স্পোর্টস ডেস্ক : ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই কেবল মাঠের লড়াই নয়, এটি বিলিয়ন ডলারের এক বিশাল বাণিজ্য। ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এই আসরকে ‘মানবতার জন্য সুখের ফেরি’ বলে অভিহিত করেন।
কিন্তু ২০২৬ সালের আসরটি শুরুর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও বিশ্বের এক বিশাল অংশের মানুষের জন্য সেই ‘সুখ’ এখন অনিশ্চয়তার মুখে। বিশেষ করে বিশ্বের দুই জনবহুল দেশ ভারত ও চীনে এখনো বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি করতে পারেনি ফিফা।
ফিফার উচ্চাভিলাষী বিপণন কৌশল এবং এশীয় বাজারগুলোর কঠোর বাণিজ্যিক বাস্তবতার মধ্যে যে দেওয়াল তৈরি হয়েছে, তা ফুটবল বিশ্বের জন্য এক নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এবারের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে উত্তর আমেরিকায়।
যখন যুক্তরাষ্ট্রে খেলা শুরু হবে, তখন এশিয়ায় গভীর রাত কিংবা ভোরের আলো। ভারত নিউইয়র্কের চেয়ে সাড়ে নয় ঘণ্টা এবং চীন ১২ ঘণ্টা এগিয়ে।
এর মানে হলো, অধিকাংশ ম্যাচ যখন শুরু হবে, তখন ভারতের মানুষ ঘুমে আর চীনের মানুষ কেবল ঘুম থেকে উঠছে।
বিজ্ঞাপনদাতাদের জন্য এটি একটি দুঃস্বপ্ন। তারা সাধারণত চায় এমন সময়ে খেলা হোক যখন দর্শক সংখ্যা সর্বোচ্চ থাকে। মধ্যরাতের বা ভোরের ফুটবল ম্যাচে বড় কোনো ব্র্যান্ড চড়া মূল্যে বিজ্ঞাপন দিতে চায় না, যা সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ভারতে স্পোর্টস রাইটস মানেই হলো ক্রিকেটের রাজত্ব। ভায়াকম১৮ (রিলায়েন্স) ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের সময় ৬০ মিলিয়ন ডলারে স্বত্ব কিনে জিও-সিনেমাতে বিনামূল্যে খেলা দেখিয়েছিল। কিন্তু এবার ফিফা ২০২৬ ও ২০৩০ বিশ্বকাপের জন্য ১০০ মিলিয়ন ডলার দাবি করলেও ভারতের সম্প্রচারকারীরা তাতে সায় দেয়নি।
এর পেছনে দুটি বড় কারণ কাজ করছে। প্রথমত, একই সময়ে ইংল্যান্ডে নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে, যা ভারতের দর্শকদের কাছে অনেক বেশি আকর্ষণীয়। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি ভারতীয় মিডিয়া কোম্পানি তাদের পরবর্তী আইপিএল স্বত্ব কেনার জন্য বিশাল অংকের টাকা জমিয়ে রাখছে। ভারতের যুক্তি পরিষ্কার, মধ্যরাতে ভারতবিহীন একটি ফুটবল টুর্নামেন্টের চেয়ে দুপুরের ক্রিকেট ম্যাচগুলো অনেক বেশি লাভজনক।
চীন সব সময়ই ফিফার জন্য একটি ‘সোনার খনি’ ছিল। কিন্তু এবার ফিফা সেখানে নজিরবিহীন বাধার মুখে পড়েছে। ফিফা শুরুতে চীনের কাছে ২৫০ মিলিয়ন ডলার দাবি করলেও পরবর্তীতে সাড়া না পেয়ে তা কমিয়ে ১২০ মিলিয়ন এবং সবশেষে ৮০ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে এনেছে। তবুও চীনের রাষ্ট্রীয় চ্যানেল সিসিটিভি চুক্তিতে সই করেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের জাতীয় দল এবার বিশ্বকাপে না থাকায় রাজনৈতিক চাপ কম, ফলে সিসিটিভি একদম শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দরাদরি চালিয়ে যাবে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বর্তমান বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক শীতল সম্পর্কও এই দর কষাকষিতে প্রভাব ফেলছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ফিফার জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর হলো বাংলাদেশ। বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশ হিসেবে বাংলাদেশে বিশ্বকাপের প্রতি সবসময়ই ব্যাপক উন্মাদনা থাকে। ফিফা জানিয়েছে, ‘স্প্রিংবক্স’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশে সম্প্রচার নিশ্চিত করা হয়েছে। যদিও সেই প্রতিষ্ঠানের প্রচার এখনো সেভাবে শুরু হয়নি, তবে ফুটবলপ্রেমী এই দেশে ফিফা একটি বড় বাজার নিশ্চিত করতে পেরেছে।
২০২৬ বিশ্বকাপটি আদর্শগতভাবে সবচেয়ে বেশি ‘আমেরিকান’ হতে যাচ্ছে। বর্ধিত দল, হলিউড স্টাইলের প্রচারণা এবং সিলিকন ভ্যালি স্টাইলের নগদীকরণ, সব মিলিয়ে ফিফা এখন নিজেকে কেবল একটি খেলার সংস্থা নয়, বরং একটি বিনোদন মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। ভারত ও চীনের এই অনড় অবস্থান প্রমাণ করছে যে, ফিফা চাইলেই এশীয় বাজারে যেকোনো মূল্য চাপিয়ে দিতে পারে না।
যদি শেষ পর্যন্ত চুক্তি না হয়, তবে ৩৩০ কোটি দর্শক হয়তো পাইরেসি বা অবৈধ অ্যাপের দিকে ঝুঁকবে। এটি ফিফার জন্য দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি, কারণ তারা তাদের বৈধ গ্রাহক ও বিজ্ঞাপনের নিয়ন্ত্রণ হারাবে। ফিফার লক্ষ্যমাত্রা ১৩ বিলিয়ন ডলার আয়ের জন্য এই এশীয় বাজারগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অচলাবস্থা কেবল একটি টুর্নামেন্টের সম্প্রচার নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলের বাণিজ্যিক আধিপত্য বনাম আঞ্চলিক বাস্তবতার এক মহাযুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।