এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সুন্দরবন : দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্ব ঐতিহ্য ও বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবনে আবারও বনদস্যুদের তৎপরতার ঘটনা সামনে এসেছে। বনবিভাগের এক কর্মী এবং দুই জেলেকে অপহরণের তিন দিন পর জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। বনদস্যু জাহাঙ্গীর বাহিনীর হাতে অপহৃত হওয়ার পর শুক্রবার সকালে সুন্দরবনের আমবাড়িয়া এলাকার একটি চরে কালো কাপড়ে চোখ বাঁধা অবস্থায় তাদের পাওয়া যায়। অপহৃতদের নিরাপদে ফিরে পাওয়ার খবরে স্বস্তি নেমে এসেছে বনবিভাগ ও তাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে।
মুক্তি পাওয়া তিনজন হলেন পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের দুবলা জেলে পল্লী বিশেষ টহল ফাঁড়ির রেডিও অপারেটর ফরিদুল ইসলাম, ট্রলারচালক তোফাজ্জেল সরদার এবং তার সহকারী আলকাস হোসেন।
বনবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ফরিদুল ইসলাম ছুটি কাটিয়ে জামালপুরে নিজ বাড়ি থেকে কর্মস্থলে ফিরছিলেন। গত ৯ জুন দুপুরে তিনি বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার পদ্মা স্লুইস এলাকা থেকে একটি ফিশিং ট্রলারে করে দুবলার উদ্দেশে রওনা দেন। তার সঙ্গে ছিলেন ট্রলারচালক তোফাজ্জেল সরদার এবং সহকারী আলকাস হোসেন।
সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। কিন্তু বিকেল প্রায় ৫টার দিকে ট্রলারটি সুন্দরবনের কালামিয়ার ভারাণী এলাকা অতিক্রম করার সময় হঠাৎই অস্ত্রধারী বনদস্যুরা তাদের পথরোধ করে। পরে জাহাঙ্গীর বাহিনীর সদস্যরা অস্ত্রের মুখে তিনজনকে জিম্মি করে ট্রলারসহ সুন্দরবনের গভীর অরণ্যে নিয়ে যায়। এরপর থেকেই তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।
ফরিদুল ইসলাম কর্মস্থলে ফেরার বিষয়টি আগেই সহকর্মীদের জানিয়েছিলেন। নির্ধারিত সময়ে তিনি দুবলা টহল ফাঁড়িতে না পৌঁছালে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন সহকর্মীরা। মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া না পাওয়ায় অপহরণের আশঙ্কা জোরালো হয়ে ওঠে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় বনবিভাগ তাৎক্ষণিকভাবে অনুসন্ধান অভিযান শুরু করে। সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী, খাল, চর ও বনাঞ্চলে একাধিক টহল দল মোতায়েন করা হয়। আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় ড্রোন উড়িয়ে সম্ভাব্য এলাকাগুলোতে তল্লাশি চালানো হয়। তবুও প্রথম দুই দিনে তাদের অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
দিন যত গড়িয়েছে, উদ্বেগও তত বেড়েছে। বনকর্মী ও তার সহযাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে বনবিভাগ এবং স্থানীয় জেলে সম্প্রদায়ের মধ্যে। অবশেষে বৃহস্পতিবার বিকেলে শরণখোলা স্টেশন কর্মকর্তা (এসও) মো. খলিলুর রহমান বাদী হয়ে শরণখোলা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
নিখোঁজের তৃতীয় দিনে শুক্রবার সকালে নাটকীয়ভাবে পরিস্থিতির অবসান ঘটে। সুন্দরবনের আমবাড়িয়া এলাকার একটি চরে চোখ বাঁধা অবস্থায় তিনজনকে ফেলে রেখে যায় দস্যুরা। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় তারা নিরাপদে উদ্ধার হন।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, দুবলা ফরেস্ট টহল ফাঁড়ির রেডিও অপারেটর ফরিদুল ইসলাম ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরার পথে বনদস্যু জাহাঙ্গীর বাহিনীর সদস্যদের হাতে অপহৃত হন। তার সঙ্গে থাকা দুই জেলেকেও দস্যুরা জিম্মি করে নিয়ে যায়। বনবিভাগের একাধিক টিম ও ড্রোনের মাধ্যমে ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো হলেও তাদের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, “পরে দস্যুরা জানতে পারে যে অপহৃত ব্যক্তি বনবিভাগের একজন কর্মচারী। এর পরিপ্রেক্ষিতে কোনো ধরনের মুক্তিপণ দাবি ছাড়াই শুক্রবার সকালে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। অপহৃতদের ফিরে পাওয়ায় পুরো বন বিভাগে স্বস্তি ফিরে এসেছে।”
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনের কিছু দুর্গম এলাকায় আবারও বনদস্যুদের বিচ্ছিন্ন তৎপরতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে মাছ ধরার মৌসুম শুরু হওয়ার প্রাক্কালে জেলে ও বনজীবীদের মধ্যে নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে অতীতে সুন্দরবনের অধিকাংশ দস্যু বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল, তবুও মাঝেমধ্যে এমন ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলছে বনাঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের মতো বিস্তীর্ণ ও দুর্গম এলাকায় বনকর্মী, জেলে ও বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ আরও জোরদার করা প্রয়োজন। অন্যথায় বিচ্ছিন্ন দস্যু চক্রগুলো সুযোগ নিয়ে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
তবে তিন দিনের উৎকণ্ঠা শেষে বনকর্মী ফরিদুল ইসলাম এবং দুই জেলের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন অন্তত আপাতত স্বস্তির বার্তা হয়ে এসেছে সুন্দরবনজুড়ে।