নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশ গার্মেন্টস বায়িং হাউস এসোসিয়েশন (বিজিবিএইচএ) দেশের রপ্তানীমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্য সংগঠন বর্তমানে গভীর সাংগঠনিক সংকটের মুখে পড়েছে। বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটির বিরুদ্ধে সংঘবিধি লঙ্ঘন, প্রচলিত আইন অমান্য, সাধারণ সদস্যদের মতামত উপেক্ষা এবং সর্বোপরি মাননীয় হাইকোর্টের আদেশ অমান্য করে একতরফা নির্বাচন আয়োজনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
এই প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির সাধারণ সদস্যদের একটি বড় অংশ বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘আইনের শাসন ও সাংগঠনিক গণতন্ত্রের ওপর সরাসরি আঘাত’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ তারিখে বাংলাদেশ গার্মেন্টস বায়িং হাউস এসোসিয়েশনের সর্বশেষ দ্বি-বার্ষিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ‘বায়ার’স কাউন্সিল’ প্যানেল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও নির্বাচনের পর ওই প্যানেল থেকে নির্বাচিত কয়েকজন সদস্য হঠাৎ পক্ষ ত্যাগ করেন। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও তারা কার্যনির্বাহী পরিষদ গঠনে ব্যর্থ হয়।
সাধারণ সদস্যদের অভিযোগ, এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে একটি নির্দিষ্ট মহল সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে এবং ধাপে ধাপে সংঘবিধি উপেক্ষা করে স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথে অগ্রসর হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সংঘবিধি অনুযায়ী এসোসিয়েশনের নিবন্ধন ফি ছিল ৩০ হাজার টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন ফি ছিল ৫ হাজার টাকা। কিন্তু বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটি গত ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে একটি বিতর্কিত এক্সট্রা-অর্ডিনারি জেনারেল মিটিং (ইজিএম) আহ্বান করে সেখানে নিবন্ধন ফি ৫০ হাজার টাকা ও বার্ষিক নবায়ন ফি ১০ হাজার টাকা
নির্ধারণ করা হয়।
অভিযোগ করা হয়, সাধারণ সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলেও তা উপেক্ষা করা হয়। এমনকি অনুপস্থিত সদস্যদের স্বাক্ষর জাল করে ইজিএমে সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়েছে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। পরে ১০ জানুয়ারি ২০২৫ থেকে কোনো সরকারি অনুমোদন ছাড়াই বর্ধিত হারে ফি আদায় শুরু করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা স্মরণ করিয়ে দেন, ২০২২ সালের বাণিজ্য সংগঠন আইন ও ২০২৫ সালের বাণিজ্য সংগঠন বিধি অনুযায়ী ইজিএমে গৃহীত যেকোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর করার আগে তা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য জমা দিতে হয়। এরপর বাণিজ্য সংগঠনের মহাপরিচালক, জয়েন্ট স্টক কোম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধকের প্রতিনিধি
সংশ্লিষ্ট এসোসিয়েশনের প্রতিনিধি এই তিন পক্ষের সমন্বয়ে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের মাধ্যমে অনুমোদনের পরই সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার কথা। কিন্তু এসব আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই ফি আদায় শুরু করা হয়েছে, যা আইনগতভাবে সম্পূর্ণ অবৈধ বলে দাবি করেন বক্তারা।
এই অনিয়ম বন্ধে প্রথমে বাণিজ্য সংগঠনের মহাপরিচালকের কাছে আবেদন করা হয়। সেখান থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না পাওয়ায় বিষয়টি বাণিজ্য সচিবের কাছে আপিল আকারে উপস্থাপন করা হয়। সংবাদ সম্মেলন পর্যন্ত সেই আপিলের কোনো নিষ্পত্তি হয়নি বলেও জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, বর্ধিত ফি আদায়কে কেন্দ্র করে নির্বাচন বোর্ড ঘোষণা দেয়, বাড়তি ফি পরিশোধ না করলে কেউ ভোটার হতে পারবেন না। এতে নির্বাচন বোর্ড বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটির চাপে কাজ করেছে এবং ‘পুতুলের মতো আচরণ করেছে’ বলে অভিযোগ ওঠে। ফলে সাধারণ সদস্যদের বড় একটি অংশ নির্বাচন বর্জনে বাধ্য হন।
এই পরিস্থিতিতে সাধারণ সদস্যদের পক্ষে কাজী ইফতেখার হোসেন স্বত্বাধিকারী, টোটাল এপ্যারেলস এবং বাংলাদেশ গার্মেন্টস বায়িং হাউস এসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। রিট নম্বর: ২১৭৪৯/২০২৫। মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগ ৮ জানুয়ারি ২০২৬ বিস্তারিত শুনানি শেষে ১০ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখের নির্বাচন স্থগিতের আদেশ প্রদান করেন। এই আদেশের অনুলিপি নির্বাচন বোর্ড, আপিল বোর্ড, কার্যনির্বাহী কমিটি, বাণিজ্য সচিব ও বাণিজ্য সংগঠনের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের কাছে পাঠানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ ওঠে হাইকোর্টের স্পষ্ট আদেশ থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন বোর্ড ১০ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে একতরফাভাবে ও প্রতিযোগিতাবিহীন নির্বাচন সম্পন্ন করে।
আইনজ্ঞদের মতে, এটি সরাসরি আদালত অবমাননার শামিল এবং একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে আদালত অবমাননার মামলা দায়ের করা হয়েছে বলেও জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনের শেষাংশে বক্তারা আদালত ও সরকারের কাছে তিনটি সুস্পষ্ট দাবি জানান, সংঘবিধি ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী সকল অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত, আদালতের আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং ২০২২ সালের বাণিজ্য সংগঠন আইন ও ২০২৫ সালের বিধি অনুসরণ করে একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করা। সংবাদ সম্মেলনে অ্যাসোসিয়েশনের অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।