বিবিসি: ভারতের উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদে একটি বহুতল ভবনের নবম তলা থেকে পড়ে তিন কিশোরীর মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তে নেমে একাধিক পারিবারিক ও আর্থিক সংকটের তথ্য পেয়েছে পুলিশ। নিহত তিন বোনের বয়স ১৬ বছরের নিচে। প্রাথমিকভাবে ‘কোরিয়ান গেম’-এর প্রভাবের কথা বলা হলেও পুলিশ পরে জানায়, এমন কোনো গেমের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
আজ (৫ ফেব্রুয়ারি) বৃহস্পতিবার প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বিবিসি জানিয়েছে, বুধবার সকালে তিন মেয়ের বাবা চেতন কুমার গণমাধ্যমকে দাবি করেন, তার মেয়েরা একটি কোরিয়ান গেম খেলছিল, যেখানে শেষ ‘টাস্ক’ ছিল আত্মহত্যা। তবে সন্ধ্যার দিকে পুলিশ স্পষ্ট করে জানায়, এই ঘটনার সঙ্গে কোনো গেমের সরাসরি সম্পর্ক নেই। বরং মেয়েরা নিয়মিত কোরিয়ান নাটক (কে-ড্রামা) দেখত এবং সেখানকার অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ বিষয়বস্তুর প্রভাব তাদের ওপর পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পুলিশ জানায়, চেতন কুমার পেশায় একজন শেয়ার ব্যবসায়ী এবং তার ওপর প্রায় ২ কোটি টাকার ঋণের চাপ রয়েছে। আর্থিক সংকট এতটাই তীব্র ছিল যে, বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের জন্য তিনি মেয়েদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বিক্রি করে দেন। এমনকি সম্প্রতি তিনি আর নিজের মোবাইল ফোনও মেয়েদের ব্যবহার করতে দিতেন না।
পুলিশের দাবি, কোভিড-১৯ মহামারির পর স্কুল খোলা হলেও তিনি আর মেয়েদের স্কুলে পাঠাননি। এর পেছনেও আর্থিক দুরবস্থাই প্রধান কারণ বলে জানিয়েছে পুলিশ। এছাড়া তিনি মেয়েদের ভয় দেখিয়ে বিয়ে দেওয়ার কথাও বলেছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। নিহত তিন বোন হলেন—নিশিকা (১৬), প্রাচি (১৪) ও পাখি (১২)। পুলিশ ধারণা করছে, বাবার আচরণ, মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেওয়া এবং পারিবারিক চাপ তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে।
চেতন কুমারের দুই স্ত্রী রয়েছেন। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে তার দাম্পত্য জীবন ১৭ বছর পার হওয়ার পর তিনি স্ত্রীর ছোট বোনকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে বিয়ে করেন। প্রথম স্ত্রীর ঘরে তার এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে, আর দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে এই তিন কন্যা। প্রথম স্ত্রীর ঘরে থাকা ১৪ বছর বয়সী ছেলে মানসিক প্রতিবন্ধী বলে জানিয়েছে পুলিশ, যা পরিবারটির ওপর আরও মানসিক ও আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছিল।
পুলিশ জানায়, পরিবারটি তিন বছর আগে গাজিয়াবাদের একটি বহুতল আবাসনে দুই কক্ষের ফ্ল্যাটে ওঠে। বুধবার রাত প্রায় ২টার দিকে আবাসনের কয়েকজন বাসিন্দা বিকট শব্দ শুনে বাইরে বেরিয়ে আসেন। পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা অরুণ সিং জানান, তিনি বারান্দা থেকে তিন বোনকে ওই সময় দেখেন। বড় বোনটি প্রথমে রেলিংয়ের দিকে এগোলে অন্য দুই বোন তাকে টানার চেষ্টা করে। ছোট বোন বড় বোনের কোমর জড়িয়ে ধরে ছিল এবং তৃতীয় বোন তার হাত ধরেছিল। একপর্যায়ে তিনজনই নিচে পড়ে যায়। বাসিন্দারা দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স ডাকলেও তা পৌঁছাতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে বলে অভিযোগ করেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
পুলিশ জানায়, মেয়েদের ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল, যা ভেঙে প্রবেশ করতে হয়। ভেতরে সিনেমার সংলাপ ও কবিতার মতো কিছু লেখা, পরিবারের সদস্যদের ছবি বৃত্তাকারে সাজানো অবস্থায় পাওয়া যায়। এছাড়া একটি আট পৃষ্ঠার নোটবুক উদ্ধার করা হয়েছে, যেখানে বাবা-মাকে ডায়েরি পড়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে এবং লেখা ছিল “এটাই সত্য”। একটি মোবাইল ফোনও পাওয়া গেছে, যার ওয়ালপেপারে তিন বোনের ছবি ছিল। সেখানে তারা নিজেদের কোরিয়ান নামও লিখে রেখেছিল।
ঘটনাটি ২০১৭ সালে মুম্বাইয়ে আলোচিত ‘ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জ’–সংক্রান্ত একটি আত্মহত্যার ঘটনার সঙ্গে তুলনা করা হলেও পুলিশ জানিয়েছে, এ ক্ষেত্রে তেমন কোনো সরাসরি প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পুলিশ বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করছে এবং ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক প্রতিবেদনের অপেক্ষা করছে।