এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার : সুন্দরবনের উপকূলঘেঁষা বাগেরহাটের আমনখেতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। ধান রক্ষায় পোকা দমনে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলছে কীটনাশক ছিটানোর কাজ। কিন্তু এই কাজে কৃষকদের বড় একটি অংশের নেই ন্যূনতম ব্যক্তিগত সুরক্ষা। কারও পিঠে, কারও কাঁধে ঝোলানো স্প্রে মেশিন; পরনে হাফহাতা গেঞ্জি ও লুঙ্গি। পায়ে নেই গামবুট, হাতে গ্লাভস, চোখে সুরক্ষাচশমা কিংবা মুখে মাস্ক।
বাতাসের গতিপথ বিবেচনা না করে অনেকেই সরাসরি ধানগাছের ওপর কীটনাশক ছিটাচ্ছেন। ফলে বাতাসে ভেসে আসা রাসায়নিকের কণা লাগছে চোখ, মুখ ও শরীরের খোলা অংশে। কাজ শেষে হাত-মুখ ধোয়া, পোশাক পরিষ্কার করা কিংবা দূষিত পোশাক আলাদা রাখার ক্ষেত্রেও অনেকের রয়েছে উদাসীনতা। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে কীটনাশক ব্যবহারের কারণে কৃষকদের মধ্যে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি—এমন আশঙ্কা করছেন কৃষি ও স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা।
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ, শরণখোলাসহ জেলার নয় উপজেলার বিভিন্ন এলাকার আমনখেত ঘুরে দেখা গেছে, প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ছাড়াই কীটনাশক প্রয়োগের এমন চিত্র। কৃষকদের কেউ কোমরে স্প্রে মেশিন বেঁধে, কেউ কাঁধে ঝুলিয়ে জমিতে বিষ ছিটাচ্ছেন। অধিকাংশের পরনে হাফহাতা গেঞ্জি ও লুঙ্গি। কারও মুখে মাস্ক নেই, চোখে নেই চশমা। হাতে গ্লাভস কিংবা পায়ে গামবুটও দেখা যায়নি।
কীটনাশক ছিটানোর সময় বাতাসের বিপরীতে দাঁড়ানো কিংবা বাতাসের গতি ও দিক বিবেচনা না করার কারণে স্প্রে করা রাসায়নিক সরাসরি কৃষকের শরীরেও এসে পড়ছে। অথচ অনেক কৃষকই জানেন না, কীটনাশকের সংস্পর্শে আসার তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই। আবার কেউ কেউ বিষয়টি জানলেও দীর্ঘদিনের অভ্যাসের কারণে তা মানছেন না। এখন পর্যন্ত বড় ধরনের সমস্যায় পড়েননি—এমন ধারণা থেকেও অনেকে ঝুঁকিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
মোরেলগঞ্জ উপজেলার কাঠালতলা গ্রামের কৃষক মোয়াজ্জেল হোসেন বলেন, দীর্ঘ সময় ধানখেতে কীটনাশক স্প্রে করলে তাঁর চোখ ও মুখ জ্বালাপোড়া করে। রাতে কাশিও হয়। তবে এসব কীটনাশকের প্রভাবে হচ্ছে কি না, তা তিনি জানেন না।
শরণখোলা উপজেলার রাজাপুর গ্রামের কৃষক মুক্তা হাওলাদার ও সলিম খান বলেন, তাঁরা সাধারণত এভাবেই কীটনাশক ছিটান। মাঝেমধ্যে হাত ও চোখ-মুখ জ্বালাপোড়া করলে পানি দিয়ে ধুয়ে নেন। পরে ঠিক হয়ে যায়। এখন পর্যন্ত বড় কোনো ক্ষতি হয়নি বলেই তাঁরা বিষয়টিকে গুরুতর মনে করেন না।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, রোগবালাই ও পোকার ধরন অনুযায়ী সঠিক কীটনাশক নির্বাচন, নির্ধারিত মাত্রায় প্রয়োগ এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষার বিষয়ে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এরপরও অনেক কৃষক নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করছেন না। এতে একদিকে যেমন তাঁদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত ও অপরিকল্পিত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটি, পানি ও পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
মোরেলগঞ্জ বাজারের কীটনাশক ব্যবসায়ী সুকদেব হালদার, কামরুজ্জামান মিন্টু ও হেমায়েত হোসেন হিমু বলেন, কৃষকরা কীটনাশক কিনতে এলে তাঁরা নিয়ম মেনে ব্যবহারের পরামর্শ দেন। বোতল ও প্যাকেটের গায়েও ব্যবহারের মাত্রা, প্রয়োগবিধি এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতার কথা লেখা থাকে। সেগুলো অনুসরণ করতে কৃষকদের বলা হয়।
মোরেলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, কৃষকদের কীটনাশক ব্যবহারে সচেতন করতে গ্রামে গ্রামে মাঠ সমাবেশ করা হয়। ফসল ও পোকার ধরন অনুযায়ী কীটনাশক নির্বাচন, সঠিক মাত্রা এবং প্রয়োগের নিয়ম হাতে-কলমে শেখানো হয়। কীটনাশক ব্যবহারের সময় প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহারের পরামর্শও দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, বারবার সচেতন করা হলেও অনেকে নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করছেন না। ফলে তাঁদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ফসল রক্ষায় রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা কমাতে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বা আইপিএম (Integrated Pest Management) পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, আইপিএম পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ানো গেলে অতিরিক্ত রাসায়নিক কীটনাশকের প্রয়োগ কমানো সম্ভব। এতে মাটি ও পানির গুণগত মান বজায় রাখার পাশাপাশি ফসলের জন্য উপকারী কীটপতঙ্গ ও পরিবেশও সুরক্ষিত থাকবে।
মোরেলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সাবেক ডা. কামাল হোসেন মুফতি বলেন, সুরক্ষা ছাড়া খোলামেলাভাবে কীটনাশক ব্যবহার মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। কীটনাশকের বিষাক্ত উপাদান স্পর্শ ও শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এর ফলে চোখ, ত্বক ও মুখে জ্বালাপোড়া, বমি ও কাশিসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তিনি বলেন, কীটনাশক ব্যবহারের সময় সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। কোনো ধরনের অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
কৃষি ও স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের মতে, ফসল রক্ষায় কীটনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন থাকলেও কৃষকের নিজের সুরক্ষাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। স্প্রে করার সময় গ্লাভস, মাস্ক, সুরক্ষাচশমা, গামবুট ও শরীর ঢাকা পোশাক ব্যবহার, বাতাসের বিপরীত দিকে স্প্রে না করা এবং কাজ শেষে শরীর ও ব্যবহৃত পোশাক ভালোভাবে পরিষ্কার করার মতো মৌলিক নিয়মগুলো মানা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষকের স্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য ও পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিও একই সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। তাই মাঠপর্যায়ে শুধু কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শ নয়, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং আইপিএমভিত্তিক চাষাবাদে কৃষকদের আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার উদ্যোগ প্রয়োজন।