শিরোনাম

প্রকাশিত : ০৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ০২:৪১ রাত
আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ০১:২৬ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্র্যান্ডিং করাই প্রথম কাজ: ভিসি ড. সাদেকা হালিম

জবি ভিসি ড. সাদেকা হালিম

অপূর্ব চৌধুরী: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ষষ্ঠ ও প্রথম নারী উপাচার্য হিসেবে গত ৩০ নভেম্বর দায়িত্ব নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের প্রথম নির্বাচিত নারী ডিন। ২০০৪ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ঢাবি’র সিন্ডিকেট সদস্য, চার মেয়াদে শিক্ষক সমিতির কার্যকরী পরিষদের সদস্য ও তিনবার সিনেট সদস্য ছিলেন। ড. সাদেকা হালিম জাতীয় শিক্ষানীতি কমিটি ২০০৯-এর ১৮ জন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদের কমিটিতে একজন সদস্য ছিলেন। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সালের জুন পর্যন্ত তথ্য কমিশনে প্রথম নারী তথ্য কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ বছর এশিয়াটিক সোসাইটির নির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন অধ্যাপক সাদেকা হালিম। জবি’র ভিসি হিসেবে তার স্বপ্ন এবং কর্মপরিকল্পনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন দৈনিক আমাদের নতুন সময়ের সঙ্গে। 

প্রশ্ন: আপনার বাবা ফজলুল হালিম চৌধুরী ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। বাবার পর মেয়ে হিসেবে আপনিও উপাচার্য হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিষয়টি কতটা অনুপ্রেরণা জোগায়?

অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম: এটি ভালো প্রশ্ন। আমার বাবা অধ্যাপক ড. ফজলুল হালিম চৌধুরী ১৯৭৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন। তখন আমি অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। বাবা ক্রান্তিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তখন নানা আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে। সবসময় বাবার কাছ থেকে ভালো শিক্ষক হবার পরামর্শ পেতাম৷ বাবার স্বপ্নও ছিল আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হব। ১৯৮৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগেই যখন আমি শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি তখন আমার মনে হয়েছিল বাবার স্বপ্নের মূল্যায়ন আমি করতে পেরেছি। সবার কাছেই তার মা-বাবা অত্যন্ত প্রিয়। বাবার চেতনা, কর্মনিষ্ঠা সবসময় আমার মনে অনুপ্রেরণা জোগায়, মনে পড়ে বাবাকে। আমি শিক্ষকতার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়েও দায়িত্ব পালন করেছি। আমার ধারণা ছিল, দায়িত্ব পালন করতে করতে আমি কখনো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসব। অবশেষে গত ৩০ নভেম্বর আমি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পাই। দায়িত্ব পাওয়ার পর পরই বাবার কথা মনে পড়েছিল। আমি আমার মা-কেও উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার খবরটি বলি। কিন্তু তার অনেক বয়স। তেমনভাবে কোন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে পারেননি। উপাচার্য হিসেবে বাবার অর্জন, জনপ্রিয়তা ও কর্মনিষ্ঠাই আমার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা জোগাবে। 

প্রশ্ন: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে ঢেলে সাজাতে কোন কোন বিষয়গুলোতে অগ্রাধিকার দিবেন?

অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্র্যান্ডিং করতে হবে। আমি উপাচার্য হিসেবে যোগদান করার পর শুরুতে বেশ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি। কারণ প্রয়াত উপাচার্য অসুস্থতাজনিত কারণে মারা যান, তার অনুপস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত সিন্ডিকেট সভা হয়নি। অনেক কিছু জমে গিয়েছিল। দায়িত্ব পাওয়ার ১০ দিন পর সিন্ডিকেট সভার আয়োজন করি। এতে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা অনেক বিষয় অনুমোদিত হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকাণ্ডে গতি আসে। এক্ষেত্রে বর্তমান কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. হুমায়ুন কবীর চৌধুরী ধৈর্য সহকারে সমর্থন দিয়েছেন আমাকে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে  পুরোপুরি একাডেমিক অগ্রযাত্রা নিশ্চিতে বেশ কিছু পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যেই চারুকলা অনুষদের যাত্রা শুরু হয়েছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং ডেটা সাইন্স ডিপার্টমেন্ট চালু করার ইচ্ছা আছে। পাশাপাশি সংক্ষিপ্ত মেয়াদী ডিপ্লোমা কোর্স যেমন: সাইবার সিকিউরিটি, ডেটা সাইন্স ইত্যাদি চালু করার উদ্যোগ নিব। স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ এবং গ্লোবাল ভিলেজের প্রেক্ষিতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধি ও তাদের জ্ঞান বৃদ্ধিতে সচেষ্ট থাকবো। পাশাপাশি  শিক্ষকদের প্রধানমন্ত্রী বৃত্তিসহ নানা ধরনের বৃত্তি দেওয়ার ব্যবস্থা এবং বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপ চালুর উদ্যোগ নেওয়ার ইচ্ছা আছে। এসব উদ্যোগের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টি হবে আরও স্মার্ট।

প্রশ্ন: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিতে কী কী উদ্যোগ নেবেন? 

অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম: আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি মাত্র ক্যান্টিন আছে শিক্ষার্থীদের জন্য। তাও নামমাত্র। আবার নারী শিক্ষার্থীদের জন্য মাত্র একটি আবাসিক হল রয়েছে। পক্ষান্তরে ছাত্রদের জন্য কোন আবাসনের ব্যবস্থাই নেই। ছাত্ররা গাদাগাদি করে মেসে অনিরাপদ জীবনযাপন করেন। একমাত্র ক্যান্টিনটির জন্য একটি ম্যানেজমেন্ট কমিটি করা হবে। কমিটি সেখানে খাবারের মান,দাম ও আনুষঙ্গিক বিষয়াদি পর্যবেক্ষণ করবেন। শিক্ষার্থীরা যেন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খেতে পারেন সেই বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়া হবে। আবার আমার শিক্ষার্থীদের জন্য খেলার মাঠও নেই এখন। তারা খেলাধুলার সুযোগ পাচ্ছে না। ফলে তাদের মেধা-মনন যথাযথভাবে বিকশিত হচ্ছে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেখানে ঘোষণা দিয়েছেন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির পাশাপাশি জঙ্গীবাদ রোধে পর্যাপ্ত খেলাধুলা করতে হবে; সেখানে আমার শিক্ষার্থীরা খেলার সুযোগই পাচ্ছে না, এই বিষয়গুলো আমার জন্য কষ্টের। নতুন ক্যাম্পাসে আবাসন ও খেলার মাঠের ব্যবস্থা থাকবে। তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্টদের প্রতি আমার অনুরোধ থাকবে যেন নতুন ক্যাম্পাস প্রকল্পের মত বড় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি সকল প্রকার জটিলতা নিরসন করে দ্রুত সম্পন্ন করতে যেন আন্তরিক হন। শিক্ষার্থীদের একাডেমিক চর্চায় মনোযোগ ও প্রতিযোগিতা বাড়াতে উদ্যোগ থাকবে। এজন্য ডীনস অ্যাওয়ার্ডটি প্রদানের জন্য সার্বিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা হচ্ছে। দ্রুতই সেটি চালু হবে। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ওয়াশরুম ফ্যাসিলিটি বৃদ্ধি ও ফ্রিডম মেশিন স্থাপনের প্রচেষ্টা থাকবে। ধীরে ধীরে আরও উদ্যোগ নেওয়া হবে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে।

প্রশ্ন: বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক অংশ হচ্ছে গবেষণা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতকে সমৃদ্ধ করতে আপনার কী পরিকল্পনা রয়েছে?
অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে এখনো অতটা গভীরভাবে অনেকেই জানেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যান্ডিং তথা পরিচয় বাড়ে গবেষণা কার্যক্রমের মাধ্যমে। আমি বিশ্ববিদ্যালয়টিতে একটি রিসার্চ ফেয়ার করতে আগ্রহী। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও লাইফ এন্ড আর্থ সায়েন্স অনুষদ দুইটি বেশ শক্তিশালী। এখানে অনেক গবেষক আছেন, ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর জার্নালে তাদের গবেষণা রয়েছে।তারা ভালো করছেন। সার্বিকভাবে তাদের অর্জন ও গবেষণা কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়টিকেই সমৃদ্ধ করছে। তবে কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ গবেষণায় এখনো তেমন শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেনি। সেখানে গবেষণা সমৃদ্ধকরণে আমার অগ্রাধিকার থাকবে। শিক্ষকদের গবেষণা উপকরণ দেওয়া, গবেষণায় বরাদ্দ নিয়ে আসা, বাজেট বৃদ্ধি, আইকিউএসি’র অধিভুক্ত প্রশিক্ষণগুলো জোরদার করা, মেথডোলোজি কোর্সে ধারাবাহিকভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়াসহ প্রয়োজনীয় সব প্রচেষ্টাই থাকবে গবেষণা খাতকে আরও শক্তিশালী করতে।

প্রশ্ন: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ক্যাম্পাসের অবকাঠামোগত কোন উন্নয়ন করা হবে কিনা?

অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম: বর্তমান ক্যাম্পাসের অধিকাংশ বিল্ডিং অনেক পুরনো। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনটিও প্রায় ২০০ বছরের পুরনো। এটি একটি ঐতিহ্যের বিষয়। তবে এখানে মাত্র সাত একর জমি থাকায় বিস্তর পরিসরে অবকাঠামোগত উন্নয়ন করার কোন সুযোগ নেই। প্রয়োজন সাপেক্ষে সংস্কার বা পরিমার্জন করা হবে। আমি ইতিমধ্যেই বিভাগগুলোকে বলেছি তাদের অবকাঠামোগত কিংবা অন্য কোন সহযোগিতা লাগলে জানানোর জন্য। অন্তত নতুন ক্যাম্পাস নির্মাণের আগ পর্যন্ত যতটুকু করা প্রয়োজন হবে আমি ততটুকু করার চেষ্টা করবো। 

প্রশ্ন: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে আপনার স্বপ্ন কি?
অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম: এখনো পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় ধরে নেওয়া হয় পুরুষরাই সব করতে পারেন। কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়ে নানাবিধ কাজের মাধ্যমে আমি সেই ধারণা পাল্টাতে চাই। আমি কখনো ক্ষমতা চর্চায় নয় বরং দলগত পারফরম্যান্সে বিশ্বাসী। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী তথা পুরো পরিবারটিই এখন আমার পরিবার। তাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিতে, আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে তুলে আনতে এবং দেশেও অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করতে আমি চেষ্টা করে যাবো। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষকরাই আমার নজরে বেশি থাকবেন। কারণ তারাই ভবিষ্যৎ নেতা। সম্পাদনা: সালেহ্ বিপ্লব

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়