আসন্ন ঈদুল আজহা বা কুরবানির ঈদকে সামনে রেখে চরম অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সংকটে পড়েছেন পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়ের ঘোষপাড়ার গবাদি পশু খামারিরা। সরকারের পক্ষ থেকে গরুর বয়স ও বিক্রি সংক্রান্ত নতুন আইনি কড়াকড়ির কারণে স্থানীয় পাইকারি বাজারে ধস নেমেছে। খামারিদের দাবি, ভরা মৌসুমে কুরবানির পশু বিক্রি বন্ধ হয়ে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তাদের মতো সাধারণ হিন্দু ব্যবসায়ী ও খামারি পরিবারগুলো।
ঋণের বোঝা ও জীবিকা হারানোর শঙ্কা
পশ্চিমবঙ্গের ঘোষপাড়ার প্রায় প্রতিটি পরিবারই বংশানুক্রমিকভাবে দীর্ঘ ২০-৩০ বছর ধরে দুগ্ধ উৎপাদন এবং কুরবানির ঈদকে লক্ষ্য করে গরু মোটাতাজাকরণের ব্যবসা করে আসছেন। খামারিদের অভিযোগ, এবার একেকজন ব্যবসায়ী ১৫ থেকে শুরু করে ৩৫-৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যাংক, স্বর্ণ বা স্থানীয় ভুষির দোকান থেকে ঋণ নিয়ে এই ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন।
নতুন সরকারি বিধিনিষেধের কারণে গত কয়েকদিন ধরে কোনো ক্রেতা বা পাইকার খামারে আসছেন না। এমনকি যারা আগে অগ্রিম টাকা দিয়ে গবাদি পশু বায়না করেছিলেন, রাস্তায় পুলিশি ঝামেলা ও হেনস্থার ভয়ে তারাও এখন বায়নার টাকা ফেরত চাচ্ছেন। এই অবস্থায় মূলধন হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বহু খামারি।
১৪ বছরের সার্টিফিকেট’ ও জন্মনিবন্ধন বিতর্ক
পশ্চিমবঙ্গের খামারিরা জানান, নতুন নিয়ম অনুযায়ী ১৪ বছর বয়স না হলে কোনো গরু বিক্রি বা জবাই করা যাবে না এবং এর জন্য গবাদি পশুর নির্দিষ্ট 'জন্ম সার্টিফিকেট' বা প্রমাণপত্র লাগবে। খামারিদের প্রশ্ন, মানুষের জন্ম নিবন্ধন বা সার্টিফিকেট থাকলেও, একটি গরুর জন্ম সার্টিফিকেট খামারিরা কোথা থেকে সংগ্রহ করবেন? তাছাড়া বর্তমান সময়ে আধুনিক প্রযুক্তির কারণে লাঙল দিয়ে চাষের প্রচলন না থাকায়, কোনো চাষী বা খামারি ৮-৯ বছরের বেশি বয়সের গরু সাধারণত পালন করেন না।
অনাহারে গবাদি পশু, অচল খামার
আর্থিক সংকটের কারণে খামারের পশুগুলোকে ঠিকমতো খাবার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান ব্যবসায়ীরা। ভুষি ও খড়ের দোকানে লাখ লাখ টাকা বাকি পড়ে থাকায় বিক্রেতারা আর নতুন করে বাকিতে খাবার দিচ্ছেন না। খামারিদের বক্তব্য, নিজেদের সংসার চালানোই যেখানে কঠিন হয়ে পড়েছে, সেখানে খামারের পশুর পেছনে প্রতিদিন বিপুল টাকা খরচ করা তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে দ্রুত সমাধান না হলে পশুগুলো অনাহারে মারা যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও পুনর্বাসনের দাবি
ঘোষপাড়ার খামারিদের মতে, তারা এলাকার মুসলিম সম্প্রদায়ের সাথে অত্যন্ত মিলেমিশে দীর্ঘ বছর ধরে এই ব্যবসা করে আসছেন। কুরবানির পশু বেচাকেনা নিয়ে তাদের মধ্যে কখনোই কোনো সাম্প্রদায়িক বিবাদ ছিল না।
খামারিদের দাবি, যদি এই ধরনের কোনো নিয়ম বা নিষেধাজ্ঞা জারি করতেই হতো, তবে অন্তত ৬ মাস বা এক বছর আগে তাদের জানানো উচিত ছিল। বিক্রির ঠিক আগমুহূর্তে হঠাৎ এমন সিদ্ধান্তে তারা পুরোপুরি দেউলিয়া হওয়ার পথে। খামারিদের দাবি, সরকার যেন ধানের মতো খামারিদের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্যে এই সমস্ত গরু কিনে নেয় অথবা এই বছরের জন্য নিয়মটি শিথিল করে তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়। অন্যথায় গবাদি পশু নিয়ে রাজ্য সরকারের সদর দফতর 'নবান্ন' অভিমুখে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।