মহসিন কবির: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। ফেব্রুয়ারিতেই হবে ভোট। এ লক্ষ্যে কিছু কর্ম পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছে। রাজনৈতিকদলগুলো বাইরে আন্দোলনের হুমকি দিলেও ভেতরে ভোটের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ইতোমধ্যে নির্বাচনী হাওয়া লেগেছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। বিএনপি ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনমুখী হওয়ার বার্তা দিয়েছে। অন্যদিকে জামায়াত, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলন নির্বাচনের ঘোষিত সময়সীমা নিয়ে সরাসরি আপত্তি না তুললেও নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি চলছে তাদের নির্বাচনী প্রস্তুতিও। জামায়াত তো অনেক আগেই ৩শ আসনে তাদের সম্ভাব্য প্রার্থীর নামও ঘোষণা করেছে।
আগামী জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনীতিতে জোটের সমীকরণও নতুন মোড় নিয়েছে। বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন করলেও নির্বাচনী কৌশল হিসেবে এখন ভিন্ন পথে হাঁটছে। জামায়াত থেকে দূরত্ব বজায় রেখে বামপন্থি ও প্রগতিশীল ধারার রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করছে দলটি। অন্যদিকে জামায়াত এর বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসলামি দলগুলোর সমন্বয়ে একটি বৃহৎ প্ল্যাটফর্ম গড়ার চেষ্টা চলছে তাদের।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অতীতের অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপি তার অবস্থান পুনর্গঠন করছে। বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে জামায়াতকে পাশে না রেখে অন্য শক্তিগুলোর সঙ্গে বোঝাপড়ার মাধ্যমে এগোতে চাইছে দলটি।
জামায়াত ও এনসিপি মনে করে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এখনও ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি হয়নি। প্রশাসন অগোছালো, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না- এমন অভিযোগও তোলা হয়েছে এ দুই দলের পক্ষ থেকে। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীমও বলেছেন, এখনও ভোটের জন্য সমান সুযোগ তৈরি হয়নি। এ অবস্থায় আমাদের নির্বাচনে যাওয়া কঠিন হবে। প্রশাসন যথাযথভাবে কাজ করছে না। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন করলে প্রার্থীদের নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকবে। আমরা কেন এমন ঝুঁকি নেব?
নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে জামায়াত, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের বক্তব্য-বিবৃতিতে উদ্বেগ থাকলেও নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি চলছে জোর কদমে। আর খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, এলডিপি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি), গণঅধিকার পরিষদসহ বিভিন্ন দলের নেতারাও মাঠে তাদের অবস্থান জানান দিতে শুরু করে দিয়েছেন। কোথাও কোথাও স্বতন্ত্র প্রার্থীর উপস্থিতিও দেখা যাচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামী ৩০০ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম ঘোষণার পর কেন্দ্রের নির্দেশ অনুযায়ী প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় প্রচারেও নেমে পড়েছেন। যদিও জোট গড়া হলে সমঝোতার ভিত্তিতে প্রার্থী-তালিকায় পরিবর্তন আসতে পারে।
একইভাবে বিএনপিতেও চলছে প্রতিটি আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া। এ লক্ষ্যে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় দলটি। বিএনপির নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন, দলের মনোনয়ন প্রক্রিয়া চলমান আছে। তফসিল ঘোষণার পর চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য, সৎ, যোগ্য ও ত্যাগী নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বিগত দিনে কারা দলের জন্য অবদান রেখেছেন, তা যাচাই-বাছাই করেই মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হবে।
এদিকে জামায়াতে ইসলামী নির্বাচন সামনে রেখে ইসলামি দলগুলোর সমন্বয়ে একটি বৃহৎ প্ল্যাটফর্ম গড়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু কাক্সিক্ষত সাড়া এখনও পর্যন্ত মেলেনি। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলনসহ অনেক ইসলামি দলের অন্দরমহলের খবর হলো- তারা জামায়াতের সঙ্গে জোটে যেতে চান না। মাঠপর্যায়ের অনেক আলেমের মধ্যেও জামায়াতবিরোধী মনোভাব স্পষ্ট। যদিও জামায়াত আশাবাদী, শেষ মুহূর্তে ঐক্য গড়ে উঠতে পারে। কেবল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বা চরমোনাই পীরের অনুসারীরা ঐক্যের পক্ষে নীতিগতভাবে থাকলেও এখনও তাদের সঙ্গে জামায়াতের আনুষ্ঠানিক কোনো সমঝোতা হয়নি।
জামায়াতের নায়েবে আমির আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হওয়ার ক্ষেত্রে জামায়াতের কোনো আপত্তি নেই। তবে এর আগে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা দরকার। বিভিন্ন দলের সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ইসলামী সমমনা দলগুলোর সঙ্গে আমাদের আলোচনা চলছে। কোনো কিছু চূড়ান্ত হলে জানতে পারবেন।
অন্যদিকে বিএনপি বলছে, জামায়াত ছাড়া অন্য যে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট বা সমঝোতার সুযোগ রয়েছে। সমমনাসহ বাম ও ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রেখেছে বিএনপি। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট করেই বলেছেন, আসন্ন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে কোনো নির্বাচনী জোট হবে না বিএনপির। তবে যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়া কিছু ইসলামি দলের সঙ্গে জোট হতে পারে। তিনি আরও বলেছেন, আগামীর সরকারেও থাকতে পারেন জোটসঙ্গীরা। তিনি জানান, কয়েকটি ইসলামি ঘরানার দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলছে বিএনপির। তাদের সঙ্গে জোটের সম্ভাবনাও রয়েছে। চূড়ান্ত হলে গণমাধ্যমকেও তা জানানো হবে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক গণমাধ্যমকে বলেছেন, বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনী মোর্চা হবে, নাকি বোঝাপড়া হবে- এ নিয়ে এখনও বিস্তারিত আলোচনা হয়নি। তাদের দিক থেকে একটা প্রবল তাগিদ আছে। তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও বলা চলে। দেশের গণতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে বিএনপি একটা নির্বাচনী বোঝাপড়া করতে চায়। কিছুদিন গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
জোটের অঙ্ক যেমনই হোক, বিএনপির সঙ্গে থাকছেন কি না- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমাদের আন্দোলনের ঐক্য নির্বাচনের মধ্য দিয়েও ধরে রাখতে চাই। কোনো কিছুই নিশ্চিত নয়। এটা নির্ভর করবে বড় দল হিসেবে বিএনপির আচরণ ও সদিচ্ছার ওপর। এখনও পর্যন্ত তাদের সদিচ্ছার ঘাটতি নেই, যোগ করেন তিনি।