সহযোগীদের খবর: হায়ার এডুকেশন অ্যাকসেলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্পে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ চলে আসছে শুরু থেকেই। আওয়ামী লীগ আমলে শুরু হওয়া এই প্রকল্প এখন রীতিমতো গলার কাঁটা। দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংকের সহায়তা ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) মাধ্যমে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। কিন্তু দুর্নীতি, পরিকল্পনাহীনতাসহ নানা কারণে নাখোশ বিশ্বব্যাংক। বিএনপি সরকার গঠনের পর শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে বিষয়টি অবহিত করেছে বিশ্বব্যাংক। যা নিয়ে চটেছেন তিনি। হিট প্রকল্পের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা নেবেন বলেও জানান। সূত্র: মানবজমিন প্রতিবেদ
৪,০১৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ৫ বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো দেশের ৪৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগ বৃদ্ধি করা। ৫ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের কাজ ২০২৩ সালের জুলাই থেকে শুরু হয়। এই প্রকল্পে সরকার ৫০.৯৬ শতাংশ এবং বিশ্বব্যাংক বাকি অর্থায়ন করবে। ১৫১টি উপ-প্রকল্পের মাধ্যমে এই কর্মসূচি চলছে। দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক ও গবেষকদের কাছ থেকে প্রস্তাবনা আহ্বান করে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সেরা প্রকল্পগুলো নির্বাচন করা হয়েছে।
প্রকল্পের শুরুতেই পিডি নিয়োগ নিয়ে বাধে বিপত্তি। পিডি নিয়োগ পরীক্ষায় ৩২ প্রার্থীর মধ্যে প্রথম হয়েছিলেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল হাসনাত মুহাম্মদ সোলায়মান। ২০২৪ সালের ১৪ই মার্চ ইউজিসি তাকে নিয়োগ দেয়। কিন্তু ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের মৌখিক নির্দেশে মাত্র এক দিনের মাথায় তার নিয়োগ বাতিল করে মন্ত্রণালয়।
এই প্রকল্প নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে দুর্নীতির কথা জানান শিক্ষকরা। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত, অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম, অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম, অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক ও অধ্যাপক ড. জামাল উদ্দিন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, হিট প্রকল্পে ভালো এবং স্বীকৃত গবেষকদের বাদ দিয়ে লো-প্রোফাইল ও কম সাইটেশনধারী শিক্ষকদের প্রজেক্ট নির্বাচিত করা হয়েছে।
শিক্ষকরা বলেন, প্রজেক্ট নির্বাচনে মেধা ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়ে স্বজনপ্রীতি করা হয়েছে। আমাদের পর্যবেক্ষণ বলে, প্রায় ৪০ শতাংশ লো-প্রোফাইলধারী (টোটাল সাইটেশন ১০০-এর কম) গবেষকদের প্রজেক্ট নির্বাচন করা হয়েছে। এছাড়া ৫০০ সাইটেশনের কম আছে এমন ৪০ শতাংশ গবেষকদের প্রজেক্ট নির্বাচন করা হয়েছে। বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত গবেষকদের বাদ দিয়ে তুলনামূলক কম গবেষণা ও সাইটেশন রয়েছে এমন গবেষক নির্বাচন করা হয়েছে। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
শিক্ষকরা আরও বলেন, রিভিউ কমিটিতে যে বিষয়ে যারা এক্সপার্ট তাদের রাখা হয়নি। এমনকি পিএইচডি করেননি এমন ব্যক্তিকেও রিভিউ কমিটিতে রাখা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় গবেষণার জন্য অর্থায়নে বিচারহীনতা, স্বচ্ছতার অভাব এবং রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। ফলে প্রকৃত গবেষকরা বঞ্চিত হয়েছেন, যা গবেষণা ক্ষেত্রে এক ভয়াবহ সংকট বলেও অভিযোগ করেন তারা।
হিট প্রকল্পে শিক্ষকদের আনীত অভিযোগসমূহ হলো- রিভিউ প্রক্রিয়ার গুণগত মান ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব রয়েছে, ইউজিসি থেকে যে ব্লাইন্ড পিয়ার রিভিউয়ের কথা বলা হয়েছে এই দাবি মিথ্যা, প্রেজেন্টেশনে নিয়মের পরিপন্থি মূল্যায়ন, অঘোষিত বিভাগভিত্তিক বৈষম্য, প্রাক-বাছাই পদ্ধতির অনুপস্থিতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতি অবহেলা, রিসার্চ কোয়ালিটির নামে বিভ্রান্তি এবং অনেক রিসার্চ ফিল্ডের প্রতি অবহেলা।
এছাড়াও, করোনা মহামারিকালে জাতীয় অবদান থাকা সত্ত্বেও প্রকল্প বাতিল, শিল্প সহযোগী (পার্টনারিং অ্যাগ্রিমেন্ট) ছাড়াই ইন্ডাস্ট্রি প্রজেক্টে অনুমোদন, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক বা বিভাগভিত্তিক প্রকল্প সংখ্যা ও অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য, নৈতিক ও আদর্শগত সংকট, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও তার প্রভাব, চূড়ান্ত বাছাই বোর্ডে তাচ্ছিল্যমূলক ব্যবহার এবং হিট রিভিউ পদ্ধতির মাধ্যমে এবং ব্যবস্থাপনার নামে অর্থের অপচয় করা হয়েছে।
এছাড়াও ইউজিসিতে চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক লিখিত অভিযোগও দিয়েছিলেন। এতে উল্লেখ ছিল- চলমান ১ম ধাপের প্রকল্পসমূহ চূড়ান্ত না করে এখনই স্থগিত করা, একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে হিট প্রকল্পের মূল্যায়নে ঘটে যাওয়া অনিয়মসমূহ খতিয়ে দেখা এবং নিরপেক্ষ রিভিউয়ারদের মাধ্যমে ব্লাইন্ড রিভিউ সম্পন্ন করা।
প্রয়োজনে বহির্বিশ্বের এক্সপার্টদের সহযোগিতা নেয়া, জুলাই বিপ্লবের পরও যারা হিট প্রজেক্ট মূল্যায়নের ক্ষেত্রে দুর্নীতিকরণ, রাজনীতিকরণ এবং স্বজনপ্রীতিকরণের মাধ্যমে ইউজিসিকে কলঙ্কিত করেছে, তাদের দ্রুত অপসারণ করে যোগ্য লোকদেরকে দায়িত্ব প্রদান করাসহ বেশ কিছু অভিযোগ।
এসব অভিযোগের পরও গত বছরের ২৭শে আগস্ট নির্বাচিত ১৫১টি উপ-প্রকল্প বাস্তবায়নে দেশের ৪৩টি পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চুক্তি সই করে ইউজিসি। এসময় হিটের প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক আসাদুজ্জামান উপ-প্রকল্প নির্বাচন প্রক্রিয়াসহ প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি তুলে ধরেন।
এসব দুর্নীতির বিষয় সামনে আসায় ইউজিসি চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. এস এম এ ফায়েজ বলেছিলেন, হিটের বিভিন্ন সাব-প্রজেক্ট প্রকল্প মূল্যায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে সব ধরনের ধরনের উদ্যোগ ইউজিসি নিশ্চিত করেছে। প্রকল্প মূল্যায়নের প্রতিটি ধাপের খোঁজ আমি নিয়মিত নিয়েছি।
নতুন সরকারের আমলে এই প্রকল্পের বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সৌজন্য সাক্ষাতের পর। বৈঠকের পর শিক্ষামন্ত্রী জানান, হিট প্রকল্প নিয়ে তারা নানান ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। তারা বিষয়টি নিয়ে নাখোশ। তিনি বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।