শিরোনাম
◈ মধ্যপ্রাচ্য সংকটে এশিয়ার নজর ব্রাজিলের তেলের দিকে ◈ পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ক্ষমতায় আসতেই মেনু থেকে উধাও গরুর মাংস, আতঙ্কে খামারি-রেস্তোরাঁ মালিকরা ◈ মিনহাজুল আ‌বে‌দিন নান্নু বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিসিবির পরিচালক  ◈ হাম-উপসর্গে দেশে ২৪ ঘণ্টায় ১৭ শিশুর মৃত্যু ◈ আগামী ৫ বছরে বাংলাদেশে ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে এডিবি ◈ কিচেন কেবিনেট’ সব সিদ্ধান্ত নিতো, ৩ বার পদত্যাগ করতে চেয়েছিলাম: সাবেক উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন (ভিডিও) ◈ ‘ভারত যা চাইবে তাই পাবে’: মোদিকে নিয়ে ট্রাম্পের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা ◈ কারখানা প্রস্তুত, নেই গ্যাস: ঋণের চাপে দিশেহারা শিল্প উদ্যোক্তারা, থমকে গেছে হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ◈ পুঁজিবাজারে নতুন বড় কোম্পানি: বিআরবি ক্যাবলের আইপিওর প্রস্তুতি শুরু ◈ বাংলাদেশে ধর্ষণ ও হত্যার আলোচিত ছয়টি মামলা কী অবস্থায় আছে? 

প্রকাশিত : ২৫ মে, ২০২৬, ০৯:০১ রাত
আপডেট : ২৫ মে, ২০২৬, ০৯:০১ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে এশিয়ার নজর ব্রাজিলের তেলের দিকে

ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে চলমান অস্থিরতার মধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন কৌশলগত শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে ব্রাজিল। বিশেষ করে চীন ও ভারত উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় ক্রমশ ব্রাজিলের অপরিশোধিত তেলের দিকে ঝুঁকছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সুবিধাভোগীদের মধ্যে এখন ব্রাজিল অন্যতম।

মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে বড় চাপের মুখে ফেলেছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার তেল সরবরাহও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে এশিয়ার বড় অর্থনীতিগুলো বিকল্প ও তুলনামূলক নিরাপদ উৎসের সন্ধানে নেমেছে।

এই পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যতম বড় তেল রফতানিকারক দেশ ব্রাজিলের গুরুত্ব দ্রুতই বাড়ছে।

জ্বালানি বাজার বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের রিফাইনারি ও তেলবাজার বিশেষজ্ঞ সুমিত রিতোলিয়া কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে বলেন, “ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে এশিয়ার জন্য ব্রাজিলের গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে।”

তিনি বলেন, “বিশেষ করে চীন ও ভারত এখন ব্রাজিল থেকে বেশি তেল কিনছে, যাতে উপসাগরীয় অঞ্চলের জাহাজ চলাচল সংকটের ঝুঁকি এড়ানো যায়।”

এশিয়ায় বাড়ছে ব্রাজিলের তেলের চাহিদা

বিশ্লেষকদের মতে, ব্রাজিল মধ্যপ্রাচ্যকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারবে না। তবে উপসাগরীয় অঞ্চলে ঝুঁকি বাড়ায় ব্রাজিলের তেল এখন এশিয়ার শোধনাগারগুলোর কাছে অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

কেপলারের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে এশিয়ার দেশগুলো ব্রাজিল থেকে দৈনিক প্রায় ১২ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি করতো। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সেই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ লাখ ব্যারেলে। এতে স্পষ্ট হয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর নির্ভরতা কমাতে এশিয়ার দেশগুলোর কৌশলে ব্রাজিল বড় ভূমিকা নিতে শুরু করেছে।

উৎপাদন বাড়ছে, তবে সীমাবদ্ধতাও রয়েছে

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ার আগেই ব্রাজিল সমুদ্র উপকূলবর্তী বড় বড় প্রকল্পে তেল উৎপাদন বাড়াচ্ছিল।

কেপলারের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে ব্রাজিল দৈনিক প্রায় ৩৭ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদন করতো। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত উৎপাদন বেড়ে গড়ে ৪০ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেলে পৌঁছেছে। মে মাসে উৎপাদন দাঁড়ায় প্রায় ৪১ লাখ ১০ হাজার ব্যারেলে। 

তবে সুমিত রিতোলিয়ার মতে, এটি যুদ্ধকালীন হঠাৎ উৎপাদন বৃদ্ধি নয়।

তিনি বলেন, “চলতি বছরের মার্চের পর থেকে ব্রাজিলের উৎপাদন মাত্র ৫০ হাজার থেকে এক লাখ ব্যারেল বেড়েছে। অর্থাৎ বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় দ্রুত সরবরাহ বাড়ানোর সক্ষমতা তাদের সীমিত।”

তার মতে, মূল পার্থক্য হলো- ব্রাজিল এখন কোথায় তেল পাঠাচ্ছে।

চীন ও ভারতের দিকে ঝুঁকছে ব্রাজিল

ব্রাজিলের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পেট্রোব্রাস এখন ক্রমশ এশিয়ার বাজারে রফতানি বাড়াচ্ছে। কারণ উপসাগরীয় ঝুঁকি এড়িয়ে তুলনামূলক নিরাপদ তেলের জন্য এশীয় ক্রেতারা বেশি দাম দিতেও প্রস্তুত।

বর্তমানে পেট্রোব্রাসের ৬০ শতাংশের বেশি রফতানি যাচ্ছে চীনে। অন্যদিকে মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে দৈনিক প্রায় ৬০ হাজার ব্যারেল তেল রফতানি হতো, তা এখন শূন্যে নেমে এসেছে বলে জানিয়েছে অয়েলপ্রাইস ডটকম।

অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) মার্চে জানায়, অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ায় ব্রাজিলের বাণিজ্য ভারসাম্য শক্তিশালী হবে।

ব্রাজিলের অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম যদি ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারে পৌঁছে, তাহলে দেশটি অতিরিক্ত যে রাজস্ব পাবে তা ২০২৬ সালের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ শতাংশের সমান হবে।

সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন

ব্রাজিলের তেল রফতানি বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চালিকা শক্তি এখন চীন।

কেপলারের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত চীন দৈনিক গড়ে প্রায় ১৩ লাখ ১৬ হাজার ব্যারেল ব্রাজিলিয়ান তেল আমদানি করেছে। ২০২৫ সালে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ৭ লাখ ৪ হাজার ব্যারেল।

ব্রাজিল-চীন বিজনেস কাউন্সিলের তথ্যানুযায়ী, প্রথম প্রান্তিকে চীনে ব্রাজিলের তেল রফতানির আর্থিক মূল্য প্রায় ৯৫ শতাংশ বেড়ে ৭২০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।

অন্যদিকে ভারতও আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ভারত দৈনিক গড়ে প্রায় দুই লাখ ৩৮ হাজার ব্যারেল ব্রাজিলিয়ান তেল আমদানি করেছে, যেখানে ২০২৫ সালে তা ছিল প্রায় এক লাখ ব্যারেল। এপ্রিল মাসে ব্রাজিল ভারতের চতুর্থ বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী দেশে পরিণত হয়।

কেন ব্রাজিলের তেল গুরুত্বপূর্ণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রাজিলের ‘মিডিয়াম-সুইট’ ধরনের অপরিশোধিত তেলে সালফারের পরিমাণ তুলনামূলক কম। ফলে এটি সহজে ডিজেল ও জেট ফুয়েলের মতো জ্বালানিতে রূপান্তর করা যায়।
এই বৈশিষ্ট্যের কারণে এশিয়ার শোধনাগারগুলোর কাছে ব্রাজিলের তেল এখন অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন দেশকে ভেনেজুয়েলার তেল ব্যবহারের পরামর্শ দিলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, ভেনেজুয়েলার তেল অত্যন্ত ভারী ও উচ্চ সালফারযুক্ত হওয়ায় এশিয়ার বহু শোধনাগারের জন্য তা উপযোগী নয়।

ব্রাজিলের সীমাবদ্ধতাও কম নয়

তবে সব সুবিধার পরও ব্রাজিলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে দূরত্ব। ব্রাজিল থেকে চীনে তেলবাহী জাহাজ পৌঁছাতে প্রায় ৫০ দিন সময় লাগে, যা উপসাগরীয় অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ে এবং বৈশ্বিক জাহাজ সংকটও তীব্র হয়।

এছাড়া চলতি বছরের শেষ দিকে আর্কটিক রুট খুলে গেলে রাশিয়াও আবার এশিয়ার বাজারে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে। রাশিয়ার আর্কটিক বন্দর থেকে চীনে তেল পৌঁছাতে ব্রাজিলের তুলনায় প্রায় অর্ধেক সময় লাগে।

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র সমুদ্রে থাকা রুশ তেলবাহী জাহাজগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মেয়াদ আরও ৩০ দিন বাড়িয়েছে, যা এশিয়ার ক্রেতাদের কাছে রুশ তেলকে আবার আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প নয়

বিশ্লেষক সুমিত রিতোলিয়ার মতে, ব্রাজিল বর্তমানে এশিয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হলেও দীর্ঘমেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যের জায়গা পুরোপুরি নিতে পারবে না।

তার ভাষায়, “ব্রাজিল এশিয়ার জন্য একটি অর্থবহ বিকল্প সরবরাহকারী, বিশেষ করে সংকটের সময়। তবে উৎপাদন সক্ষমতা, পরিবহন ব্যয় এবং ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতার কারণে এটি কখনওই দীর্ঘমেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যের স্থায়ী বিকল্প হয়ে উঠবে না।” সূত্র: আল-জাজিরা

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়