শিরোনাম
◈ ‘হেলিকপ্টারে পালাবেন, নাকি সম্মানের সঙ্গে পদত্যাগ করবেন’ : তারেক রহমানের উদ্দেশ্যে নাহিদ ইসলাম ◈ ‌কোচ জিদানের প্রথম ফ্রান্স দলে ৫ নতুন মুখ ◈ ইউনিয়ন বার্লিনের জা‌লে বায়ার্ন মিউনি‌খের ৭ গোল, হ‌্যা‌রি কেইনের রেকর্ড ◈ ইং‌লিশ লি‌গে চেলসিকে উড়ি‌য়ে দি‌লো ব্রেন্টফোর্ড ◈ বাংলাদেশসহ ২১১ সদস্যকে ১২৩ কোটি টাকা করে দেওয়ার দাবিতে ইনফান্তিনোকে উয়েফা-কনকাকাফের চিঠি ◈ রূপপুরের প্রথম ইউনিটের কাজ শেষ, বিশ্ব পারমাণবিক শক্তির জগতে বাংলাদেশ ◈ জামায়াতের নেতৃত্বে ১১ দলের ঢাকা-রংপুর লংমার্চ শুরু ◈ বিদেশে জনশক্তি রপ্তানিতে ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস, ১৭ দিনে পাড়ি ৪০ হাজার ৫৯৩ জনের ◈ টানা ৬ ঘণ্টা শনিবার বিদ্যুৎ থাকবে না যেসব এলাকায় ◈ রাজধানীর একাধিক স্থানে ককটেল বিস্ফোরণের পর এবার বাসে আগুন (ভিডিও)

প্রকাশিত : ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৩৭ দুপুর
আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:১৫ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

শখ থেকে লাখ টাকার ব্যবসা, নওগাঁয় লেমন গ্রাস চাষে নতুন সম্ভাবনা

ধানের পাতার মতো দেখতে ঘাস। কাছে গেলেই নাকে লাগে লেবুর সুবাস। এর নাম লেমন গ্রাস বা লেবু ঘাস। একসময় থাই স্যুপের উপকরণ হিসেবে পরিচিত এই ঘাস এখন ব্যবহৃত হচ্ছে ভেষজ চা, নানা ধরনের পানীয়, প্রসাধনী ও সুগন্ধি তৈরিতে।

নওগাঁর সাপাহার উপজেলার বরেন্দ্র অ্যাগ্রো পার্কে বাণিজ্যিকভাবে লেমন গ্রাস চাষ করছেন সোহেল রানা নামে এক উদ্যোক্তা। বাড়ি উপজেলার গোডাউনপাড়া এলাকায়। শখের বশে শুরু করেন। তবে এখন এটি তাঁর ব্যবসার অংশ। তাজা পাতা ও ডাঁটা বিক্রি করেন। পাশাপাশি আধুনিক স্মার্ট ড্রায়ারে শুকিয়ে বাজারজাত করছেন লেবু ঘাস। তাঁর কাছ থেকে চারা নিচ্ছেন অন্য কৃষক ও উদ্যোক্তারাও।
স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের আগ্রহ এবং ভেষজ পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে লেমন গ্রাস চাষেও সম্ভাবনা দেখছেন 

advertisement

৩কৃষি কর্মকর্তারা। তাদের মতে, পরিকল্পিত চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ বাড়ানো গেলে এটি উত্তরাঞ্চলের কৃষিতে নতুন অর্থকরী ফসল হয়ে উঠতে পারে।

শখ থেকে বাণিজ্যিক উদ্যোগ

advertisement

সোহেল রানা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যানে স্নাতকসহ (সম্মান) স্নাতকোত্তর পাস করেন। এরপর রাজধানীতে যান। সেখানে কিছুদিন একটি জাতীয় দৈনিকে কাজ করেন; কিন্তু মনে টেকেনি। তিনি স্বপ্ন দেখতেন, একজন উদ্যোক্তা হবেন। এ জন্যই ফিরে আসেন নওগাঁয়। আমবাগান করেন। তাঁর লেমন গ্রাস চাষের শুরু ২০১৫ সালে। ঢাকার একটি হর্টিকালচার সেন্টার থেকে কয়েকটি চারা সংগ্রহ করে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুরু করেছিলেন। পরে ইউটিউব দেখে এবং কৃষি বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে চাষের পরিসর বাড়ান।

এখন সোহেল রানার উদ্যোগে উৎপাদিত লেবু ঘাসের পাতা ও ডাঁটা বিক্রি হচ্ছে তাজা অবস্থায়। পাশাপাশি স্মার্ট ড্রায়ারে শুকিয়ে তৈরি করছেন শুকনো পাতা, যা দিয়ে সহজেই ভেষজ চা তৈরি করা যায়।

advertisement

সোহেল রানা বলেন, ‘প্রথম দিকে আমার এলাকার লোকজন এই ঘাস চিনত না। এখন অনেকেই এর ব্যবহার সম্পর্কে জানেন। অনেকে আমাদের কাছ থেকে কাঁচা ও শুকনো ঘাস সংগ্রহ করছেন। চাহিদা থাকায় চারা বিক্রিও হচ্ছে। ভবিষ্যতে লেমন গ্রাস থেকে এসেনশিয়াল অয়েল উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।’

একবার রোপণে কয়েক বছর

এই লেবু ঘাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, একবার রোপণ করার পর কয়েক বছর পর্যন্ত নিয়মিত পাতা সংগ্রহ করা যায়। কৃষি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এ ফসলে রোগবালাই তুলনামূলক কম হওয়ায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের প্রয়োজনও কম। এতে উৎপাদন খরচ কম রাখার সুযোগ রয়েছে।

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, ‘লেমন গ্রাস একটি সম্ভাবনাময় উচ্চমূল্যের ভেষজ ফসল। একবার রোপণ করলে কয়েক বছর উৎপাদন পাওয়া যায়। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার তুলনামূলক কম হওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও কম হতে পারে।’
মনজুর রহমান বলেন, ভেষজ চা, প্রসাধনী ও এসেনশিয়াল অয়েলের বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে চাষ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের সুযোগ বাড়ানো গেলে নওগাঁসহ উত্তরাঞ্চলে লেমন গ্রাস নতুন অর্থকরী ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। ভবিষ্যতে রপ্তানিরও সুযোগ রয়েছে।

রান্নাঘর ছাড়িয়ে প্রসাধনীতে

লেমন গ্রাসের ব্যবহার এখন আর রান্নাঘরে সীমাবদ্ধ নেই। চা, হারবাল ড্রিংক, এসেনশিয়াল অয়েল, সাবান, সুগন্ধি, ডিটারজেন্ট, প্রসাধনী, হেয়ার টনিক ও অ্যারোমাথেরাপির বিভিন্ন পণ্যে এ ঘাসের ব্যবহার রয়েছে। ভেষজ পণ্য তৈরিতেও এটি ব্যবহৃত হয়।

থাইল্যান্ড, জাপান, চীনসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে লেমন গ্রাসের ব্যবহার দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশেও স্বাস্থ্যকর পানীয় ও প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি পণ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ায় এর বাজার তৈরি হচ্ছে।

চায়ে স্বস্তি, তবে সতর্কতাও

লেমন গ্রাসে সিট্রালসহ কিছু সুগন্ধি যৌগ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহনাশক উপাদান রয়েছে। এ কারণে ভেষজ চা হিসেবে এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। হজমে সহায়তা, পেটের অস্বস্তি কমানো কিংবা মানসিক চাপ প্রশমনে এর সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে গবেষণাও হয়েছে। তবে এসব উপকারিতা নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

লেমন গ্রাসের চা কোনো রোগের নিশ্চিত চিকিৎসা নয়। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে পরিমিত পরিমাণে পান করা যেতে পারে। নওগাঁ সরকারি মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. আবুজার গাফ্ফার বলেন, লেমন গ্রাস একটি উপকারী ভেষজ উদ্ভিদ। এতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহনাশক উপাদান রয়েছে, যা শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে। তবে এটিকে কোনো রোগের ওষুধ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।

ডা. গাফ্ফার আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং নিয়মিত ওষুধ সেবনকারীদের নিয়মিতভাবে লেমন গ্রাসের চা পান করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রাকৃতিক উপাদান হলেই তা সীমাহীন পরিমাণে নিরাপদ– এমন ধারণা ঠিক নয়।

বাজারে বাড়ছে আগ্রহ

সোহেল রানার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ২৫০ গ্রাম তাজা লেমন গ্রাস বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১০০ থেকে ১৩০ টাকায়। ১০০ গ্রাম শুকনো লেমন গ্রাসের দাম ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। প্রতিটি চারা বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকায়।

তবে দাম ও চাহিদা অঞ্চল, মান, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাজারজাতকরণের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু চাষ করলেই সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে না। মানসম্মত চারা উৎপাদন, শুকানোর আধুনিক ব্যবস্থা, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কৃষক, উদ্যোক্তা ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।

বরেন্দ্র অঞ্চলে নতুন সম্ভাবনা

বরেন্দ্র অঞ্চলে কৃষির বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো পানি ও উৎপাদন খরচ। এ অবস্থায় কম খরচে চাষযোগ্য এবং বহুমুখী ব্যবহার রয়েছে– এমন ফসলের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। লেমন গ্রাস তাই নতুন সম্ভাবনা।

সোহেল রানার উদ্যোগ দেখাচ্ছে, নতুন কোনো ফসলের চাষ শুধু জমিতে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে উদ্যোক্তার কাজের পরিসর বাড়ে। তাজা পাতা, শুকনো পাতা, চারা কিংবা ভবিষ্যতে এসেনশিয়াল অয়েল; একটি ফসলকে ঘিরে তৈরি হতে পারে একাধিক পণ্যের বাজার।

নওগাঁর বরেন্দ্র অঞ্চলে লেমন গ্রাসের চাষ এখনও বড় পরিসরে হয়নি। তবে চাহিদা, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারের সুযোগ বাড়ানো গেলে এই সুগন্ধি ঘাস কৃষকের জন্য নতুন আয়ের পথ খুলে দিতে পারে। সেখানেই লেবু ঘাসের সম্ভাবনার হাতছানি। 

সূত্র: সমকাল