মহসিন কবির: রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অর্জন করা কঠিন। অর্থনীতিকে সচল রাখতে সহিংস কর্মসূচি থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
রাজনীতির মাঠ শান্ত থাকলে বিনিয়োগ ও রপ্তানিতে গতি ফিরবে, দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের আস্থা বাড়বে এবং উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের চাকা অনেক বেশি সচল হবে। এমন আশাবাদ অর্থনীতিবিদ ও শিল্পোদ্যোক্তাদের।
তাদের মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে নির্বাচনের পরই অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে, বিদেশি ক্রেতাদের মনে ফিরবে স্বস্তি, আর দীর্ঘদিনের সংকটে পড়া শিল্প খাত ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠতে পারবে স্থবিরতা।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা আবাসিক মিশনের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেছেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা কাটতে শুরু হয়েছে, এটা ভালো দিক। এত দিন ধরে যে শঙ্কা-উদ্বেগ ছিল, সেটা কাটতে শুরু করেছে।
তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে ও পরে রাজনৈতিক পরিবেশ ভালো থাকলে চলতি বছর নির্বাচনের পরে দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশাবাদী। এক্ষেত্রে নির্বাচনের পর যারাই বিরোধী দলে যাবেন, সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে তাদেরও। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংস্কারের বিষয়ে অনেক এগিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কমিশন গঠন করা হয়েছে এবং তারা সুপারিশ ও পরামর্শ দিয়েছেন। যারাই সরকার গঠন করবেন, তাদের জন্য এসব সুপারিশ কাজে আসবে। তবে সরকার কতটা বাস্তবায়ন করবে, সেটাই দেখার বিষয়।
রপ্তানিকারক শিল্পমালিকদের সংগঠন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইএবি) ও নিট পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম গণমাধ্যমকে বলেন, দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে বিদেশি ক্রেতাদের মনে স্বস্তি ফিরবে। তারা স্বাচ্ছন্দ্যে অর্ডার দিতে পারবেন। দেশে নতুন নতুন বিনিয়োগ আসবে; শিল্পকারখানা স্থাপন হবে। উৎপাদনও বাড়বে।
এদিকে নানা সংকটের কারণে দেশের অন্তত ৫০টি টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল। নিজেরও একটি কটন মিল বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানান তিনি। সম্প্রতি এক মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, এখন ব্যবসায় সংকট, অর্থনীতিতে সংকট, রাজনীতিতে সংকট। ভারতের সুতা বাংলাদেশে ডাম্পিং হচ্ছে ৩০ সেন্ট কম মূল্যে। এরই মধ্যে ৫০টি মিল বন্ধ হয়ে গেছে। এতে ২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হারিয়েছে দেশ। চাইলেই বন্ধ হওয়া মিলগুলো চালু করা যাবে না। এ খাত নিয়ে বিগত ২০ মাসে সরকারের কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাসহ নানা কারণে গত দেড় বছরে সাভার, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে মোট ৩৫৩টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ১ লাখ ১৯ হাজার ৮৪২ জন শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে সাভারে। এখানে ২১৪টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ১২২টি স্থায়ীভাবে ও ৯২টি অস্থায়ীভাবে। প্রায় ৩১ হাজার শ্রমিক এখানে কাজ হারিয়েছেন, যার মধ্যে ছেইন অ্যাপারেলস, জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশন ও সাফওয়ান আউটারওয়্যারের মতো বড় কারখানাও রয়েছে।
গাজীপুরে ৭২টি কারখানা বন্ধ হয়ে ৭৩ হাজারেরও বেশি শ্রমিক বেকার হয়েছেন। এখানে বেক্সিমকো গ্রুপের ১৩টি পোশাক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার বিষয়টি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা দিয়েছে। পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সূত্রে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান (বাবলু) বলেছেন, দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে অর্থনীতির আকাশের কালো মেঘ কেটে যাবে বলে আশা করা যায়। তিনি বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা খুবই প্রয়োজন।
রাজনৈতিক সংকট কেটে যাওয়ার নেপথ্যে মূল ভূমিকা রেখেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এমন দাবি করেছেন নিট পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান।
তিনি বলেন, তারেক রহমান দেশে ফিরেই সব রাজনৈতিক দলের শীর্ষনেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। এমনকি যারা সারা দিন তার সমালোচনা করেন, তাদের নিয়েও বৈঠক করেছেন। তিনি যে সহনশীল রাজনীতি চান, তা সবার কাছে স্পষ্ট হয়েছে। তার এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। তিনি বলেন, দেশের ব্যবসা পরিচালনার প্রধান শর্তই হচ্ছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। দেশে অস্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করলে কেউ ব্যবসা করতে পারেন না। এমনকি বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার নিয়ে আসেন না। বিনিয়োগ বাড়ে না। কর্মসংস্থানও বাড়ে না। বর্তমান সংকটকালে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা খুবই প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।
প্রসঙ্গত, ইতোমধ্যে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। এটিও ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থিতিশীলতা ও গতিশীলতা আনয়নে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্পের সরকারের শুল্কনীতি প্রণয়নের পর বাংলাদেশের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। নেতিবাচক ধারা এখনও অব্যাহত রয়েছে। সদ্যবিদায়ী ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ নেমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা ২০২৪ সালের একই সময়ে ছিল ৪ দশমিক ৬২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
গত রবিবার রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ কমেছে।