বিবিসি নিউজ বাংলা: শিয়ালের হুক্কাহুয়া ডাক কিংবা শিয়ালপন্ডিত নামে কাউকে ব্যঙ্গ করা - ছোটবেলায় এমনসব উপমা বা গল্প শোনেননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। বাংলাদেশে খুব পরিচিত এই প্রাণী শিয়ালকে নিয়ে আছে নানা ছড়া, গান, লোকবিশ্বাস, কুসংস্কার বা লোকজ গল্প।
কখনো ধূর্ত চরিত্রে, কখনো অমঙ্গলের প্রতীক, কখনো গৃহপালিত পশুপাখি খেয়ে ফেলায় দায়ে অভিযুক্ত – এভাবেই এই প্রাণীটি মানুষের কাছে পরিচিতি পেয়েছে। পরিবেশবিদেরা বলছেন, অতিপরিচিত প্রাণীটিকে এখন খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। একে আর এখন আগের মতো দেখা যায় না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের সুপরিচিত প্রাণী খেঁকশিয়াল, ইংরেজিতে যাকে বেঙ্গল ফক্স নামে ডাকা হয়, সেটি এখন বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। এর অন্যতম কারণ - যত দিন যাচ্ছে, খেঁকশিয়ালের আবাসস্থল তত কমছে।
প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন জানিয়েছে, বর্তমানে সংকটাপন্ন শ্রেণিতে থাকা খেঁকশিয়াল সংস্থাটির চলমান নতুন মূল্যায়নে বিপন্ন শ্রেণিতে চলে যেতে পারে। অথচ, প্রকৃতিতে এই খেঁকশিয়ালের ভূমিকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মৃত প্রাণী খেয়ে পরিবেশ পরিষ্কার রাখা, ইঁদুরসহ ছোট প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ফুড চেইন বা খাদ্যশৃঙ্খলের ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এই বন্যপ্রাণী।
তাই খেঁকশিয়ালের সংখ্যা কমে যাওয়া শুধু একটি প্রাণীর হারিয়ে যাওয়ার গল্প নয়, বরং পুরো বাস্তুতন্ত্রের জন্যই একটি সতর্কবার্তা বলে মনে করেন পরিবেশবিদেরা।
খেঁকশিয়াল আর পাতিশিয়াল কি একই প্রাণী?
অনেকেই খেঁকশিয়াল আর পাতিশিয়ালকে একই প্রাণী মনে করেন। কারণ বাংলায় 'শিয়াল' শব্দটি সব ধরনের ফক্স বা শিয়ালের ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়। তবে, খেঁকশিয়াল বলতে নির্দিষ্টভাবে বেঙ্গল ফক্স প্রজাতিকেই বোঝানো হয়। এর বৈজ্ঞানিক নাম ভালপিস বেঙ্গালেনসিস।
অন্যদিকে, গ্রামাঞ্চলে মানুষ যে প্রাণীটিকে সাধারণভাবে 'শিয়াল' বলে চেনে, অনেক ক্ষেত্রেই সেটি আসলে পাতিশিয়াল বা গোল্ডেন জ্যাকাল। এর বৈজ্ঞানিক নাম ক্যানিস অরিয়াস। অর্থাৎ, পাতিশিয়ালকে ভাষাগতভাবে বাংলায় শিয়াল বলা হলেও প্রাণিবিজ্ঞানের শ্রেণিবিন্যাসে এটি ফক্স (শিয়াল) নয়, এটি জ্যাকাল।
উল্লেখ্য, ফক্সের মতো জ্যাকালের আলাদা কোনো বহুল প্রচলিত বাংলা নাম নেই। বাংলাদেশে এর সবচেয়ে প্রচলিত নামই পাতিশিয়াল, তথা শিয়াল।
এরা দু'টোই মূলত কুকুরজাতীয় প্রাণী, অর্থাৎ ক্যানিডি পরিবারের সদস্য। তবে এরা ভিন্ন গণের। খেঁকশিয়াল ভালপিস গণের। আর পাতিশিয়াল ক্যানিস গণের। ফলে চেহারা, আবাসস্থল, খাদ্যাভ্যাস ও আচরণগত বৈশিষ্ট্যে এদের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
খেঁকশিয়াল আকারে ছোট, শরীর তুলনামূলক হালকা, উচ্চতা কম, কান বড় ও লম্বা, মুখ সরু এবং লেজ ঘন ও ঝুঁটি-ওয়ালা হয় এবং এদের লেজের ডগার রঙ থাকে কালো।
অন্যদিকে, পাতিশিয়াল আকারে বড় হয়। এদের পা লম্বা, মুখ অপেক্ষাকৃত মোটা এবং দেখতে অনেকটা বুনো কুকুরের মতো। পাতিশিয়ালের লেজ তুলনামূলক ছোট, যাতে খেঁকশিয়ালের মতো এত স্পষ্ট কালো ডগা ও ঝুঁটি থাকে না। কানও খেঁকশিয়ালের তুলনায় ছোট।
আইইউসিএন বলছে, খেঁকশিয়াল সাধারণত খোলা তৃণভূমি ও চরাঞ্চলে, ঝোপঝাড়যুক্ত এলাকায় বসবাস করে এবং সাধারণত তারা একজন সঙ্গীর সাথেই থাকে। আর বিভিন্ন ধরনের আবাসস্থলে সহজে মানিয়ে নিতে পারে। বন, কৃষিজমি থেকে শুরু করে মানুষের বসতির কাছেও এদের দেখা যায়।
খেঁকশিয়ালের বাসস্থান নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এরা প্রধানত গুহাবাসী। নেটওয়ার্কভিত্তিক গুহায় থাকে, মানে মাটির নিচে অনেকগুলো টানেল তৈরি করে।"
কিন্তু পাতিশিয়াল সাধারণত সাধারণ একটি গর্ত খনন করে থাকে, বলছিলেন তিনি। এদের গায়ের রঙেও স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। খেঁকশিয়ালের গায়ের রঙ সাধারণত হালকা ধূসর বা ছাই রঙের। অন্যদিকে, পাতিশিয়ালের গায়ের রঙ সোনালি-বাদামি থেকে কালচে-বাদামি এবং অনেক সময় ছোপছোপ বা মিশ্র বর্ণের দেখা যায়।
খেঁকশিয়ালের ডাক তুলনামূলক তীক্ষ্ণ ও খেঁক-খেঁক ধরনের, যেখান থেকে 'খেঁকশিয়াল' নামটির উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয়। পাতিশিয়ালের ডাক দীর্ঘ হুক্কাহুয়া বা হাউলের মতো শোনায়।
খেঁকশিয়াল কি উপকার করে কৃষকের?
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ বলেছেন, খেঁকশিয়াল সম্পর্কে মানুষের মধ্যে নানা ভুল ধারণা রয়েছে।
তার মতে, অনেকেই খেঁকশিয়াল ও পাতিশিয়ালকে গুলিয়ে ফেলেন। এই বিভ্রান্তির কারণে মানুষ খেঁকশিয়ালকে ক্ষতিকর মনে করে এবং এদের প্রতি মানুষের আচরণ বন্ধুসুলভ হয় না।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "কৃষক মনে করে খেঁকশিয়াল তাদের মুরগি খেয়ে ফেলে। কিন্তু আমাদের গবেষণায় এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। খেঁকশিয়াল খুবই বিরলভাবে এমনটা করতে পারে, তবে এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে এর কোনো রেকর্ড নেই।" মূলত, খেঁকশিয়াল ও পাতিশিয়াল, দু'টোই সর্বভুক।
তবে পাতিশিয়াল আকারে বড় হওয়ায় তুলনামূলক বড় শিকার ধরতে পারে এবং গৃহপালিত হাঁস-মুরগির ওপর আক্রমণের অভিযোগও তার বিরুদ্ধেই বেশি শোনা যায়। আর খেঁকশিয়াল বেশি খায় ইঁদুর, পোকামাকড়, ছোট সরীসৃপ, ফল ও মৃত প্রাণী।
খেঁকশিয়ালের খাদ্যাভাস নিয়েই অধ্যাপক আজিজ বলেন, "আমরা পঞ্চগড়, রাজশাহী, দিনাজপুর, মাগুরা, কুষ্টিয়ায় কাজ করেছি। কিন্তু আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত অমন (কৃষকের মুরগি খেয়ে ফেলার) তথ্য নাই। মুরগি খায় পাতিশিয়াল। আর খেঁকশিয়াল মূলত পোকামাকড় খায়, কিছু ফসলও খায়।" তারা শিয়ালের বৃষ্ঠা পরীক্ষা করে এমনটাই পেয়েছেন বলে জানান অধ্যাপক আজিজ।
তিনি বলেন, "শিয়াল ক্ষতিকর প্রাণী না। এটি পরিবেশ ও কৃষির জন্য ভালো। খেঁকশিয়াল কৃষকের বন্ধু। কিন্তু এটি আমাদের দেশ থেকে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।"
কেন হারিয়ে যাচ্ছে খেঁকশিয়াল?
বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে খেঁকশিয়ালের অবস্থা অনেক বেশি উদ্বেগজনক। প্রকৃতি সংরক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক ইউনিয়ন (আইইউসিএন)-এর গ্লোবাল রেড লিস্ট অর্থাৎ যে তালিকা দিয়ে প্রাণীর বিপন্ন অবস্থার সূচক বোঝানো হয়, সে তালিকায় বেঙ্গল ফক্স বা খেঁকশিয়ালকে 'লিস্ট কনসার্ন (এলসি)' শ্রেণিতে রাখা হয়েছে।
এর মানে হচ্ছে, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী বিলুপ্তির তাৎক্ষণিক ঝুঁকিতে নেই এ প্রাণীটি। কারণ আবাসস্থল ধ্বংস ও মানুষের সঙ্গে সংঘাতের ঘটনার মাঝেও ভারত ও নেপালসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এখনও খেঁকশিয়ালের বিস্তৃতি তুলনামূলকভাবে ভালো। কিন্তু বাংলাদেশের চিত্র ভিন্ন।
আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০১৫ সালের রেড লিস্ট অনুযায়ী, খেঁকশিয়ালকে 'ভালনারেবল' বা ঝুঁকিপূর্ণ প্রাণী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
আইইউসিএনের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, একসময় প্রাণীটি দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় দেখা গেলেও এখন এটি মূলত দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এছাড়া, মৌলভীবাজার সীমান্ত এলাকায় খেঁকশিয়ালের একটি ছোট পালের অস্তিত্ব রয়েছে।
মূলত, গ্রামবাসীদের হাতে হত্যা, আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া এবং বিস্তৃতি কমে যাওয়ায় এদের সংখ্যা ও বিস্তৃতি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। তবে, বাংলাদেশে বর্তমানে ঠিক কতটি খেঁকশিয়াল রয়েছে, সে নিয়ে সরকার বা আইইউসিএনের কোনো নির্ভরযোগ্য জরিপ নেই।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দেশে ২০০টিরও কম খেঁকশিয়াল টিকে থাকার দাবি করা হলেও, আইইউসিএন বলছে তাদের কাছে এমন কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা সংক্রান্ত তথ্য নেই।
বাংলাদেশে খেঁকশিয়ালসহ বন্যপ্রাণীর বর্তমান অবস্থা হালনাগাদ করতে বন বিভাগ ও আইইউসিএন বাংলাদেশে ২০২৬ সালে জাতীয় প্রাণিকুলের তৃতীয় রেড লিস্ট হালনাগাদের কাজ শুরু করেছে। এ মূল্যায়নে ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিভিন্ন প্রজাতির সংরক্ষণ অবস্থার পরিবর্তন পর্যালোচনা করা হবে।
নতুন মূল্যায়নের বিষয়ে আইইউসিএন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ম্যানেজার সারোয়ার আলম বলেন, "খেঁকশিয়াল নিয়ে তথ্য হালনাগাদ করছি আমরা, এখনও শেষ হয়নি।
"এটি সংকটাপন্ন থেকে বিপন্ন হতে পারে। কিন্তু এর চেয়ে নীচে নামবে না। বিপন্ন বলি তখন, যখন সংখ্যা থাকে এবং সেই সংখ্যা কমে যায়। অথবা, হ্যাবিটেট রেঞ্জ কমে যায়।"
আইইউসিএনের ঝুঁকির শ্রেণিবিন্যাস শুরু হয় 'লিস্ট কনসার্ন' দিয়ে, এর অর্থ ঝুঁকি সর্বনিম্ন। এর পর রয়েছে 'নিয়ার থ্রেটেন্ড বা প্রায় ঝুঁকিপূর্ণ,।
তার পরের ধাপ হচ্ছে 'ভালনারেবল' বা ঝুঁকিপূর্ণ, এরপর 'এনডেঞ্জারড' বা বিপন্ন। তার পরের ধাপ হচ্ছে 'ক্রিটিক্যালি এনডেঞ্জারড' বা মহাবিপন্ন, পরের ধাপে 'এক্সটিংক্ট ইন দ্য ওয়াইল্ড' অর্থাৎ প্রাকৃতিক পরিবেশে বিলুপ্ত' এবং শেষ ধাপ 'এক্সটিংক্ট' অর্থাৎ পরিবেশ থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে প্রাণী।
খেঁকশিয়ালের বাসস্থান কমে যাওয়া নিয়ে অধ্যাপক আজিজ বলেন, এরা একেবারেই পরিত্যক্ত জায়গায় থাকে। পুকুরপাড়, নদীরপাড়, কবরস্থান। খুব নিরিবিলি জায়গা পছন্দ করে।
"এরা শুষ্ক এলাকায়, পদ্মা ও যমুনার উপরের অংশে থাকে। হবিগঞ্জের একটা জায়গায় এখনও আছে। মূলত, গর্ত করার জন্য তারা বেলে দোঁয়াশ মাটি পছন্দ করে। তাই ওই জায়গাগুলোতে আছে। কুষ্টিয়ার দিকেও আগে ছিল। ফরিদপুর, কুমিল্লাতেও ছিল। এখন আর দেখা যায় না।" তিনি বলেন, খেঁকশিয়াল যে কমছে, তা স্পষ্ট। কিন্তু খেঁকশিয়াল কত আছে, তা জানা নেই।
আইইউসিএন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ম্যানেজার সারোয়ার আলম বলেন, খেঁকশিয়াল নিভৃতচারী, মানুষের সংস্পর্শে আসতে চায় না সেভাবে। এরা পরিবারকে বেশি প্রাধান্য দেয়।
"কিন্তু বাংলাদেশের একটু নিভৃতে থাকার মতো কোনো স্থান তাদের নাই। আগে জঙ্গল ছিল। এরা গভীর বনের প্রাণী না। ধরা যাক, পদ্মার কোনো চরের ঘাসবনে এরা থাকে। মানুষের চাপ এখন এত যে এদের থাকার জায়গায় নেই, তাই সংখ্যা কমছে," যোগ করেন তিনি।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের বন্য প্রাণী আইন অনুযায়ী সংরক্ষিত বন্য প্রাণী হিসেবে শিয়াল হত্যা করা বা এর মাংস খাওয়া ও বিক্রি করা দণ্ডনীয় বা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই, সংকটাপন্ন প্রাণী খেঁকশিয়ালের সুরক্ষার জন্য সরকার বাধ্য বলে মনে করেন তিনি।