এনএসইউ জিনোম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এনজিআরআই) নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাটি ন্যাচার পোর্টফোলিওর প্রকাশিত আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’ এ প্রকাশের জন্য গৃহীত হয়েছে। বারডেম জেনারেল হাসপাতাল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় গবেষণাটি সম্পন্ন হয়।
প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ মেলিওডোসিসে আক্রান্ত রোগীদের মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত দুটি নির্দিষ্ট জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত করেছেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (এনএসইউ) গবেষকরা। মৃত রোগীদের শরীর থেকে সংগৃহীত ব্যাকটেরিয়ায় এ পরিবর্তন দুটি পাওয়া গেলেও সুস্থ হয়ে ওঠা রোগীদের নমুনায় তা মেলেনি। গবেষকদের এ আবিষ্কার মেলিওডোসিসের তীব্রতা ও মৃত্যুঝুঁকি নিরূপণে নতুন দিক উন্মোচন করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গবেষণায় মেলিওডোসিস সৃষ্টিকারী বার্কহোল্ডেরিয়া সিউডোম্যালি (Burkholderia pseudomallei) ব্যাকটেরিয়ার সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্সিং ও বায়োইনফরমেটিকস বিশ্লেষণ করা হয়। ১৪ জন রোগীর শরীর থেকে সংগৃহীত ব্যাকটেরিয়ার নমুনা বিশ্লেষণ করে গবেষকরা LysR-family transcriptional regulator নামের একটি প্রোটিনের জিনে Ala184Val ও Val208Ala নামের দুটি জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত করেন। এ পরিবর্তন দুটি কেবল মৃত রোগীদের নমুনায় পাওয়া গেছে। তবে বৃহত্তর নমুনায় গবেষণাটি যাচাই এবং পরীক্ষাগারভিত্তিক নিরীক্ষার মাধ্যমে ফলাফল নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ও এনজিআরআইয়ের পরিচালক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাকসুদ হোসেনের নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। এর ক্লিনিক্যাল অংশে নেতৃত্ব দেন বারডেম জেনারেল হাসপাতালের অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. লাভলী বাড়ৈ। জিনোমিক ও বায়োইনফরমেটিকস বিশ্লেষণ সম্পন্ন করেন এনজিআরআইয়ের গবেষক ইসমাত রুহ জাহান। তারা দুজন গবেষণাপত্রটির যৌথ প্রথম লেখক। গবেষণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আহসানও যুক্ত ছিলেন।
গবেষণার বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাকসুদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হলো মৃত্যুবরণকারী রোগীদের ব্যাকটেরিয়ায় এমন কিছু নির্দিষ্ট জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত করা হয়েছে, যা সুস্থ হয়ে ওঠা রোগীদের নমুনায় পাওয়া যায়নি। পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণায় এ ফলাফল নিশ্চিত করা গেলে মেলিওডোসিসের মতো প্রাণঘাতী সংক্রমণের তীব্রতার পেছনে ব্যাকটেরিয়ার জিনগত ভূমিকা বোঝার ক্ষেত্রে এটি একটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।’
গবেষকরা জানান, মেলিওডোসিস একটি মারাত্মক ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রামক রোগ। মাটি ও পানিতে থাকা বার্কহোল্ডেরিয়া সিউডোম্যালি ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে এলে সাধারণত এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ব্যাকটেরিয়াটি শরীরে প্রবেশ করে ফুসফুস, রক্তসহ বিভিন্ন অঙ্গে সংক্রমণ ঘটাতে পারে। জ্বর, নিউমোনিয়া, প্রস্রাবে সংক্রমণ, ত্বক ও মাংসপেশিতে ফোঁড়া, পুঁজ জমা এবং জয়েন্টে ব্যথা এ রোগের উল্লেখযোগ্য লক্ষণ। গুরুতর অবস্থায় রোগীর সেপটিক শক, তীব্র শ্বাসকষ্ট, অচেতনতা ও বিভ্রান্তি দেখা দিতে পারে। অনেক রোগীর লিভার, প্লীহা, ফুসফুস ও প্রোস্টেটেও ফোড়া তৈরি হয়। এসব ক্ষেত্রে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা এ রোগে গুরুতর সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন। আবার মেলিওডোসিসের উপসর্গ অন্যান্য সাধারণ সংক্রমণের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় অনেক সময় দ্রুত রোগ শনাক্ত করা কঠিন হয়। ফলে সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও কার্যকর চিকিৎসা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান চিকিৎসকরা।
জিনোম বিশ্লেষণে মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে চিহ্নিত দুটি পরিবর্তনের পাশাপাশি ব্যাকটেরিয়ার বিপাকক্রিয়া ও প্রোটিনের গঠনপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য জিনগত বৈচিত্র্যও শনাক্ত করেছেন গবেষকরা। তাদের মতে, এসব বৈচিত্র্য বিশ্লেষণ করে ব্যাকটেরিয়ার বৈশিষ্ট্য ও রোগের তীব্রতার মধ্যকার সম্পর্ক সম্পর্কে আরো স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে। তবে শনাক্ত হওয়া পরিবর্তনগুলো মৃত্যুঝুঁকির নির্ভরযোগ্য নির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করা যাবে কিনা, তা নিশ্চিত করতে আরো গবেষণা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে মেলিওডোসিসের কোনো জাতীয় নজরদারি ব্যবস্থা নেই। ফলে দেশে আক্রান্ত ও মৃতের প্রকৃত সংখ্যা অজানা। ২০১৮ সালে ‘ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনা অনুযায়ী, ২০১৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত মেলিওডোসিসে আক্রান্ত ৫১ রোগীর তথ্য পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে ১৪ জন মারা যান। রোগীদের ৮৩ শতাংশই ছিলেন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।
বারডেম মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবরেটরির তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত হাসপাতালটির পরীক্ষাগারে কালচার পরীক্ষায় নিশ্চিত মেলিওডোসিসে আক্রান্ত ১৩০ রোগী শনাক্ত হন। তাদের মধ্যে প্রায় ২৬ শতাংশ, অর্থাৎ ৩৪ জনের মৃত্যু হয়।
অন্যদিকে, ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ইনফেকশাস ডিজিজেস’-এ প্রকাশিত একটি বৈশ্বিক গাণিতিক মডেলে বাংলাদেশে বছরে মেলিওডোসিসে ১৬ হাজার ৯৩১ জন আক্রান্ত এবং ৯ হাজার ৫০০ জনের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছে। মডেলটির হিসাব অনুয