শিরোনাম
◈ ২০৩০ সালে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির ওপর ৫% কার্বন কর আরোপ করবে ইইউ ◈ ব্যাংকঋণে শীর্ষে সরকার, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও সার খাতে বাড়বে ভর্তুকি ◈ ইরান যুদ্ধ ঠেকাতে মাঠে চীন-পাকিস্তান, ৫ দফা পরিকল্পনা প্রকাশ ◈ সংবিধান সংশোধন বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব ◈ সিঙ্গাপু‌রের কা‌ছে এক গো‌লে হে‌রে এশিয়ান কাপ বাছাই শেষ করলো বাংলাদেশ ◈ সংবিধান কি মনে করিয়ে দেয় এটা একাত্তরের পরাজয়ের দলিল? প্রশ্ন পার্থের ◈ গাজী আশরাফ লিপুর আনুষ্ঠানিকভাবে দা‌য়িত্ব শেষ হলো, এবার পা‌বেন সম্মাননা ◈ সাবেক খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম ক্যান্সার আক্রান্ত, চিকিৎসার আবেদন করেছেন তার আইনজীবী ◈ বিগত সরকারের দুর্নীতিতে স্থবির স্বাস্থ্যখাত, সেবা উন্নয়নে কাজ করছে সরকার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী ◈ জলবায়ু ট্রাস্টের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে : পরিবেশ মন্ত্রী

প্রকাশিত : ০১ এপ্রিল, ২০২৬, ০১:৪৯ রাত
আপডেট : ০১ এপ্রিল, ২০২৬, ০৪:০০ সকাল

প্রতিবেদক : মনজুর এ আজিজ

ব্যাংকঋণে শীর্ষে সরকার, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও সার খাতে বাড়বে ভর্তুকি

মনজুর এ আজিজ: দেশের অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোতে নাজুক সংকেত দেখা দিয়েছে। জাতীয় উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি বর্তমানে সাড়ে ৪ শতাংশে অবস্থান করছে। আমদানি বেড়েছে ৩.৯১ শতাংশ, তবে রফতানি গত আট মাস ধরে টানা নেতিবাচক প্রবণতা বজায় রেখেছে। ব্যাংক খাতে আমানতের বৃদ্ধি ১০ শতাংশে সীমাবদ্ধ অর্থাৎ নতুন বিনিয়োগের চেয়ে অর্থসংগ্রহ বেশি, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি করছে। এর মধ্যেও সরকার ঋণের হার বিপজ্জনকভাবে বেড়েছে।

গত বছরের জানুয়ারির তুলনায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে সরকারের ব্যাংক ঋণ প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে গেছে। একই সময়ে বেসরকারি খাতের ঋণ বৃদ্ধি মাত্র ৬ শতাংশ। অর্থাৎ সরকারি ঋণের বৃদ্ধি বেসরকারি খাতের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি ঋণের বৃদ্ধি ছিল ১৫ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সার খাতে ভর্তুকি বাড়বে। নতুন বিনিয়োগকে করবে বাধাগ্রস্ত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি শেষে সরকারের ব্যাংক ঋণের স্থিতি ছিল ৪ লাখ ৩৪ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের জানুয়ারি শেষে তা বেড়ে ৫ লাখ ৬৩ হাজার ১৯৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা বা ২৯.৬৬ শতাংশ। সরকারের ঋণ নেওয়ার আগ্রহ আরও তীব্র হচ্ছে। সাধারণত প্রতি সপ্তাহের রোববার ট্রেজারি বিল এবং মঙ্গলবার ট্রেজারি বন্ডের নিলাম অনুষ্ঠিত হয়।

তবে অর্থ সংকটে থাকা সরকার ১ এপ্রিলও ৯১ দিন মেয়াদি বিলের বিশেষ নিলাম ডেকেছে। সেই নিলামে ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে গত রোববার ২৯ মার্চ, ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে সরকার ৮ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল। এর মধ্যে ৯১ দিন মেয়াদি বিলের মাধ্যমে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করা হয়, যেখানে সুদহার ছিল ৯.৭৮ শতাংশ। ১৮২ দিন মেয়াদি বিল থেকে ২ হাজার ৫০০ কোটি এবং ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিল থেকে ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে, সুদহার যথাক্রমে ৯.৯৭ ও ১০ শতাংশ। এছাড়া, ১৫ ও ২০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের মাধ্যমে সরকার ২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে।

এর আগে ২৪ মার্চ ইসলামী বিনিয়োগ বন্ডের মাধ্যমে সরকার ২ হাজার ৩৮০ কোটি টাকার ঋণ সংগ্রহ করেছিল। অর্থনীতির এই সূচক ও ঋণ বৃদ্ধির ধারা উদ্বেগজনক, যা আগামী মাসগুলোতে বাজারে চাপ এবং সরকারি ব্যয় প্রণালীর ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও উদ্যোক্তাদের মতে, সরকারের রাজস্ব আদায় লক্ষ্য পূরণে অক্ষম। চলতি বছরের প্রথম অষ্টমাসে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ৭২ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে, বিদেশ থেকে নতুন ঋণ আসছে না। এই পরিস্থিতিতে সরকার তার ব্যয় চালানোর জন্য ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

ফলে সরকারি ঋণের বোঝা দ্রুত বাড়ছে। রাজস্ব আদায় স্থির থাকলেও সরকার নতুন প্রকল্প গ্রহণ করতে ছাড়ছে না। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি ঋণ মওকুফ এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে। ব্যাংক কর্মকর্তারাও নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সরকারের ঋণ দিতে বেশি উৎসাহী। এর ফলে দেশের বেসরকারি খাত ঋণ পেতে আরো বেশি সংকটে পড়ছে। 
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের বাজেটের ওপর নির্বাচিত সরকারে কোনো পরিবর্তন আনেনি। ব্যয় সংক্রান্ত কোনো কাটছাঁট হয়নি। সরকারের সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে, নতুন প্রকল্পও নেওয়া হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সার খাতে ভর্তুকি বাড়বে। তাছাড়া সরকারের রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী হচ্ছে না। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকেও নতুন ঋণ সম্ভব নয়। তাই ব্যাংক ঋণ নেওয়াই সরকারকে সহজ বিকল্প হিসেবে মনে হচ্ছে। দেশের বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি কয়েক বছর ধরে সীমিত। তিনি বলেন, এখন ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬ শতাংশের ঘরে। স্থিতিশীল সরকার এসেছে, কিন্তু বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকট নতুন বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে। তবে বেসরকারি খাত যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটা বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে। কারণ দেশের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের মূল চালিকা শক্তি হলো বেসরকারি খাত।

কয়েক বছর ধরে দেশের অর্থনীতি নানা সংকটে রয়েছে। প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে স্থবিরতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি বৃদ্ধি ছিল মাত্র ৩.৪৯ শতাংশ, বিপরীতে মূল্যস্ফীতির হার দুই অংকের ঘরে। সর্বশেষ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯.১৩ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রফতানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক। জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে রফতানি ৩.১৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। একই সময়ে আমদানি ৪ শতাংশের নিচে।

অর্থনীতির ইতিবাচক সূচক কেবল রেমিটেন্স প্রবাহ, যা প্রায় ১৯ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ সামষ্টিক অর্থনীতির সব সূচকের মধ্যে সরকারি ঋণ বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি ঋণ বেড়েছিল ১৪.৯০ শতাংশ। চলতি বছরের জানুয়ারির সঙ্গে তুলনা করলে এক বছরের ব্যবধানে ঋণ বৃদ্ধি প্রায় দ্বিগুণ, ২৯.৬৬ শতাংশে। একই সময়ে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬.০৩ শতাংশ।

অর্থ বিভাগের তথ্যানুসারে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারের লক্ষ্য ২ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকার ঋণ গ্রহণ। এর মধ্যে স্থানীয় উৎস থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি, বিদেশি উৎস থেকে ৯৬ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে দেশী-বিদেশী মিলিয়ে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা রয়েছে। রাজস্ব আহরণ কম হওয়ায় ব্যয় চালানোর কিছু অংশ ও পূর্বের ঋণ শোধ করতে ঋণ নিতে হচ্ছে। 

সরকারের ঋণ পরিশোধ পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১ লাখ ৭৫ হাজার কোটি, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ১.৫ লাখ কোটি টাকার ঋণ শোধ করতে হবে। সঙ্গে রয়েছে ঋণের সুদও। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারের সুদ পরিশোধ ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বর্তমান সরকারকে বড় চ্যালেঞ্জে ফেলেছে। এই ধারা চললে ঋণের পরিমাণ ও সুদ উভয়ই আরও বাড়বে। অর্থনীতিবিদদের মতে, চলতি অর্থবছরে সরকারের ঋণ ৩ লাখ কোটি টাকার ঘরে পৌঁছাতে পারে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, সরকারি ঋণ উৎপাদনশীল নয়। বেসরকারি খাতে ঋণ গেলে তা নতুন পণ্য উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। কিন্তু সরকারি ঋণ দিয়ে শুধুই পরিচালন ব্যয় চলে। ট্রেজারি বিলের সুদ ১০ শতাংশের নিচে নেমেছে। ব্যাংক ১০ শতাংশের বেশি সুদে আমানত সংগ্রহ করছে। এতে সরকারি ঋণ বিনিয়োগে আমাদেরও বেশি মুনাফা হয় না।

তিনি আরও বলেন, সরকার খাল খননসহ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করছে। এই মুহূর্তে দেশের অর্থনীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতি নাজুক। জ্বালানি সংকট তীব্র। মূল্যস্ফীতি উচ্চ। তাই প্রতিটি কর্মসূচি সতর্কতার সঙ্গে নিতে হবে, নাহলে অর্থনীতি আরও বিপদের মুখে পড়বে। দেশী ও বিদেশী উৎস থেকে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের মোট ঋণ স্থিতি প্রায় ২৩.৫ লাখ কোটি টাকা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় বিপুল ঋণের বোঝা পেয়েছে। 

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, ব্যাংক খাতের বেশির ভাগ আমানতই সরকার দখল করছে। সরকার বাজেটে ঘোষিত লক্ষ্যের চেয়ে বেশি ঋণ ব্যাংক থেকে নিচ্ছে। ফলে বেসরকারি খাত ঋণবঞ্চিত হচ্ছে। সরকারের ঋণ চাহিদা বেশি হওয়ার কারণে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার বৃদ্ধি পেয়েছে। বেসরকারি খাতের ঋণের সুদও বেড়ে ১৪-১৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এমন সুদে ব্যবসা চালানো উদ্যোক্তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এই স্থবিরতা দীর্ঘায়িত হলে দেশের অর্থনীতি আরও বড় সংকটে পড়বে। 

এ প্রসঙ্গে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পূর্বে জানিয়েছিলেন, উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা যে অর্থনীতি পেয়েছি, সব সূচকই নিম্নমুখী। তাই অর্থ সাশ্রয়ের উদ্যোগ নিয়েছি। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, কর ফাঁকি ও দুর্নীতি রোধ করা হচ্ছে। যে প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর কার্যকারিতা, রিটার্ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়