তুরস্কের পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান 'কান' উন্নয়নে সমর্থন দেওয়া এবং সম্ভাব্য ক্রয়ের বিষয়ে সউদী আরবের আগ্রহের খবর ওয়াশিংটনে অস্বস্তি তৈরি করেছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা রিয়াদের বিকল্প উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা খোঁজার প্রচেষ্টায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালে সউদী আরবকে লকহিড মার্টিনের এফ-৩৫ লাইটনিং-২ সরবরাহের চুক্তির পর এই অস্বস্তি আরও বেড়েছে।
ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই পরিস্থিতি এক নতুন জরুরি রূপ নিয়েছে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা হিসাব-নিকাশকে নতুন করে ঢেলে সাজাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীল নিরাপত্তা পরিবেশে আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো এখন এমন সরবরাহকারী খুঁজছে যারা উন্নত প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দেশীয়ভাবে উৎপাদনের সুযোগ দেবে।
মিত্রদের ওপর সামরিক ব্যয়ের দায়ভার ভাগ করে দেওয়ার মার্কিন চাপ আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোকে বিকল্প অংশীদারিত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তবে এটি শেষ পর্যন্ত আঞ্চলিক অস্ত্র বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিপত্য কেড়ে নিতে পারে।
মার্কিন কৌশলে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্ব পুনঃমূল্যায়ন
বিশ্বজুড়ে সামরিক উপস্থিতি কমানোর পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যকে কৌশলগতভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ২০২৫ সালের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের নিট জ্বালানি রপ্তানিকারক হিসেবে উত্থান এই অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে আঞ্চলিক শক্তিগুলো তাদের অংশীদার এবং প্রতিরক্ষা ক্রয় কৌশলে বৈচিত্র্য আনতে বাধ্য হচ্ছে।
সউদী আরবের জন্য এর অর্থ হলো তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মতো আঞ্চলিক ও বহিঃআঞ্চলিক দেশগুলোর সাথে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। তবে এই বৈচিত্র্য আনার উদ্দেশ্য ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়, বরং নতুন কৌশলগত বাস্তবতার সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া।
আঙ্কারা এবং ইসলামাবাদ উভয়েই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে শক্তিশালী সম্পর্ক বজায় রাখছে। এমনকি তুরস্কের পুনরায় এফ-৩৫ প্রোগ্রামে ফেরার আলোচনা দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার হওয়ারই ইঙ্গিত দেয়। একইভাবে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচনের পর পাকিস্তান-মার্কিন সম্পর্কেরও উল্লেখযোগ্য বিস্তার ঘটেছে।
তবে ইরান যুদ্ধের আঞ্চলিক প্রভাব সামাল দিতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতা এই অঞ্চলের দেশগুলোকে নিরাপত্তার জন্য অন্য কোথাও তাকাতে বাধ্য করতে পারে।
আঙ্কারার সোশ্যাল সায়েন্সেস ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট ফর এরিয়া স্টাডিজের সহকারী অধ্যাপক বারিন কায়াওগ্লু 'দ্য নিউ আরব'কে বলেন, "ওয়াশিংটন যুদ্ধের সময় ইসরায়েলকে রক্ষা করাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে এবং এটি উপসাগরীয় দেশগুলোর কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলে দেবে।"
সউদী আরবের বৈচিত্র্যকরণ কৌশলটি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সাজানো হয়েছে যাতে ওয়াশিংটনের সাথে নিরাপত্তা সম্পর্ক অটুট রেখে নতুন অংশীদারিত্ব বাড়ানো যায়। পাকিস্তান ও সউদী আরবের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির ঘোষণা এই প্রচেষ্টারই একটি উদাহরণ।
তবে এই প্রচেষ্টাগুলো যখন মার্কিন স্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তখন সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে। চীনের তৈরি পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান জেএফ-১৭ কেনার বিষয়ে সউদী আগ্রহ মার্কিন বাধার মুখে পড়েছিল, যা উপসাগরীয় প্রতিরক্ষায় চীনা প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্তিতে ওয়াশিংটনের বিরোধিতাকেই ফুটিয়ে তোলে। তাই রিয়াদের কৌশল হলো ওয়াশিংটনের 'রেডলাইন' বা চূড়ান্ত সীমা বজায় রেখে বিকল্প পথ খোঁজা।
মিডল ইস্ট আই-এর তুরস্ক ব্যুরো প্রধান রাগিপ সয়লু টিএনএকে বলেন, "ওয়াশিংটন সম্ভবত রিয়াদের 'কান' প্রকল্পে অংশগ্রহণে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে, যতক্ষণ সউদী আরব একই সাথে এফ-৩৫ ক্রয় অব্যাহত রাখবে।"
এত উত্তেজনা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র এখনও এই অঞ্চলের পছন্দের নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে টিকে আছে। এর কারণ হলো কয়েক দশকের প্রাতিষ্ঠানিক সংহতি এবং প্রতিরক্ষা অবকাঠামো। তবে মার্কিন 'বার্ডেন-শেয়ারিং' নীতি ঘর্ষণ তৈরি করছে, যা প্রতিরক্ষা সিদ্ধান্তে ওয়াশিংটনের প্রভাব কমিয়ে দিতে পারে।
অস্ত্র বাজারে মার্কিন আধিপত্য কি এখনো অটুট?
ওয়াশিংটন বর্তমানে একটি জটিল কৌশলগত সংকটের মুখোমুখি। একদিকে মার্কিন নিরাপত্তা ছত্রছায়া এখনও উপসাগরীয় নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। অন্যদিকে, নিরাপত্তার নিশ্চয়তাদানকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে ক্রমবর্ধমান সন্দেহ, ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অস্থিরতা এবং ওয়াশিংটনের পশ্চিম গোলার্ধের দিকে মনোযোগ সরানোর বিষয়টি আঞ্চলিক শক্তিগুলোর বিকল্প খোঁজার গতি ত্বরান্বিত করেছে।
তুরস্কের পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের প্রতি রিয়াদের আগ্রহ এই পরিস্থিতিরই প্রতিফলন। ২০২৫ সালে ওয়াশিংটন সউদী আরবের কাছে এফ-৩৫ বিক্রিতে নীতিগতভাবে সম্মত হলেও এই চুক্তিটি বড় ধরনের সীমাবদ্ধতার মুখে রয়েছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো ইসরায়েলের 'গুণগত সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব' বজায় রাখা। মার্কিন আইন অনুযায়ী, যেকোনো উন্নত সমরাস্ত্র হস্তান্তরের সময় নিশ্চিত করতে হবে যেন ওই অঞ্চলে ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ক্ষুণ্ণ না হয়।
ফলে সউদী আরবের কাছে প্রস্তাবিত এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানগুলোতে সম্ভবত সীমিত সক্ষমতা থাকবে এবং ভবিষ্যতে কোনো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ থাকবে। এই বিধিনিষেধগুলো রিয়াদের স্বাধীনভাবে পরিচালনার সক্ষমতাকে সীমিত করে। এই কারণেই রিয়াদ এমন অংশীদার খুঁজছে যারা কম শর্তে উন্নত প্রযুক্তি দেবে।
তুরস্কের এই যুদ্ধবিমান প্রকল্পে সউদী অংশগ্রহণ প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং যৌথ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করলেও, পূর্ণাঙ্গ যৌথ উৎপাদনের জন্য যে উচ্চপর্যায়ের বিশ্বাস প্রয়োজন তা এখনও পুরোপুরি তৈরি হয়নি।
এছাড়া রাগিপ সয়লু বলেন, "তুরস্কের যুদ্ধবিমান কর্মসূচি ভালো এগোচ্ছে, কিন্তু এটি এখনও মার্কিন সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পর্যায়ে নেই। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষায় মার্কিন প্ল্যাটফর্মগুলোর সমকক্ষ হতে তুরস্কের আরও অন্তত ৫ থেকে ১০ বছর সময় লাগবে।"
'কান' প্রকল্পের আগে সউদী আরব যুক্তরাজ্য, ইতালি এবং জাপানের নেতৃত্বাধীন ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান প্রকল্প 'গ্লোবাল কমব্যাট এয়ার প্রোগ্রাম' (জিসিএপি)-এ যোগ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের কথা বলে জাপান রিয়াদের অংশগ্রহণের বিরোধিতা করেছিল। সম্প্রতি আর্থিক সংকট এবং প্রকল্পের ধীরগতির কারণে যুক্তরাজ্য আবারও সউদী আরবকে এই কনসোর্টিয়ামে যুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে।
রিয়াদ এফ-৩৫ চুক্তির ক্ষেত্রেও বিলম্ব বা বাতিলের বিষয়ে সতর্ক। ২০২১ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতও অনুরূপ চুক্তিতে পৌঁছেছিল, কিন্তু চীনা প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে মার্কিন উদ্বেগ এবং আমিরাতিদের হতাশায় শেষ পর্যন্ত তা ভেস্তে যায়।এই অভিজ্ঞতাগুলোই তুরস্কের বিকল্পের আবেদন রিয়াদের কাছে বাড়িয়ে তুলেছে। 'কান' এর যৌথ উন্নয়ন ও ক্রয়ের মাধ্যমে আঙ্কারা রিয়াদকে শিল্পে অংশগ্রহণ, প্রযুক্তি হস্তান্তরের নমনীয়তা এবং কম রাজনৈতিক বিধিনিষেধের প্রস্তাব দিচ্ছে। এটি সউদী আরবের 'ভিশন ২০৩০' লক্ষ্যের সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ, যার লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে সামরিক ব্যয়ের ৫০% স্থানীয়করণ করা।
পিছু হটার মূল্য
মিত্রদের ওপর দায়িত্ব চাপানোর মার্কিন নীতির কৌশলগত দিকগুলো ওয়াশিংটনকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। সউদী আরবের আধুনিকায়ন অভিযান, নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলা এবং একক কোনো দেশের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রচেষ্টা তাদের বিকল্প অংশীদারিত্বের পথ প্রশস্ত করছে।
কাতার ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও প্রতিরক্ষা বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক আলী বাকির টিএনএকে বলেন, "ইরান যুদ্ধ আঞ্চলিক দেশগুলোকে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার করতে এবং সউদী আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান ও সম্ভাব্য মিশরের সমন্বয়ে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো তৈরির আলোচনায় বাধ্য করবে।"
এই পরিস্থিতি আরও বেগবান হচ্ছে যখন পশ্চিমা দেশগুলোর বাইরে তৈরি উন্নত সমরাস্ত্রগুলো যুদ্ধে কার্যকর প্রমাণিত হচ্ছে। যেমন ২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের সাথে সংঘর্ষে পাকিস্তানের চীনা জে-১০সি যুদ্ধবিমানের ব্যবহার কিংবা ইরানি হামলা ঠেকাতে আমিরাতের দক্ষিণ কোরীয় 'চেওনগুং-২' প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সফল প্রয়োগ।
এই বিকল্প ব্যবস্থাগুলো যখন সফলভাবে কার্যকর হচ্ছে, তখন শর্তযুক্ত এবং সীমাবদ্ধ মার্কিন অস্ত্র সরবরাহের আবেদন ধীরে ধীরে ম্লান হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নে গভীর সহযোগিতা সেই শূন্যস্থান পূরণ করে নিতে পারে।
সূত্র: ইনকিলাব