বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে প্রতিটি ফোন কল, লোকেশন ও অনলাইন কার্যকলাপ যেখানে ট্র্যাকিং বা ডেটায় পরিণত হচ্ছে, সেখানে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা এক বড় চ্যালেঞ্জ। এমন পরিস্থিতিতে সাইবার নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে ‘‘বার্নার ফোন’’। একসময় অপরাধজগৎ বা থ্রিলার সিনেমার বিষয়বস্তু মনে করা হলেও, বর্তমান বাস্তবতায় এটি এখন ডিজিটাল নিরাপত্তার এক নীরব হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, বার্নার ফোন হলো এমন এক ধরনের মোবাইল ফোন যা দিয়ে একজন মানুষ খুব সহজেই নিজের জন্য অস্থায়ী এবং বেনামি নম্বর তৈরি করতে পারেন। সাধারণত এগুলো দামে সস্তা ও সাধারণ ফিচারযুক্ত প্রিপেইড মোবাইল ফোন হয়ে থাকে।
কোনো রকম দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি বা আনুষ্ঠানিক পরিচয়পত্র ছাড়াই সাধারণ দোকান থেকে প্রিপেইড মিনিটসহ এই ফোনগুলো কেনা যায়। অল্প সময়ের জন্য নির্দিষ্ট প্রয়োজনে ব্যবহার করার পর এই ফোনগুলো ফেলে বা ধ্বংস করে দেওয়া হয়। ফলে ডিভাইসের সমস্ত টেকনিক্যাল ডাটা চিরতরে মুছে যায় এবং ব্যবহারকারীর স্থায়ী ডিজিটাল পরিচয় আড়ালেই থেকে যায়। অনেক সময় বাসাবাড়ির বয়স্ক সদস্যদের ফেলে রাখা বা পরিত্যক্ত পুরোনো ডিভাইসগুলোকে সচল করেও বার্নার ফোন হিসেবে রূপান্তর করা হয়ে থাকে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরকে কেন্দ্র করে বার্নার ফোনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে ব্যাপক আলোচনায় আসে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম মিরর ইউএস-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেওয়ার সময় ট্রাম্পের সফরসঙ্গী প্রতিনিধিদলকে তাদের ব্যক্তিগত মোবাইল, ল্যাপটপসহ কোনো ইলেকট্রনিক যন্ত্র সঙ্গে নিতে নিষেধ করা হয়েছিল।
নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল অস্থায়ী ব্যবহারের ‘‘বার্নার ফোন’’। কারণ এই ফোনগুলোতে আধুনিক ফিচার কম থাকায় সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষিত থাকে না। সম্ভাব্য সাইবার নজরদারি বা হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি এড়াতে সফর শেষে প্রতিনিধিরা শুধু সেই বার্নার ফোনই নয়, চীন থেকে পাওয়া সমস্ত স্মারক উপহারও ডাস্টবিনে ফেলে ধ্বংস করে দেন।
বার্নার ফোনের যেমন রয়েছে নিরাপত্তা সুবিধা, তেমনি রয়েছে এর অপব্যবহারের অন্ধকার দিকও। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বার্নার ফোনের অন্যতম বড় গ্রাহক হলো অপরাধী চক্র। অবৈধ লেনদেন, মাদক ব্যবসা বা যেকোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সময় পুলিশ ও গোয়েন্দাদের হাত থেকে নিজেদের আড়াল রাখতে তারা এই ফোন ব্যবহার করে।
অন্যদিকে, বর্তমান বিশ্বে ডেটা নজরদারি ও ডিভাইস হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি বাড়তে থাকায় শুধু গোয়েন্দা সংস্থা নয়; সাংবাদিক, বড় ব্যবসায়ী, গবেষক, মানবাধিকারকর্মী এবং ভ্রমণকারীরাও সংবেদনশীল অঞ্চলে যাতায়াতের সময় বার্নার ফোন ব্যবহার করছেন।
বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হোয়াটসঅ্যাপ স্ক্যাম, ওটিপি জালিয়াতি, সিম সোয়াপিং এবং ফোনভিত্তিক ডিজিটাল প্রতারণা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। সাইবার অপরাধীরা প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত নম্বর ট্র্যাক করে ফাঁদ পাতছে।
এই ধরনের সাইবার ঝুঁকি থেকে বাঁচতে বিশ্বজুড়ে এখন এই ‘‘অস্থায়ী ডিজিটাল পরিচয়’’ বা বার্নার ফোনের ধারণার প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। নিজের মূল নম্বর ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রেখে জরুরি বা সাময়িক যোগাযোগের জন্য বার্নার ফোন ব্যবহারকে এখন অনেকেই কার্যকর আত্মরক্ষা হিসেবে দেখছেন।