই মডেলটি বিশেষ করে অভিবাসীদের দারুণভাবে টেনেছে। যেমন, আমেরিকার মোট মোটেলের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের মালিক ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাগরিকেরা, যারা ১৯৮০-এর দশকে ‘সুপার ৮’ এবং ‘ট্রাভেলজ’ ফ্র্যাঞ্চাইজি কিনে ব্যবসা শুরু করেছিলেন।

কেন তরুণদের পছন্দ ‘ইন-পারসন’ বিজনেস?

এক দশক আগেও আমেরিকার তরুণদের কাছে সমৃদ্ধির একমাত্র পথ ছিল দামি কলেজ থেকে ডিগ্রি নেওয়া এবং একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে ‘ল্যাপটপ জব’ বা হোয়াইট কলার চাকরি করা। কিন্তু দিন বদলেছে। একদিকে আকাশছোঁয়া টিউশন ফি, অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দাপটে বহু ডেস্ক জব এখন ঝুঁকির মুখে।

ফলে আমেরিকার নতুন প্রজন্ম এখন কায়িক শ্রম বা সরাসরি গ্রাহকসেবামূলক (ইন-পারসন) ব্যবসার দিকে ঝুঁকছে। পিলাটিস (ব্যায়াম) শেখানো বা রেস্তোরাঁয় খাবার তৈরির মতো ব্যবসাগুলোকে তারা নিরাপদ মনে করছে। ম্যাট হ্যালার বলেন, ‘মানুষ ছাড়া চালানো যায়, এমন কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবসা পৃথিবীতে নেই। ফলে এআইর যুগেও এগুলো সুরক্ষিত।’

যেভাবে কাজ করে ফ্র্যাঞ্চাইজি

অর্থনীতিবিদদের কাছে ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলটি বেশ আকর্ষণীয়। এখানে মূল ব্র্যান্ড বা কোম্পানি মেন্যু, মান ও খোলার সময় নিয়ন্ত্রণ করে। বিনিময়ে তারা পায় একঝাঁক উদ্যমী ব্যবসায়ী, যারা নিজেদের পুঁজি খাটান। ফলে মূল কোম্পানির ব্র্যান্ড দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আর ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকেরা পান একটি প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডের নিরাপত্তা ও ব্যবসার নিশ্চয়তা।

তবে এই ব্যবসায় স্থানীয় অভিজ্ঞতার মূল্য অনেক। ১০০টিরও বেশি ট্যাকো বেল ও ডানকিন ডোনাটস আউটলেট চালানো দিনেশ গোস্বামী একে বলেন ‘স্ট্যাচু অব লিবার্টি’ সমস্যা। তিনি জানান, একবার ন্যাশভিলে তিনি একটি ‘পোপাইস’ রেস্তোরাঁ খোলেন, যা এক মাইল দূর থেকেও দেখা যেত। কিন্তু রাস্তা থেকে সেখানে যাওয়ার পথটি এত জটিল ছিল যে, কিছুদিনের মধ্যেই এর বিক্রি ৬০ শতাংশ কমে যায়।

ফ্লিনও তার ব্যবসা বড় করেছেন স্থানীয় ব্যবস্থাপকদের ওপর ভরসা করে। তিনি তার আঞ্চলিক ম্যানেজারদের লাভের অংশীদার করেন, যাকে তিনি বলেন ‘স্টেট অ্যান্ড ফেডারেল’ মডেল। হেড অফিস ফাইন্যান্স ও ট্রেনিং সামলায়, আর স্থানীয়রা সামলায় মাঠপর্যায়ের ব্যবসা।

কত টাকা লাগে, ঝুঁকি কেমন?

আমেরিকায় ফ্র্যাঞ্চাইজি খুলতে কেমন খরচ হবে, তা তাদের ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি ডিসক্লোজার ডকুমেন্ট’ (এফডিডি) দেখলেই জানা যায়। সাধারণত মূল কোম্পানিকে বিক্রির ৫ থেকে ১২ শতাংশ রয়্যালটি বা ফি দিতে হয়। একটি একক আউটলেট খোলার প্রাথমিক ফি সাধারণত ৫০ হাজার ডলার বা তার বেশি। সব মিলিয়ে একটি সাধারণ ফিটনেস স্টুডিও খুলতে তিন থেকে আট লাখ ডলার এবং একটি বড় রেস্তোরাঁ খুলতে ১০ লাখ ডলারের (প্রায় ১২ কোটি টাকা) বেশি খরচ হতে পারে।

বিশ্লেষকেরা জানান, বেশিরভাগ সফল ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকেরা ব্যাংক ঋণ এবং তাদের অবসরের জমানো তহবিল ভেঙে এই পুঁজি জোগাড় করেন।

মিশিগান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ফ্র্যান্সিন লা ফন্টেইন জানান, সাধারণ স্বাধীন ব্যবসার তুলনায় ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবসার টিকে থাকার হার প্রথম এক-দুই বছর একটু বেশি হলেও, দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির পরিমাণ প্রায় সমান। তবে ম্যাকডোনাল্ডস বা অ্যাপলবিসের মতো সুপরিচিত ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রে ঝুঁকির চেয়ে সফলতার হার অনেক বেশি থাকে, কারণ তাদের বিশাল মার্কেটিং বাজেট ও ব্র্যান্ড ভ্যালু রয়েছে।

বিতর্ক ও সমালোচনা

ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলের বিরুদ্ধে বড় সমালোচনা হলো—এখানে কর্মরত সাধারণ শ্রমিকদের কম মজুরি। সমালোচকদের মতে, ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকেরা মূল কোম্পানিকে রয়্যালটি দেওয়ার পর নিজেদের পকেটে লাভ তুলতে গিয়ে শ্রমিকদের মজুরি যথাসম্ভব কম রাখেন।

২০১৮ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, আগে একই চেইনের এক আউটলেটের কর্মী অন্য আউটলেটে বেশি বেতনে যোগ দিতে পারতেন না। পরবর্তীতে সরকারি হস্তক্ষেপে এই নিয়ম বাতিল হলে শ্রমিকদের মজুরি চার থেকে ছয় শতাংশ বাড়ে। তবে গ্রেগ ফ্লিনের মতো সফল উদ্যোক্তারা মনে করেন, ফ্র্যাঞ্চাইজি হলো সাধারণ মানুষের জন্য ‘সুযোগের এক অনন্য ইঞ্জিন’। মার্কিন রাজনীতিকদের উচিত এই মডেলে অযথা হস্তক্ষেপ না করে একে আপন গতিতে চলতে দেওয়া।

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়