ডেনমার্কের আওতাধীন একটি আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড বর্তমানে তীব্র ভূ-রাজনৈতিক লড়াইয়ের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি জানিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ড দখল করা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এটিই কি একমাত্র কারণ? কি আছে বরফের এই অঞ্চলটিতে?
মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ
গ্রিনল্যান্ড বিরল খনিজ পদার্থ, তেল এবং গ্যাসে সমৃদ্ধ। ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনেক খনিজ উপাদানের ভাণ্ডার এই দ্বীপটি। এখানে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে রেয়ার-আর্থ এলিমেন্ট, গ্রাফাইট, লিথিয়াম, ইউরেনিয়াম এবং অন্যান্য ধাতু- যা ইলেকট্রিক গাড়ি, উইন্ড টারবাইন, ব্যাটারি, সেমিকন্ডাক্টর, এআই চিপ, মিসাইল, স্যাটেলাইট এবং ক্লিন-এনার্জি গ্রিড তৈরির জন্য অপরিহার্য।
বর্তমানে বিশ্বের বেশিরভাগ বিরল খনিজ সরবরাহ চীনের নিয়ন্ত্রণে। ফলে গ্রিনল্যান্ড যদি পশ্চিমাদের খনিজ হাব হতে পারে, তবে তা চীনকে মোকাবিলায় আমেরিকান ও ইউরোপীয় অর্থনীতিকে বড় সুবিধা দেবে।
ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে গ্রিনল্যান্ডের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে, রাশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে কোনো মিসাইল ছোড়া হলে তার সংক্ষিপ্ততম পথটি উত্তর মেরু এবং গ্রিনল্যান্ডের ওপর দিয়ে যায়। ইউরোপ এবং রাশিয়ার মধ্যে সামরিক ও মিসাইল নজরদারির জন্য এই আর্কটিক দ্বীপটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিম উপকূলে পিটুফিক স্পেস বেস পরিচালনা করছে।
জলবায়ু সংকটে খুলছে ভাগ্য
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলে যাওয়া একদিকে যেমন তাপমাত্রা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে নতুন ভূমি এবং খনিজ অঞ্চলের দুয়ার খুলে দিচ্ছে। এটি অঞ্চলটির অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মান বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে এই অঞ্চলটি বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত হতে যাচ্ছে।
নতুন সমুদ্রপথের চাবিকাঠি
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আর্কটিক অঞ্চলের বরফ গলে নতুন নতুন সমুদ্রপথ তৈরি হচ্ছে, যা এশিয়া, উত্তর আমেরিকার এবং ইউরোপের মধ্যে নৌ-যোগাযোগের দূরত্ব কমিয়ে আনবে। এই মেরু অঞ্চলীয় পথগুলো সুয়েজ খাল বা পানামা খালের মতো প্রথাগত রুটগুলোর বিকল্প হয়ে উঠতে পারে, যা ভ্রমণের সময় এবং জ্বালানি খরচ সাশ্রয় করবে। গ্রিনল্যান্ড এই উদীয়মান 'নর্দার্ন সি রুট' এর পাশেই অবস্থিত। গ্রিনল্যান্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকলে ভবিষ্যতে এই গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলোর ওপর আধিপত্য বিস্তার করা সম্ভব হবে।
গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ নতুন কিছু নয়
১৮৬৫ সালে প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জনসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম সেওয়ার্ড ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ১৯৪৬ সালে প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান উদীয়মান স্নায়ুযুদ্ধের কৌশলগত কারণে দ্বীপটির বিনিময়ে ডেনমার্ককে ১০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের স্বর্ণ দেয়ার প্রস্তাব দেন। ডেনমার্ক তা প্রত্যাখ্যান করলেও ১৯৫১ সালে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে থুলে বিমান ঘাঁটি স্থাপন করে।
২০১৯ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম গ্রিনল্যান্ড কেনার আগ্রহ জানান। ২০২৫=-২৬ সালেও তিনি সেই ইচ্ছার পুনরাবৃত্তি করেন। সম্প্রতি ট্রাম্প বলেছেন, গ্রিনল্যান্ডবাসী পছন্দ করুক বা না করুক, আমরা সেখানে কিছু একটা করতে যাচ্ছি। তিনি দাবি করেন, খনিজ সম্পদের জন্য নয় বরং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে আমেরিকার জন্য গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন। তা নাহলে অদূর ভবিষ্যতে চীন ও রাশিয়া গ্রিনল্যান্ড দখলে নেবে।
ট্রাম্পের মতে, আমেরিকা যদি গ্রিনল্যান্ড দখল না করে, তবে রাশিয়া বা চীন দ্বীপটি দখল করে নেবে। তিনি বলেন, এখন গ্রিনল্যান্ডের চারপাশ রাশিয়া ও চীনের জাহাজে ঘেরা। বেইজিং অবশ্য 'চীনা ভীতি' ছড়িয়ে ট্রাম্পের হীন স্বার্থ হাসিলের চেষ্টার সমালোচনা করেছে।
তবে গ্রিনল্যান্ড দখল করতে পারলে চীন তাদের উচ্চাভিলাষী ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর অংশ ‘পোলার সিল্ক রোড’ বাস্তবায়নে বড় সুবিধা পাবে। অন্যদিকে, রাশিয়ার জন্য গ্রিনল্যান্ডের গুরুত্ব মূলত সামরিক কৌশল এবং নতুন শিপিং রুট ব্যবহারের ক্ষেত্রে। সূত্র: একাত্তর টিভি