শিরোনাম
◈ সড়ক আইন ভাঙলে যাত্রী-পথচারীকেও জরিমানা, আসছে নতুন আইন ◈ শুক্রবার থেকে এমপিও শিক্ষকদের বদলির আবেদন, চলবে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত ◈ অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে নতুন উদ্যোগ, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কর্মী পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে করার উদ্যোগ ◈ চোরাচালান ও আটক পণ্য নিষ্পত্তিতে এনবিআরের নতুন আদেশ জারি ◈ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি কেউ, ভোট বৃহস্পতিবার: ইসি সচিব ◈ সমাজের সবাই এগিয়ে এলে অনেক বড় সমস্যার সমাধান করা সম্ভব: প্রধানমন্ত্রী ◈ সরকার কেন পাল্টালো অর্থবছরের সময়কাল, কি সুবিধা মিলবে? ◈ সরকারি চাকরি জনগণের সেবা করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ: আইনমন্ত্রী ◈ কোন-কোন রুটে চলবে পিংক বাস, ভাড়া কত ◈ ঘরে বসেই করুন ই-নামজারি, আবেদন পদ্ধতি ও খরচ জানুন

প্রকাশিত : ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ০৭:৩৭ বিকাল
আপডেট : ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ০৮:২১ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

৫ টাকায়ও ক্রেতা নেই : গাজীপুরে গাছেই নষ্ট হচ্ছে কাঁঠাল, লোকসানে চাষিরা

গাজীপুরের বাগানগুলোতে প্রচুর পাকা কাঁঠাল থাকলেও সেগুলো বিক্রি হচ্ছে না। একদিকে চাহিদা কম, অন্যদিকে পরিবহন খরচ বেশি হওয়ায় বাগানেই পচে নষ্ট হচ্ছে কাঁঠাল। এতে লাভের বদলে লোকসান গুনতে হচ্ছে চাষিদের।

‘২০০০ সালেও একবার কাঁঠালের দাম অনেক কমে গিয়েছিল। তখনও হাজারখানেক কাঁঠাল বিক্রি করে আমি কিছু টাকা জমাতে পেরেছিলাম। এরপর গত ২৫ বছর বাজার মোটামুটি ভালোই ছিল,’ বলছিলেন গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার খোদাদিয়া গ্রামের সত্তরোর্ধ্ব কৃষক মোতাহার হোসেন মুন্তু।

তিনি ছোটবেলা থেকেই কাঁঠালের ব্যবসার সাথে যুক্ত। এই কৃষক আক্ষেপ করে বলেন, ‘কিন্তু এই মৌসুমে আমি কাঁঠাল বিক্রিই করতে পারছি না। এমনকি আমার নিজের গাছের কাঁঠালগুলোও পেকে পেকে মাটিতে ঝরে পড়ছে।’

তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে নতুন করে কোনো গাছ লাগানো বা বাগান কেনার আর কোনো ইচ্ছে তার নেই। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘এ বছরই শেষ।’

শুধু কাপাসিয়া নয়, গাজীপুরের বিভিন্ন জায়গায় এখন এই একই সমস্যা দেখা যাচ্ছে।

ঢাকা-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের বরহর বাজারে সড়কের পাশে তিনটি কাঁঠাল নিয়ে বসেছিলেন আলাউদ্দিন (৬৫)। সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেও বিক্রি হয়নি। তিনিও জানালেন আক্ষেপের কথা।

উপজেলার বেলাশী গ্রামের মোস্তফা মিয়া বলেন, ‘আমার ৩০ টি কাঁঠাল গাছ আছে।  প্রতি বছর অন্তত তিন থেকে চার হাজার টাকা কাঁঠাল বিক্রি করতে পারি। এবার ১০০ পিস কাঁঠাল ৫ টাকা করে দাম বলেছিল, বিক্রি করিনি, গরুকে খাইয়েছি। অথচ গত বছরও একই কাঁঠাল ২০-৩০ টাকা করে বিক্রি করেছি।’

মৌসুমের শেষ দিকে এসে পরিস্থিতি কিছুটা পাল্টেছে। বাজারে কাঁঠালের পরিমাণ কমে আসায় দাম এখন সামান্য বেড়েছে।

মোস্তফা বলেন, ‘তবে গত সপ্তাহে কোঠামনি বাজারের মসজিদে সামনে পাচটি গাছের কাঁঠাল মোটামুটি ভালো দামে বিক্রি হয়েছে। মৌসুম শেষের দিকে দাম কিছুটা বেড়েছে।’

বাড়তি দামে বিক্রির আশায় অনেকেই গাছে কাঁঠাল রেখে দিচ্ছেন। এমনকি পাকা কাঁঠাল রোদ-বৃষ্টি থেকে কিছুটা সুরক্ষা দিয়ে আরও কিছুদিন গাছে ধরে রাখার জন্য ডালের সঙ্গে চটের বস্তা বেঁধে রাখছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরে প্রায় ৮ হাজার ৫০২ হেক্টর জমিতে কাঁঠালের চাষ হয়। এর মধ্যে শুধু শ্রীপুর উপজেলাতেই রয়েছে ২ হাজার ৯৫০ হেক্টর। প্রতি বছর জেলায় প্রায় দুই লাখ ৫৭ হাজার ৫০৯ টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়।

গাজীপুর সদর উপজেলার বানিয়ারচালা গ্রামের কাঁঠালচাষি আমজাদ হোসেন বলেন, ‘স্থানীয় বাজারে কাঁঠালের কেনাবেচা কমে গেছে। স্থানীয় ক্রেতাও কম। সাধারণত গাজীপুরের কাঁঠাল দেশের সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায়। এবার বাজারে কাঁঠালের সরবরাহ থাকলেও বিক্রি কম।’

তবে সব কৃষকই যে সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তা নয়।

শ্রীপুর উপজেলার রাজাবাড়ী ইউনিয়নের হালুকাইদ গ্রামের কাঁঠালচাষি আলমগীর বলেন, যে চাষিরা আগেই বাগান বিক্রি করে দিয়েছেন, তারা কিছুটা রক্ষা পেয়েছেন। কিন্তু তার মতো যারা বাগানের কাঁঠাল একসঙ্গে বিক্রি করেননি, তাদেরই বেশি বিপাকে পড়তে হয়েছে।

কাপাসিয়ার পাচুয়া গ্রামের শিক্ষক ও কৃষক আসাদুজ্জামান আকাশ বলেন, ‘গাছে এখনো অনেক কাঁঠাল পেকে আছে। পোকায় খাচ্ছে, পাখিতে খাচ্ছে, প্রতিদিন পেকে নিচে পড়ে যাচ্ছে। গরুও খায় না, মানুষও খায় না। এমনকি কাঁঠালের বিচিও কেউ কুড়িয়ে নেয় না।’

তিনি বলেন, ‘জাতীয় এই ফলের উৎপাদনকারীরা যেন যথাযথ মূল্য পান, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। একবার শুনেছিলাম, কাঁঠাল রপ্তানি করা যাবে। এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে খুবই ভালো হবে। কাঁঠালের মতো সুস্বাদু ফলের জন্য ভবিষ্যতে কাপাসিয়া, গাজীপুর ও শ্রীপুরের কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পাবেন—এটাই আশা করি।’

কাপাসিয়ার কাঁঠাল ব্যবসায়ী মিলন মিয়া বলেন, প্রতি বছর তিনি সিলেটে কাঁঠাল নিয়ে যান। তবে এবার  যাননি। এলাকা থেকে কাঁঠাল কিনে স্থানীয় বাজারেই বিক্রি করছেন।

তিনি বলেন, এবার ট্রাক ভাড়াও অনেক বেড়েছে। তেলের দাম বাড়ার কারণে হয়তো পরিবহন খরচ বেড়েছে। পাশাপাশি মানুষও কাঁঠাল কম কিনছে। তবে কী কারণে কাঁঠালের চাহিদা কমেছে, তা তিনি জানেন না।

রানিগঞ্জ-গাজীপুর আঞ্চলিক সড়কে কথা হয় আরেক কাঁঠাল ব্যবসায়ীর সঙ্গে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যবসায়ী বলেন, গাজীপুর থেকে সিলেটে কাঁঠাল নিয়ে গেলে পথে নানা ধরনের খরচ হয়।

শিক্ষক বাদশাহ আব্দুল্লাহ বলেন, ‘সারা বছর পরিচর্যা, সার, শ্রমিক ও পরিবহন খরচ করে উৎপাদিত বড় আকারের একটি কাঁঠাল চলতি বছর হাটে মাত্র ১০ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কাপাসিয়ায় প্রায় অর্ধশতাধিক কাঁঠালের হাট রয়েছে। তবে মৌসুমে শেষ দিকে কিছুটা দাম বেড়েছে।’

গাজীপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম খান বলেন, মৌসুমে দাম কমে যাওয়ায় কৃষকেরা প্রায়ই ক্ষতির মুখে পড়েন। তবে কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে উঠলে কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং অপচয়ও কমবে।

তিনি বলেন, এরইমধ্যে চীনে কাঁঠাল রপ্তানির সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে কৃষি বিভাগ সব ধরনের সহযোগিতা করবে।

গাজীপুর ৪, (কাপাসিয়া) সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আইয়ুবি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘কাপাসিয়াবাসীর জন্য এটা বড় সুসংবাদ হতে পারে যদি যথাযথ সরকারি সহযোগিতা পাওয়া যায়। সরকারি সহযোগিতা নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করব।’

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফল গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বাংলাদেশে ৮ থেকে ১০ লাখ টন কাঁঠাল উৎপাদন হয়। কিন্তু অভ্যন্তরীণ চাহিদা কম থাকা এবং রপ্তানির সুযোগ না থাকায় প্রতি বছর এর ৪৫ শতাংশেরই বেশি নষ্ট হয়।

সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়