নিরাপত্তা-সংক্রান্ত একটি কালো তালিকায় (ব্ল্যাকলিস্ট) নাম থাকার কারণে নয়া দিল্লির বিমানবন্দরে অভিবাসন (ইমিগ্রেশন) কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানকে আটকে দিয়েছে বলে জানিয়েছে ভারতের প্রভাবশালী গণমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস। এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাতে সোমবার ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে (ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার) তলব করেছে বাংলাদেশ সরকার।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান রোববার সন্ধ্যায় দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। তিনি ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশন (আইওআরএ)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিতে সেখানে গিয়েছিলেন। কিন্তু বিমানবন্দরে সাধারণ নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় তাঁর নামটিতে 'রেড ফ্ল্যাগ' বা সতর্কতা সংকেত দেখায় ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ এবং তাঁকে আটকে দেওয়া হয়।
কেন তালিকায় ছিল তাঁর নাম?
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে হিন্দুস্তান টাইমস জানিয়েছে, ডা. জাহেদ উর রহমানের অতীতে ভারত-বিরোধী বক্তব্য দেওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। বিশেষ করে তাঁর নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল **"জাহেদ’স টেক"-এ দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্যের কারণে ভারতে তাঁর চ্যানেলটি আগে থেকেই ব্লক বা বন্ধ করে রাখা হয়েছে। আর এই কারণেই তাঁর নাম ভারতের নিরাপত্তা নজরদারির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা বলেন, "ভারতের বিষয়ে তাঁর অতীতের বিভিন্ন সমালোচনামূলক বক্তব্যের কারণে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাঁকে আটকে রেখেছিল। পরে অবশ্য আলোচনা সাপেক্ষে তাঁকে ভারতে প্রবেশের জন্য এককালীন বিশেষ অনুমতি ও ছাড়পত্র দেওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে তিনি নিজেই অন্য একটি ফ্লাইটে বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন।"
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ভিসা দেওয়া যেকোনো দেশের একটি সার্বভৌম সিদ্ধান্ত এবং এটি কোনো অধিকার নয়। ডা. জাহেদ উর রহমান কোনো কূটনৈতিক (ডিপ্লোম্যাটিক) পাসপোর্ট নয়, বরং সাধারণ পাসপোর্টে ভ্রমণ করছিলেন। তিনি ভারতীয় ভিসার জন্য সরাসরি আবেদন না করে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি সার্ক ভিসা সংগ্রহ করেছিলেন। তবে এই বিষয়টি ভারতীয় পক্ষকে আগে থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি বলে দাবি করা হয় হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে।
ভারতীয় কর্মকর্তাদের দাবি, যদি বিষয়টি আগে থেকে দিল্লিকে জানানো হতো, তবে কালো তালিকায় তাঁর নাম থাকার জটিলতাটি আগেভাগেই সমাধান করা যেত।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডা. জাহেদ উর রহমান তাঁর ইউটিউব শো-তে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেওয়া এবং বাংলাদেশে "হিন্দু কার্ড" রাজনৈতিক কৌশল ব্যবহারের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে তীব্র সমালোচনা করেছিলেন।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পবন বাধে-কে তলব করে এই ঘটনার প্রতি গভীর হতাশা ও কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এই ঘটনাকে "অনভিপ্রেত" এবং "দুর্ভাগ্যজনক" বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সরকার এ বিষয়ে কূটনৈতিক স্তরে যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে।
রোববার রাতে দিল্লি থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে সরাসরি কোনো ফ্লাইট না থাকায়, ডা. জাহেদ উর রহমান শ্রীলঙ্কার কলম্বো হয়ে ট্রানজিট নিয়ে দেশে ফিরে আসেন।
ঢাকার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কূটনৈতিক চিঠি দিয়ে আগে জানানোর পরও রোববার সন্ধ্যায় ভারতের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে দিল্লিতে ঢুকতে বাধা দিয়েছে। পরে উচ্চ মহলের নির্দেশে অনুমতি দেওয়া হলেও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা দিল্লিতে না গিয়ে কলম্বো হয়ে ঢাকায় ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। পরে তিনি সোমবার দুপুরে ঢাকায় ফিরেছেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন ওই বৈঠকে উপদেষ্টার অংশ নেওয়ার বিষয়টি গত শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছিল।
এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটলো যখন ভারত ও বাংলাদেশ—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠনের পর তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন করে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করছে। বিশেষ করে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে যে চরম টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে ওঠার এই চেষ্তার মধ্যেই নতুন করে এই কূটনৈতিক অস্বস্তি তৈরি হলো। অনুবাদ: ইনকিলাব