শিরোনাম
◈ ডিএমপি কমিশনার হলেন মোসলেহ্ উদ্দিন ◈ ঈদযাত্রায় শিক্ষার্থীদের বিভাগীয় শহরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বাস সার্ভিস চালুর সিদ্ধান্ত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ◈ বিশ্বকাপ খেলা এখ‌নো অ‌নি‌শ্চিত, তার প‌রেও ইরানের দল ঘোষণা ◈ দুবাইয়ে কর্মসংস্থানের নতুন দ্বার, নিয়োগ পাবে ৬ হাজার চালক ◈ ভারতে সংখ্যালঘুদের আক্রমণ আড়াল করতে বিদেশে আরএসএস’এর তদবির ◈ জাবি আলোনসো চেলসির নতুন কোচ! ◈ “বাস-রেলস্টেশনে টার্গেটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তুলতাম”, জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিল অজ্ঞান পার্টির মূলহোতা ◈ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জ্বালানি সমঝোতা, কী সুবিধা পাবে বাংলাদেশ? ◈ যশোরে আটক জেলা যুবলীগ সভাপতি মোস্তাফা ফরিদ গ্রেফতার ◈ ড. ইউনূসসহ সব উপদেষ্টার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে রিট

প্রকাশিত : ১৭ মে, ২০২৬, ০৪:৫৮ দুপুর
আপডেট : ১৮ মে, ২০২৬, ১২:০০ রাত

প্রতিবেদক : আর রিয়াজ

ভারতে সংখ্যালঘুদের আক্রমণ আড়াল করতে বিদেশে আরএসএস’এর তদবির

আল জাজিরা এক্সপ্লানার : ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও আক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় , উগ্র ডানপন্থী আরএসএস ‘ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের’ চেষ্টা করছে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) বলছে, বিশ্বব্যাপী ভাবমূর্তি শক্তিশালী এবং ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগ খণ্ডন করতে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলিতে সফর অব্যাহত রাখছে। মঙ্গলবার ঘোষিত এই সফরগুলো এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন ভারতে সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনা চলছে এবং কয়েক মাস আগে একটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রীয় সংস্থা এই গোষ্ঠীকে কয়েক দশক ধরে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা চালানোর অভিযোগে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দি অধ্যাপক এবং সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সমালোচক অপূর্বানন্দ আল জাজিরাকে বলেন, আরএসএস একটি ফ্যাসিবাদী সংগঠন হিসেবে পরিচিত, কারণ এর প্রথম সারির মতাদর্শীদের লেখাগুলো দেখলে বোঝা যায়, তারা মুসোলিনি ও হিটলারের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছিল। হিন্দু মহাসভা দলের নেতা এবং হেডগেওয়ারের পরামর্শদাতা বিএস মুঞ্জে ১৯৩১ সালে ইতালীয় স্বৈরশাসক বেনিতো মুসোলিনির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, প্রকাশ্যে ফ্যাসিবাদী যুব ও সামরিক সংগঠনগুলোর প্রশংসা করতেন এবং হিন্দু সমাজকে সংগঠিত করার জন্য সেগুলোকে একটি আদর্শ হিসেবে দেখতেন।

আরএসএস-এর দ্বিতীয় প্রধান এমএস গোলওয়ালকর ১৯৩৯ সালে ‘আমরা, অথবা আমাদের জাতিসত্তার সংজ্ঞা’ শিরোনামে একটি বই লেখেন, যেখানে তিনি জাতিগত বা জাতীয় বিশুদ্ধতা রক্ষার উদাহরণ হিসেবে নাৎসি জার্মানির সংখ্যালঘুদের প্রতি আচরণের কথা উল্লেখ করেন। অপূর্বানন্দ আরো বলেন, আপনি হিটলারের নীতির প্রতি প্রশংসা দেখতে পাবেন। ভারতে মুসলিম ও খ্রিস্টানদের সঙ্গে তারা এভাবেই আচরণ করতে চেয়েছিল। বর্তমান সময়ে তাদের অনুপ্রেরণার উৎস হলো ইসরায়েল, কারণ ইসরায়েলও মুসলিম ও খ্রিস্টানদের প্রতি একই নীতি অনুসরণ অর্থাৎ তাদের সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করতে কাজ করছে। ভারতে আরএসএস বেশ কয়েকবার নিষিদ্ধ হয়েছে, যার মধ্যে ১৯৪৮ সালে একজন প্রাক্তন সদস্য কর্তৃক স্বাধীনতা নেতা মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করার পর নিষেধাজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত।

ভারত সরকারের সাথে আরএসএস-এর যোগসূত্র 

আরএসএস-কে প্রায়শই ভারতের শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-র আদর্শিক মাতৃভূমি হিসেবে বর্ণনা করা হয়। জনতা পার্টি জোট থেকে বিভক্ত হওয়ার পর, হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতা ও কবি অটল বিহারী বাজপেয়ীসহ ভারতীয় জন সংঘের (বিজেএস) প্রাক্তন নেতাদের নিয়ে ১৯৮০ সালে বিজেপি গঠিত হয়। বিজেপি প্রথমবার ১৯৯৬ সালে বাজপেয়ীকে প্রধানমন্ত্রী করে অল্প সময়ের জন্য ক্ষমতায় এসেছিল, কিন্তু সংসদ সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন পেতে ব্যর্থ হওয়ায় তিনি ১৩ দিন পরেই পদত্যাগ করেন। তিনি ১৯৯৮ সালে আবার জয়ী হন এবং অনাস্থা ভোটে হেরে যাওয়ার আগে ১৩ মাস প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাজপেয়ী পরবর্তীতে ১৯৯৯ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত একটি স্থিতিশীল মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ১৯৭২ সাল থেকে আরএসএস-এর সদস্য রয়েছেন। 

ভারতে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক অপরাধ কি বাড়ছে?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘ইন্ডিয়া হেট ল্যাব’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল নাগাদ ভারতে মুসলিম ও খ্রিস্টানসহ সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ঘটনা ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ঘটনাগুলোর বেশিরভাগই ঘটেছে বিজেপি-শাসিত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোতে। ২০১৫ সাল থেকে ভারতে গবাদি পশু চরানো নিয়ে বিবাদ বা গরুর মাংস খাওয়ার অভিযোগে জনতা কর্তৃক বেশ কয়েকজন মুসলিমকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তারা লক্ষ্যবস্তু করে চালানো আক্রমণেরও শিকার হয়েছেন।

ভারতীয় মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক অপরাধ ছাড়াও, সম্প্রতি ভারতে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক অপরাধ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ‘ইন্ডিয়া হেট ল্যাব’-এর প্রতিবেদন অনুসারে, খ্রিস্টানদের লক্ষ্য করে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ঘটনা ২০২৪ সালের ১১৫টি থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ১৬২টিতে দাঁড়িয়েছে, যা ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি। ভারতে খ্রিস্টানদের গির্জা এবং প্রার্থনা সভাও আক্রমণের শিকার হয়েছে। অনেক পর্যবেক্ষক এই বৃদ্ধির জন্য বিজেপি এবং আরএসএস-কে দায়ী করেন, যদিও তারা এর দায় অস্বীকার করে।

মার্কিন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘ সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অফ অর্গানাইজড হেট’ (সিএসওএইচ)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক রাকিব হামিদ নায়েক আল জাজিরাকে বলেন, “সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে বিদ্বেষমূলক অপরাধ, সহিংসতা, বুলডোজার দিয়ে উচ্ছেদ, বৈষম্যমূলক আইন এবং বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের এক উদ্বেগজনক বৃদ্ধির পাশাপাশি রাষ্ট্রও এসআইআর-সহ তার পূর্ণ শক্তি ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করছে।”

আরএসএস কীভাবে পশ্চিমা বিশ্বে তদবির করছে?

মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে বিদেশি গণমাধ্যমকে আরএসএস নেতা হোসাবালে বলেন, তিনি “আরএসএস সম্পর্কে কিছু ভুল ধারণা ও ভ্রান্তি দূর করার জন্য” যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি এবং যুক্তরাজ্যে বিভিন্ন সমাবেশে বক্তব্য রাখছেন। এপ্রিল মাসে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং জার্মানি সফরের সময় হোসাবালে শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক এবং ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি মধ্য ইংল্যান্ডের লন্ডন এবং রাগবিতে ছয় দিন কাটান এবং চ্যাথাম হাউস, রয়্যাল ইনস্টিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স এবং সিটি অফ লন্ডনের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সাসটেইনেবিলিটি-সহ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেন। সফরকালে এক নৈশভোজে কনজারভেটিভ পার্টি, লেবার পার্টি এবং লিবারেল ডেমোক্রেটস-এর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এর পরে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন, যেখানে তিনি ১০ দিন ধরে একাধিক শহরে ভারতীয় আমেরিকান সম্প্রদায়ের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। হোসাবালে ওয়াশিংটন ডিসি-ভিত্তিক একটি রক্ষণশীল থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, হাডসন ইনস্টিটিউটের সঙ্গেও আলোচনা করেন।

অপূর্বানন্দ আল জাজিরাকে বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশে প্রবাসী ভারতীয় হিন্দুরা আর্থিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। আরএসএস-এর প্রবাসী সমর্থকরা সংগঠনটিকে অর্থায়নে সাহায্য করে। যে দেশে তাদের নাগরিকত্ব রয়েছে, সেখানে সমস্ত অধিকার ভোগ করার পাশাপাশি তারা ভারতকে একটি হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়। 

অপূর্বানন্দ আরো বলেন, এপ্রিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরের পর হোসাবালে দুই দিনের জন্য জার্মানিতে যান, যেখানে তিনি জার্মান নীতি নির্ধারক প্রতিষ্ঠান এবং ভারতীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এদের মধ্যে ছিল জার্মান সরকারকে পরামর্শদানকারী বার্লিন-ভিত্তিক পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্স’ এবং জার্মানির মধ্য-ডানপন্থী ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন পার্টির সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক সংস্থা ‘কনরাড অ্যাডেনাওয়ার ফাউন্ডেশন’। সারা বিশ্বে ডানপন্থী রক্ষণশীল সংগঠনগুলোর একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করা আরএসএস-এর একটি স্বপ্ন। 

হোসাবালে মঙ্গলবার মিডিয়াকে বলেন যে, আরএসএস সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে তারা ইউরোপের পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং অন্যান্য অঞ্চলে সফর অব্যাহত রাখবেন।

আরএসএস কেন এই প্রচার চালাচ্ছে?

নভেম্বরে মার্কিন আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশনের (ইউএসসিআইআরএফ) একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর আরএসএস-এর এই সফরগুলো অনুষ্ঠিত হয়। এতে বলা হয়েছে যে আরএসএস “কয়েক দশক ধরে সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর সদস্যদের বিরুদ্ধে চরম সহিংসতা ও অসহিষ্ণুতার কর্মকাণ্ডে জড়িত রয়েছে”। আল জাজিরাকে রাকিব হামিদ নায়েক বলেন, “সংখ্যালঘুদের ওপর পদ্ধতিগত নিপীড়নে তাদের ভূমিকার জন্য সংগঠনটি ও এর নেতাদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা আরোপের ইউএসসিআইআরএফ-এর সুপারিশের জবাবেই আরএসএস-এর এই আন্তর্জাতিক উদ্যোগ মূলত একটি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া।”

ইউএসসিআইআরএফ হলো একটি দ্বিদলীয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রীয় সংস্থা, যা বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর নজর রাখে এবং রাষ্ট্রপতি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও কংগ্রেসকে এ সংক্রান্ত নীতি বিষয়ে পরামর্শ দেয়। রাকিব হামিদ নায়েক বলেন, এই সুপারিশটি একটি দ্বিদলীয় সংস্থা থেকে এসেছে। আর একারণেই এটি এত বড় একটি আঘাত। 

এদিকে অপূর্বানন্দ বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি সংস্থা ভারতে সংখ্যালঘুদের অধিকারের অবস্থা নিয়ে তদন্ত করছে। নায়েক আরও বলেন, আরএসএস এবং এর নেতাদের বিরুদ্ধে প্রস্তাবিত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হলে, তা তাদের নেটওয়ার্কের পতনের কারণ হতে পারে। এর ফলে আরএসএস একঘরে হয়ে পড়বে, এমনকি প্রবাসী ভারতীয়দের মাঝেও, যাদের মধ্যে কেউ কেউ সংগঠনটিকে অর্থায়ন ও টিকিয়ে রাখতে বড় ভূমিকা পালন করেছেন, বিশেষ করে ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার আগে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং নীতি নির্ধারক মহলে ক্রমশ জোরালো হয়ে ওঠা নিষেধাজ্ঞার আলোচনার বিরুদ্ধে একটি পাল্টা আখ্যান তুলে ধরতে আরএসএস-এর নেতাদের যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশে পাঠানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়